ট্র্যাকার! বলল কিনো। এসো!
হঠাৎই আবিষ্কার করল কিনো ওর সমস্ত আশা-ভরসা ধূলিসাৎ হয়ে গেছে।
ওদের কাছে ধরা দেব নাকি? বলল।
লাফিয়ে উঠে স্বামীর বাহুতে হাত রাখল হুয়ানা।
পাগল হলে? তোমার সাথে মুক্তা আছে, বলল। তুমি কি ভেবেছ ওরা। তোমাকে শহরে জ্যান্ত ফিরিয়ে নিয়ে যাবে?
আস্তে আস্তে পকেটে একটা হাত ঢুকল কিনোর। ওরা মুক্তাটা হাতিয়ে নেবে, বলল শান্ত সুরে।
এসো, তাগাদা দেয় হুয়ানা। জলদি এসো!
কিনোকে পাথরের মত দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তাড়া লাগাল হুয়ানা।
আমাকেও কি ওরা ছেড়ে দেবে নাকি? বলল। তোমার দুধের বাচ্চাটাকেও বাঁচতে দেবে না।
টনক নড়ল এবার কিনোর। ঠোঁট দৃঢ়বদ্ধ হলো ওর, দুচোখ ভরে উঠল রাগে আর ঘৃণায়।
চলো, বলল ও। পাহাড়ে যাব আমরা। ওখানে হয়তো লুকিয়ে থাকতে পারব।
খাবারের ছোট ছোট থলেগুলো, আর পানির বোতলটা বাঁ হাতে তুলে নিল কিনো। ডান হাতে ধরা ওর ছোরাটা। হুয়ানা স্বামীকে অনুসরণ করছে। ঝোপ-ঝাড় ভেদ করে উচু পর্বতমালার উদ্দেশে হনহনিয়ে হেঁটে চলেছে ওরা।
কিনো এতটাই ভড়কেছে, ট্র্যাক আড়াল করার কথাও ওর মাথায় এল না। শশব্যস্তে হাঁটছে ওরা। নুড়ি পাথর ওদের পায়ের ধাক্কায় গড়াচ্ছে, গাছের পাতা গায়ে বেধে খসে পড়ছে। আকাশের পটভূমিতে, ওই তো, মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে সুউচ্চ পর্বতমালা। প্রাণভয়ে ভীত জানোয়ারের মত ওদিক লক্ষ্য করে ছুটল ওরা।
এখানকার জমিতে পানি নেই। ভাঙাচোরা পাথর আর শুকনো পাতা মাড়িয়ে অবিচল হেঁটে চলেছে স্বামী-স্ত্রী। এই খরমরুতে গা পুড়ে যেতে চায়।
সামনে, শীতল ছায়া বিছিয়ে যেন নিরাপত্তা দিচ্ছে পাথুরে পাহাড়সারি। যতটা দ্রুত পারে পা চালাচ্ছে কিনো। কি ঘটবে জানে তো সে।
শিকারীরা একটু পরেই ট্র্যাক খুঁজে পাবে। তারপর ওদের গুপ্তস্থানটা আবিষ্কার করবে। ঝরা পাতার আর ভাঙা পাথরের বদৌলতে ওদেরকে স্বচ্ছন্দে অনুসরণ করবে লোকগুলো। ধরে ফেলবে কিনো আর হুয়ানাকে। শহরে আর ফিরে যেতে হবে না স্বামী-স্ত্রী-বাচ্চাকে। অশ্বারোহী লোকটা এমনি এমনি রাইফেল আনেনি।
ছোট্ট পথটা খাড়া হয়ে গেছে এমুহূর্তে, পাথরগুলো আগের চাইতে বড়।
কিন্তু কিনোর পরিবার অনেকটা পেছনে ফেলে এসেছে এখন ট্র্যাকারদের। একটু জিরিয়ে নিতে থামল ওরা। বিশাল এক পাথরে চড়ে দাঁড়িয়ে পেছনে দৃষ্টি রাখল কিনো। ট্র্যাকারদের পাত্তা পেল না। এমনকি দীর্ঘদেহী ঘোড়সওয়রিটিকেও দেখা যাচ্ছে না।
পাথরের ছায়ায় বসে পড়েছে হুয়ানা। মুখের কাছে বোতল ধরতে চুকচুক করে পানি খেল কায়েটিটো। পাথর থেকে নেমে পড়ে হুয়ানার দিকে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে রইল কিনো। ধারাল পাথরে লেগে পা কেটেকুটে গেছে হুয়ানার। ঝটপট স্কার্ট দিয়ে পা দুখানি ঢাকা দিল ও। তারপর স্বামীর দিকে পানির বোতলটা বাড়িয়ে ধরতে, সে মাথা নাড়ল। তেষ্টায় ছাতি ফেটে যাচ্ছে কিনোর, কিন্তু পানির পরিমাণ এতই অল্প, খেতে মন উঠল না।
হুয়ানা, বলল কিনো। আমি পাহাড়ে যাব, তুমি লুকিয়ে থেকো। ট্র্যাকাররা আমাকে পিছু নিয়ে পাহাড়ে যাবে। ওরা চলে গেলে, উত্তরে রওনা দেবে তুমি। আমি পরে এসে যোগ দেব।
মুহূর্তের জন্যে কিনোর দিকে অপলকে চেয়ে রইল হুয়ানা।
না, ঘোষণা করল এবার। আমরা তোমার সাথে যাব।
একা গেলে আমি তাড়াতাড়ি যেতে পারব, ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলল কিনো। তুমি আমার সাথে গেলে কয়েটিটোর বিপদ বাড়বে বই কমবে না।
না।
যা বলছি করো, বলল কিনো। তোমাকে লুকিয়ে থাকতে হবে।
না, আবারও বলল হুয়ানা।
হুয়ানার উদ্দেশে চেয়ে রইল কিনো। ওর মুখের চেহারায় ভীতির কিংবা দুর্বলতার চিহ্নমাত্র নেই। হুয়ানার জ্বলজ্বলে চোখজোড়া কিনোর মনোবলও ফিরিয়ে দিল। আবার যখন ওরা হাঁটা ধরল, ভয়-ভীতি কোথায় পালিয়েছে।
ক্রমেই চড়াই বাইছে হুয়ানা আর কিনো। সমতল পাথরের ওপর দিয়ে হাঁটছে ওরা, ট্র্যাক রেখে যাচ্ছে না। কিন্তু কিনো জানে, হারিয়ে ফেললেও ট্রাক খুঁজে বের না করা পর্যন্ত থামবে না ট্র্যাকাররা। কাজেই সরাসরি পাহাড়ের উদ্দেশে যাচ্ছে না ও। প্রতিপক্ষের জন্যে কষ্টসাধ্য করে তুলতে চাইছে, খোঁজার কাজটা। প্রায়ই পাথর ছেড়ে অন্যান্য জায়গায় ছাপ ফেলছে সে। তারপর আবার ফিরে এসে পাহাড়ী ঢাল বেয়ে উঠে যাচ্ছে হুয়ানার কাছে। রাস্তাটা যেন ফুরোবে না, উঠছে তো উঠছেই। ভারী শ্বাস-প্রশ্বাস চলছে হুয়ানার আর কিনোর।
প্রবেশ করতে সূর্য হেলে পড়ল পশ্চিমে। উপত্যকাটা অন্ধকার, ছায়াময় কয়েকটা ছোটখাট ঝোপ-ঝাড়ের দেখা মিলল। পানি ফুরিয়ে গেছে। কিনোর মনে হলো, ঝোপের আশপাশে পানি পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু উপত্যকাটা ওদের জন্যে বিপজ্জনক, কেননা শত্রুপক্ষও পানির খোঁজ করবে।
কিনো ঠিকই ভেবেছিল। ঝোপের জটলার কাছে একটা ডোবা। পাহাড়চূড়া থেকে বরফ গলা ঝর্ণাধারা নেমে এসে ওটার সৃষ্টি করেছে। ডোবাটার পাশে ঝোপ-ঝাড় আর লম্বা লম্বা দূর্বা ঘাস জন্মেছে। ছোট্ট, বালুময় তীরটায় অসংখ্য জন্তু-জানোয়ারের পায়ের ছাপ। এখানে পানি খেতে আসে ওরা।
পানির কাছে ওরা যখন পৌঁছল, সূর্য তখন পাহাড়ের ওপাশে ডুব মেরেছে। এখান থেকে দূরবর্তী সাগর দেখা যায়। ওরা স্বামী-স্ত্রী শারীরিক-মানসিক ধকলে ভয়ানক ক্লান্ত। হাঁটুর ওপর ধপ করে বসে পড়ে বাচ্চার মুখ ধুইয়ে দিল হুয়ানা। তারপর বোতল ভরে নিয়ে পানি খাওয়াল।