হাদীস নং ৩৪০০
মুআল্লা ইবনে আসাদ রহ………আমর ইবনে আস রা. থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে যাতুস সালাসিল যুদ্ধের সেনানায়ক করে পাঠিয়ে ছিলেন। তিনি বলেন, আমি তাঁর খেদমতে উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, মানুষের মধ্যে কে আপনার কাছে সবচেয়ে প্রিয়? তিনি বললেন, আয়েশা। আমি বললাম, পুরুষদের মধ্যে কে ? তিনি বললেন, আয়েশার পিতা (আবু বকর) আমি জিজ্ঞাসা করলাম, তারপর কোন লোকটি? তিনি বললেন, উমর ইবনে খাত্তাব তারপর আরো কয়েকজনের নাম উল্লেখ করলেন।
হাদীস নং ৩৪০১
আবুল ইয়ামান রহ……….আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, একদা একজন রাখাল তার বকরীর পালের কাছে ছিল। এমতাবস্থায় একটি নেকড়ে বাঘ আক্রমণ করে পাল থেকে একটি বকরী নিয়ে গেল। রাখাল নেকড়ে বাঘের পিছনে ধাওয়া করে বকরীটি ছিনিয়ে আনল। তখন বাঘটি তাকে লক্ষ্য করে বলল, তুমি বকরীটি ছিনিয়ে নিলে? হিংস্র জন্তুর আক্রমণের দিকে কে তাকে রক্ষা করবে, যেদিন তার জন্য আমি ব্যতীত অন্য কোন রাখাল থাকবে না। একদা এক ব্যক্তি একটি গাভীর পিঠে আরোহণ করে সেটিকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। তখন গাভীটি তাকে লক্ষ্য করে বলল, আমি এ কাজের জন্য সৃষ্ট হয়নি। বরং আমি কৃষি কাজের জন্য সৃষ্ট হয়েছি। একথা শুনে সকলেই বিস্ময়ের সাথে বলতে লাগল “সুবহানাল্লাহ” (কি আশ্চর্য গাভী কথা বলে! বাগ কথা বলে) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি আবু বকর এবং উমর ইবনে খাত্তাব এ কথা বিশ্বাস করি (ঐ সময়ে তাঁরা দুজন সেখানে উপস্থিত ছিলেন না।)
হাদীস নং ৩৪০২
আবদান রহ………..আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছি, একদা আমি ঘুমিয়ে ছিলেন। স্বপ্নে আমি আমাকে এমন একটি কূপের কিনারায় দেখতে পেলাম যেখানে বালতিও রয়েছে, আমি কূপ থেকে পানি উঠালাম যে পরিমাণ আল্লাহ ইচ্ছা করলেন। তারপর বালতিটি ইবনে আবু কুহাফা (আবু বকর) নিলেন এবং এক বা দু’বালতি পানি উঠালেন। তার উঠানোতে কিছুটা দুর্বলতা ছিল। আল্লাহ তার দুর্বলতাকে ক্ষমা করে দিবেন। তারপর উমর ইবনে খাত্তাব বালতিটি তার হাতে নিলেন। তার হাতে বালতিটির আয়তন বেড়ে গেল। আমি কোন দক্ষ, শক্তিশালী বাহাদুর ব্যক্তিকে উমরের ন্যায় পানি উঠাতে দেখিনি। অবশেষে মানুষ (তৃপ্ত হয়ে) নিজ নিজ আবাসে অবস্থান নিল।
হাদীস নং ৩৪০৩
মুহাম্মদ ইবনে মুকাতিল রহ………..আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি গর্বের সাথে পরিহিত কাপড় টাখনুর নিম্নভাগে ঝুলিয়ে চলাফিরা করে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার প্রতি রহমতের নযর করবেন না। এ শুনে আবু বকর রা. বললেন, আমার অজ্ঞাতসারে কাপড়ের একপাশ কোন কোন সময় নীচে নেমে যায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি তো গর্বের সাথে তা করছ না। মূসা রা. বলেন, আমি সালিমকে জিজ্ঞাসা করলাম, আবদুল্লাহ রা. কি যে ব্যক্তি তার লুঙ্গী ঝুলিয়ে চলল, বলেছেন? সালিম রহ. বললেন, আমি তাকে শুধু কাপড়ের কথা উল্লেখ করতে শুনেছি।
হাদীস নং ৩৪০৪
আবুল ইয়ামান রহ………আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি কোন জিনিসের জোড়া জোড়া আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করবে। (পরকালে) তাকে জান্নাতে প্রবেশের জন্য সকল দরজা থেকে আহবান করা হবে। বলা হবে, হে আল্লাহর বান্দা, এ দরজাই উত্তম। যে ব্যক্তি (অধিক নফল) সালাত আদায়কারী হবে তাকে সালাতের দরজা দিয়ে প্রবেশের আহবান জানানো হবে। যে ব্যক্তি জিহাদকারী হবে তাকে জিহাদের দরজা থেকে আহবান করা হবে। যে ব্যক্তি (অধিক নফল) সাদকাদানকারী হবে, তাকে সাদকার দরজা দিয়ে ডাকা হবে। যে ব্যক্তি (অধিক নফল) সাওম আদায়কারী হবে তাকে সাওমের দরজা বাবুর রাইয়ান থেকে আহবান করা হবে। আবু বকর রা. বললেন, কোন ব্যক্তিকে সকল দরজা দিয়ে ডাকা হবে এমনতো অবশ্য জরুরী নয়, তবে কি এরূপ কাউকে ডাকা হবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, আছে। আমি আশা করছি তুমি তাদের অন্তর্ভূক্ত হবে, হে আবু বকর।
হাদীস নং ৩৪০৫
ইসমাঈল ইবনে আবদুল্লাহ রহ…………নবী সহধর্মিণী আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যখন ওফাত হয়, তখন আবু বকর রা. (স্বীয় বাসগৃহ) সুনহ-এ ছিলেন। ইসমাঈল (রাবী) বলেন, সুনহ মদীনার উচু এলাকার একটি স্থানের নাম। (ওফাতের সংবাদ শুনার সাথে সাথে) উমর রা. দাঁড়িয়ে বলতে লাগলেন, আল্লাহর কসম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওফাত হয় নাই। আয়েশা রা. বলেন, উমর রা. বললেন, আল্লাহর কসম, তখন আমার অন্তরে এ বিশ্বাসই ছিল (তাঁর ওফাত হয় নাই) আল্লাহ অবশ্যই তাকে পুনরায় জীবিত করবেন। এবং তিনি কিছু সংখ্যক লোকের (মুনাফিকের) হাত-পা কেটে ফেলবেন। তারপর আবু বকর রা. এলেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চেহারা মোবারক থেকে আবরণ সরিয়ে তাঁর ললাটে চুমু খেলেন এবং বললেন, আমার পিতা-মাতা আপনার উপর কুরবান। আপনি জীবনে মরণে পূত পবিত্র। ঐ সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ, আল্লাহ আপানাকে কখনও দুবার মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করাবেন না। তারপর তিনি বেরিয়ে আসলেন এবং (উমর রা.-কে লক্ষ্য করে বললেন) হে হলফকারী, ধৈর্যধারণ কর। আবু বকর রা. যখন কথা বলতে লাগলেন, তখন উমর রা. বসে পড়লেন।আবু বকর রা. আল্লাহ পাকের হামদ ও সানা বর্ণনা করে বললেন, যারা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তিকাল করেছেন। আর যারা আল্লাহর ইবাদত করতে তারা নিশ্চিতই জেনে রাখ আল্লাহ চিরঞ্জীব, তিনি অমর। তারপর আবু রা. এ আয়াত তিলাওয়াত করলেন: নিশ্চয়ই আপনি মরণশীল আর তারা সকলেইও মরণশীল। (৩৯:৩০) আরো তিলাওয়াত করলেন: মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন রাসূল মাত্র। তাঁর পূর্বে বহু রাসূল গত হয়েছেন। তাই যদি তিনি মারা যান অথবা তিনি নিহত হন তবে কি তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে? কেউ পৃষ্ঠ প্রদর্শন করলে সে কখনো আল্লাহর ক্ষতি করতে পারবে না। (৩: ১৪৪) আল্লাহ তাঁর কৃতজ্ঞ বান্দাদেরকে পুরস্কৃত করবেন। রাবী বলেন, আবু বকর রা.-এর এ কথাগুলি শুনে সকলই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন। রাবী বলেন আনসারগণ সাকীফা বনূ সায়িদায়ে সাদ ইবনে উবাদইদা রা.-এর নিকট সমবেত হলেন এবং বলতে লাগলেন, আমাদের (আনসারদের) মধ্য হতে একজন আমীর হবেন এবং তোমাদের (মুহাজিরদে) মধ্য হতে একজন আমীর হবেন। আবু বকর রা. উমর ইবনে খাত্তাব, আবু উবাদইদা ইবনে জাররাহ রা.-এ তিনজন আনসারদের নিকট গমন করলেন। উমর রা. কথা বলতে চাইলে, আবু বকর রা. তাকে থামিয়ে দিলেন। উমর রা. বলেন, আল্লাহর কসম, আমি বক্তব্য রাখতে চেয়েছিলাম এই জন্য যে, আমি আনসারদের মাহফিলে বলার জন্য চিন্তা-ভাবনা করে এমন কিছু চমৎকার ও যুক্তিপূর্ণ কথা তৈরী করেছিলাম। যার প্রেক্ষিতে আমার ধারণা ছিল হয়ত: আবু বকর রা.-এর চিন্তা ভাবনা এতটা গভীরে নাও পৌঁছতে পারে। কিন্তু আবু বকর রা. অত্যন্ত জোরাল ও যুক্তিপূর্ণ বক্তব্য পেশ করলেন। তিনি তাঁর বক্তব্যে বললেন, আমীর আমাদের (মুহাজিরদের) মধ্য থেকে একজন হবেন এবং তোমাদের মধ্য হতে (আনসারদের) হবেন উযীর। তখন হুবাব ইবনে মুনযির (আনসারী) রহ. বললেন, আল্লাহর কসম! আমরা এরূপ করব না। বরং আমাদের মধ্যে একজন ও আপনাদের মধ্যে একজন আমীর হবেন। আবু বকর রা. বললেন, না, এমন হয় না। আমাদের মধ্য হতে খলীফা এবং তোমাদের মধ্য হতে উযীর হবেন। কেননা কুরাইশ গোত্র অবস্থানের (মক্কা) দিক দিয়ে যেমন আরবের মধ্যস্থানে, বংশ ও রক্তের দিকে থেকেও তারা তেমনি শ্রেষ্ঠ। তাঁরা নেতৃত্বের জন্য যোগ্যতায় সবার শীর্ষে। তোমরা উমর রা. অথবা আবু উবাইদা ইবনে জাররাহ রা.-এর হাতে বায়আত করে নাও। উমর রা. বলে উঠলেন, আমরা কিন্তু আপনার হাতেই বায়আত করব। আপনিই আমাদের নেতা। আপনিই আমাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। আমাদের মাঝে আপনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রিয়তম ব্যক্তি। এ বলে উমর আ. তাঁর হাত ধরে বায়আত করে নিলেন। সাথে সাথে উপস্থিত সকলেই বায়আত করলেন। তখন জনৈক ব্যক্তি বলে উঠলেন, আপনারা সাদ ইবনে উবাইদা রা.-কে মেরে ফেললেন? উমর রা. বললেন, আল্লাহ তাকে মেরে ফেলেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে সালিম……..আয়েশা রা. বলেন, ওফাতের সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চোখ দুটি বার বার উপর দিকে উঠছিল এবং তিনি বার বার বলছিলেন, (হে আল্লাহ) সর্বোচচ বন্ধুর (আল্লাহর) সাক্ষাতের আমি আগ্রহী। আয়েশা রা. বলেন, আবু বকর ও উমর রা.-এর খুতবা দ্বারা আল্লাহ তা’আলা এ চরম মূহুর্তে উম্মতকে রক্ষা করেছেন। উমর রা. জনগণকে পরিস্থিতি সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, এমন কিছু মানুষ আছে যাদের অন্তরে কপটতা রয়েছে আল্লাহ তাদের ফাঁদ থেকে উম্মতকে রক্ষা করেছেন। এবং আবু বকর রা. লোকদিগকে সত্য সঠিক পথের সন্ধান দিয়েছেন। হক ও ন্যায়ের পথ নির্দেশ করেছেন, তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তারপর সাহাবা কেরাম এ আয়াত পড়তে পড়তে প্রস্থান করলেন: মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন রাসূল মাত্র। তাঁর পূর্বে বহু রাসূলগণ গত হয়েছেন………কৃতজ্ঞ বান্দাদের।(৩: ১৪৪)
