হাদীস নং ৩৯৮৪
সাঈদ ইবনে উফাইর ও ইসহাক রহ……….মারওয়ান এবং মিওয়ার ইবনে মাখরামা রা. থেকে বর্ণিত যে, হাওয়াযিন গোত্রের প্রতিনিধিগণ যখন ইসলাম গ্রহণ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে এল এবং তাদের (যুদ্ধ লুণ্ঠিত) সম্পদ ও বন্দীদেরকে ফের দেওয়ার প্রার্থনা জানালো তখন তিনি দাঁড়ালেন এবং তাদের বললেন, আমার সঙ্গে যারা আছে (সাহাবাগণ) তাদের অবস্থা তো তোমরা দেখতে পাচ্ছ। সত্য কথাই আমার কাছে বেশি প্রিয়। কাজেই তোমরা যুদ্ধবন্দী অথবা সম্পদের যে কোন একটিকে গ্রহণ করতে পার। আমি তোমাদের জন্য (পথেই) অপেক্ষা করছিলাম। বস্তুত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তায়েফ থেকে প্রত্যাবর্তন করার পথে (জিরানা জায়গায়) দশ রাতেরও অধিক সময় পর্যন্ত তাদের জন্য অপেক্ষা করেছিলেন। (রাবী বলেন) হাওয়াযিন গোত্রের প্রতিনিধিদের কাছে যখন এ কথা স্পষ্ট হয়ে গেল যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে এ দুটির মধ্যে একটির বেশি ফেরত দিতে সম্মত নন তখন তারা বললেন, আমরা আমাদের বন্দীদেরকে গ্রহণ করতে চাই। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদের সম্মুখে গিয়ে দাঁড়ালেন এবং আল্লাহর যথাযোগ্য হামদ ও সানা পাঠ করে বললেন, আম্মা বায়াদ তোমাদের (হাওয়াযিন গোত্রের মুসলিম) ভাইয়েরা তাওবা করে আমাদের কাছে এসেছে, আমি তাদের বন্দীদেরকে তাদের নিকট ফেরত দেওয়ার সিন্ধান্ত করেছি। অতএব তোমাদের মধ্যে যে আমার এ সিদ্ধান্তকে খুশি মনে গ্রহণ করে নেবে সে (তার অংশের বন্দীকে) ফেরত দাও। আর তোমাদের মধ্যে যে তার অংশের অধিকারকে অবশিষ্ট রেখে তা এভাবে ফেরত দিতে চাইবে যে, ফাইয়ের সম্পদ থেকে (আগামীতে) আল্লাহ আমাকে সর্বপ্রথম যা দান করবেন তা দিয়ে আমি তার এ বন্দীর মূল পরিশোধ করব, তবে সেই তাই কর। তখন সকল লোক উত্তর করল: ইয়া রাসূলাল্লাহ ! আমরা আপনার প্রথম সিদ্ধান্ত খুশিমনে গ্রহণ করলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমদের মধ্যে এ ব্যাপারে কে খুশিমনে অনুমতি দিয়েছে আর কে খুশিমনে অনুমতি দেয়নি আমি তা বুঝতে পারিনি। তাই তোমরা ফিরে যাও এবং তোমাদের মধ্যকার বিজ্ঞ ব্যক্তিদের সাথে আলাপ কর। তাঁরা আমার কাছে বিষয়টি পেশ করবে। সবাই ফিরে গেল। পরে তাদের বিজ্ঞ ব্যক্তিগণ তাদের সাথে (আলাদা আলাদাভাবে) আলাপ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট ফিরে এসে জানাল যে, সবাই তাঁর (প্রথম) সিন্ধান্তকেই খুশি মনে মেনে নিয়েছে এবং (ফেরত দেয়া) অনুমতি দিয়েছে। (ইমাম ইবনে শিহাব যুহরী রহ. বলেন,) হাওয়াযিন গোত্রের বন্দীদের বিষয়ে এ হাদীসটিই আমি অবহিত হয়েছি।
হাদীস নং ৩৯৮৫
আবু নুমান রহ………….নাফি রহ. থেকে বর্ণিত যে, উমর রা. বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ !……..! হাদীসটি অন্য সনদে মুহাম্মদ ইবনে মুকাতিল রহ……….ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা হুনায়নের যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তন করার কালে উমর রা .নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে জাহিলিয়্যাতের যুগে মানত করা তাঁর একটি ইতিকাফ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সেটি পূরণ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কেউ কেউ বলেছেন হাদীসটি হাম্মাদ-আইয়ূব-নাফে রহ. ইবনে উমর রা. সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। তাছাড়া জারীর ইবনে হাযিম এবং হাম্মাদ ইবনে সালামা রহ.-ও এ হাদীসটি আইয়ূব, নাফে রহ. ইবনে উমর রা. সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন।
হাদীস নং ৩৯৮৬
আবদুল্লাহ ইবনে ইউসুফ রহ……….আবু কাতাদা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বলেন, হুনায়নের বছর আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাথে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলাম। আমরা যখন (যুদ্ধের জন্য) শত্রুদের মুখোমুখি হলাম তখন মুসলিমদের মধ্যে বিশৃংখলা দেখা দিল। এ সময় আমি মুশরিকদের এক ব্যক্তিকে দেখলাম সে মুসলিমদের এক ব্যক্তিকে পরাভূত কের ফেলেছে। তাই আমি কফের লোকটির পশ্চাৎ দিকে গিয়ে তরবারি দিয়ে তার কাঁধ ও ঘাড়ের মধ্যবর্তী শক্ত শিরার উপর আঘাত হানলাম এবং লোকটির পরিহিত লৌহ বর্মটি কেটে ফেললাম। এ সময় সে আমার উপর আক্রমণ করে বসলো এবং আমাকে এত জোরে চাপ দিয়ে জড়িয়ে ধরল যে, আমি আমার মৃত্যুর গন্ধ অনুভব করতে লাগলাম। এরপর লোকটিই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো আর আমাকে ছেড়ে দিল। এরপর আমি উমর রা.-এর কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, লোকজনের কি হল? তিনি বললেন, মহান ও শক্তিশালী আল্লাহর ইচ্ছা। এরপর সবাই (আবার) ফিরে এল (এবং মুশরিকদের উপর হামলা চালিয়ে যুদ্ধে জয়ী হল) যুদ্ধের পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (এক স্থানে) বসলেন এবং ঘোষণা দিলেন, যে ব্যক্তি কোন মুশরিক যোদ্ধাকে হত্যা করেছে এবং তার কাছে এর প্রমাণ রয়েছে তাকে তার (নিহত ব্যক্তির) পরিত্যক্ত সব সম্পদ প্রদান করা হবে। এ ঘোষণা শুনে আমি (দাঁড়িয়ে সবাইকে লক্ষ্য করে) বললাম, আমার পক্ষে সাক্ষ্য দেওয়ার মত কেউ আছে কি? (কিন্তু কোন জবাব না পেয়ে) আমি বসে পড়লাম। আবু কাতাদা রা. বলেন, (তারপর) আবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুরূপ ঘোষণা দিলেন। আমি দাঁড়িয়ে বললাম, আমার পক্ষে সাক্ষ্য দেওয়ার মত কেউ আছে কি? কিন্তু (এবারও কোন সাড়া না পেয়ে) আমি বসে পড়লাম। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তারপর অনুরূপ ঘোষণা দিলে আমি দাঁড়ালাম। আমাকে দেখে তিনি বললেন, আবু কাতাদা ! তোমার কি হয়েছে? আমি তাকে ব্যাপারটি জানালাম। এ সময়ে এক ব্যক্তি বলল, আবু কাতাদা রা. ঠিকই বলেছেন, তবে নিহত ব্যক্তির পরিত্যক্ত দ্রব্যগুলো আমার কাছে আছে। সুতরাং সেগুলো আমাকে দিয়ে দেওয়ার জন্য আপনি তাকে সম্মত করে দিন। তখন আবু বকর রা. বললেন, না, আল্লাহর শপথ, তা হতে পারে না। আল্লার সিংহদের এক সিংহ যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ হয়ে যুদ্ধ করেছে তার যুদ্ধলব্ধ দ্রব্যাদি তোমাকে দিয়ে দেয়ার ইচ্ছা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করতে পারেন না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আবু বকর রা. ঠিকই বলছে। সুতরাং এসব দ্রব্য তুমি তাকে (আবু কাতাদা) দিয়ে দাও। (আবু কাতাদা রা. বলেন) তখন সে আমাকে পরিত্যক্ত দ্রব্যগুলো দিয়ে দিল। এ দ্রব্যগুলোর বিনিময়ে আমি বনী সালিমার এলাকায় একটি বাগান খরিদ করলাম। আর ইসলাম কবুল করার পর এটিই ছিল প্রথম উপার্জিত মাল যা দিয়ে আমি আমার অর্থের বুনিয়াদ রেখেছি। অপর সনদে লাইস রহ…………আবু কাতাদা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হুনাইন যুদ্ধের দিন আমি দেখতে পেলাম যে, একজন মুসলিম এক মুশরিকের সাথে লড়াই করছে। অপর এক মুশরিক মুসলিম ব্যক্তির পেছন দিকে থেকে তাকে হত্যা করার জন্য আক্রমণ করছে। আমি আক্রমণকারীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম। সে আমাকে আঘাত করার জন্য তার হাত উঠাল। আমি তার হাতের উপর আঘাত করলাম এবং তা কেটে ফেললাম। সে আমাকে ধরে সজোরে চাপ দিল। এমনকি আমি (মৃত্যুর) ভয় পেয়ে গেলাম। এরপর সে আমাকে ছেড়ে দিল ও সে দুর্বল হয়ে পড়ল। আমি তাকে আক্রমণ করে মেরে ফেললাম। মুসলিমগণ পালাতে লাগলেন। আমিও তাদের সাথে পালালাম। হঠাৎ লোকদের মাঝে উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-কে দেখতে পেয়ে আমি তাকে বললাম, লোকজনের অবস্থা কি? তিনি বললেন, আল্লাহর যা ইচ্ছা তাই হয়েছে। এরপর লোকেরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট ফিরে এলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “যে মুসলিম ব্যক্তি (শত্রু দলের) কাউকে হত্যা করেছে বলে প্রমাণ পেশ করতে পারবে নিহত ব্যক্তির পরিত্যক্ত সম্পদ সে-ই পাবে। আমি যে একজনকে হত্যা করেছি সে ব্যাপারে আমি দাঁড়িয়ে সাক্ষী খুঁজতে লাগলাম। কিন্তু আমার পক্ষে সাক্ষ্য দেওয়ার কাউকে পেলাম না। তখন আমি বসে পড়লাম। এরপর আমি ঘটনাটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে বর্ণনা করলাম। তখন তাঁর সঙ্গীদের একজন বললেন, উল্লিখিত নিহত ব্যক্তির (পরিত্যক্ত) হাতিয়ার আমার কাছে আছে। তা আমাকে দিয়ে দেওয়ার জন্য আপনি তাকে সম্মত করে দিন। তখন আবু বকর রা. বললেন, না, তা হতে পারে না। আল্লাহর সিংহদের এক সিংহ যে আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলের পক্ষ হয়ে যুদ্ধ করেছে তাকে না দিয়ে এ কুরাইশী দুর্বল ব্যক্তিকে তিনি (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দিতে পারেন না। রাবী বলেন, এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়ালেন এবং আমাকে তা দিয়ে দিলেন। আমি এর দ্বারা একটি বাগান খরিদ করলাম। আর ইসলাম কবুল করার পর এটিই ছিল প্রথম উপার্জিত মাল, যা দিয়ে আমি আমার অর্থের বুনিয়াদ রেখেছি।
