অতঃপর হযরত হাজেরা দুগ্ধপোষ্য শিশুকে নিয়ে জন-মানবহীন প্রান্তরে কালাতিপাত করতে থাকেন। এক সময়ে দারুণ পিপাসা তাঁকে পানির খোঁজে বেরিয়ে আসতে বাধ্য করলো। তিনি শিশুকে উন্মুক্ত প্রান্তরে রেখে পানির খোঁজে ‘সাফা’ ও ‘মারওয়া’ পাহাড়ে বারবার দৌড়াদৌড়ি করতে লাগলেন। কিন্তু কোথাও পানির চিহ্নমাত্র দেখলেন না এবং এমন কোনও মানুষ দৃষ্টিগোচর হল না, যার কাছে কিছু সাহায্য পেতে পারেন। সাতবার ছুটাছুটি করে পানির কোনও হদিস করতে না পেরে বিবি হাজেরা শিশু ইসমাঈলের কাছে ফিরে এলেন। কিন্তু তিনি আল্লাহ্র রহমতের উপরে অটল বিশ্বাসে, আল্লাহ্র কাছেই পানির জন্য প্রার্থনা জানালেন। এবারে আল্লাহ্র রহমত নাজিল হল। জিবরাঈল এলেন এবং শুষ্ক মরুভূমিতে পানির একটি ঝর্ণা ধারা বইয়ে দিলেন-যা যমযম কূপ নামে খ্যাত। এখানে বিবি হাজেরার চরিত্র থেকে আল্লাহ্ আমাদের শিক্ষনীয় করেছেন যে বিপদে ধৈর্য্য ধারণ করতে এবং আল্লাহ্র রহমত থেকে কখনও নিরাশ না হতে। বিবি হাজেরার সাফা ও মারওয়া দৌড়ানোর ঘটনা হচ্ছে বিপদে ধৈর্য্য ধারণের প্রতীক। এই ঘটনা থেকে শিক্ষা গ্রহণের জন্য ‘সাফা’ ও ‘মারওয়া’ পাহাড় দুটির মাঝখানে সাতবার দৌড়ানো কিয়ামত পর্যন্ত ভবিষ্যত বংশধরদের জন্য হজ্জ্বের বিধিবিধানে অত্যাবশকীয় করা হয়েছে। ধৈর্য্য ও আল্লাহ্র রহমতের প্রত্যাশাকে প্রতীকের সাহায্যে হজ্জ্বের ময়দানে আমরা এভাবেই উপস্থাপন করি। যমযম কূপের সৃষ্টির পর তার চারিপাশে আস্তে আস্তে জনবসতি গড়ে উঠে এবং মক্কা নগরীর সূত্রপাত হয় এবং শিশু ইসমাঈল ধীরে ধীরে বড় হতে থাকেন।
এরপর আল্লাহ্র হুকুম হয় হযরত ইসমাঈলকে আল্লাহ্র সন্তুষ্টির জন্য কোরবানী দিতে। এর পরবর্তী ঘটনা সবারই জানা। এটা ছিল পুত্রবৎসল পিতার চরম আত্মোৎসর্গের পরীক্ষা। এগুলো ছিল শক্ত ও বড় কঠিন পরীক্ষা যার সম্মুখীন হযরত খলীলুল্লাহকে করা হল।
এই আয়াতটিকে [২:১২৪] পরবর্তী আয়াতসমূহের সারাংশ হিসেবে ধরা হয়। ‘কালিমাত’ এ শব্দটির দ্বারা রহস্যময় ইচ্ছা বা পরীক্ষাসমূহকে ব্যক্ত করা হয়েছে। প্রতিটি পরীক্ষাতেই হযরত ইব্রাহীম আল্লাহ্র ইচ্ছা পূরণ করেন। এছাড়াও তিনি আল্লাহ্র ঘরকে পুনঃনির্মাণ করেন। একে পুতঃ পবিত্র করেন। যে কেউ আল্লাহ্র ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পন করে সেই মুসলিম। হযরত ইব্রাহীম ছিলেন খাঁটি মুসলিম। আমাদের যে বিশ্বাস আমরা জন্মসূত্রে মুসলিম-সুতরাং আমরা আল্লাহ্র কাছে গ্রহণযোগ্য। কিন্তু এ বিশ্বাস ঠিক নয়। মুসলমানের একমাত্র মানদন্ড হচ্ছে আল্লাহ্র ইচ্ছার কাছে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পন, তা কি আজকে বিশ্ব মুসলিম সমাজ পালন করে? আমরা নামেই বা জন্মসূত্রে মুসলিম-কিন্তু প্রতিনিয়ত আমরা আল্লাহ্র ইচ্ছার আইন অমান্য করি-অর্থাৎ আমরা সত্যবাদী হব, সৎ পথে চলবো, মানুষকে ঠকাবো না, ন্যায় ও সত্যের জন্য জেহাদ ঘোষণা করবো ইত্যাদিই হচ্ছে আল্লাহ্র ইচ্ছা বা আইন যা আমরা অমান্য করি। ভেবে দেখতে হবে আমরা ব্যক্তিগত জীবনে ও জাতীয় জীবনে আল্লাহ্র এই ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে পেরেছি কিনা। যদি না পেরে থাকি তবে অবশ্যই আল্লাহ্র রোষানলে আমরা পতিত হবে। এই-ই আল্লাহ্র বিধান।
হযরত ইব্রাহীমের এই চারিত্রিক দৃঢ়তার জন্য আল্লাহ্ তাকে পৃথিবীর আধ্যাত্মিক জগতের নেতৃত্ব দান করেন। হযরত ইব্রাহীম তাঁর বংশধরদের জন্যও এই অনুগ্রহ প্রার্থনা করেন। আল্লাহ্ তাঁর প্রার্থনা কবুল করেন-কিন্তু শর্ত সাপেক্ষে। নৈতিক ও কার্যগত গুণে গুণান্বিত হওয়া হচ্ছে নেতৃত্বের প্রধান শর্ত। পাপাচারী ও জালিমকে নেতৃত্ব লাভের সম্মান দেওয়া হবে না-হোক না কেন সে হযরত ইব্রাহীমের বংশধর। এর ব্যাখ্যা এই যে নেতৃত্ব একদিক দিয়ে আল্লাহ্র খেলাফত বা প্রতিনিধি। আল্লাহ্র অবাধ্য বা বিদ্রোহী, যারা উপরিউক্ত নৈতিক ও কর্মগতগুণে গুণান্বিত হয় না, তাদেরকে এ পদ দেয়া যায় না। এ কারণেই যারা নৈতিক চরিত্র ও কর্মগুণে গুণান্বিত নয়, তাদের স্বেচ্ছায় বা ভোট দানের মাধ্যমে নেতা নিযুক্ত না করা মুসলমানের অবশ্য কর্তব্য।
আয়াতঃ 002.125
যখন আমি কা’বা গৃহকে মানুষের জন্যে সম্মিলন স্থল ও শান্তির আলয় করলাম, আর তোমরা ইব্রাহীমের দাঁড়ানোর জায়গাকে নামাযের জায়গা বানাও এবং আমি ইব্রাহীম ও ইসমাঈলকে আদেশ করলাম, তোমরা আমার গৃহকে তওয়াফকারী, অবস্থানকারী ও রুকু-সেজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখ।
And (remember) when We made the House (the Ka’bah at Makkah) a place of resort for mankind and a place of safety. And take you (people) the Maqâm (place) of Ibrâhim (Abraham) [or the stone on which Ibrâhim (Abraham) stood while he was building the Ka’bah] as a place of prayer (for some of your prayers, e.g. two Rak’at after the Tawâf of the Ka’bah at Makkah), and We commanded Ibrâhim (Abraham) and Ismâ’il (Ishmael) that they should purify My House (the Ka’bah at Makkah) for those who are circumambulating it, or staying (I’tikâf), or bowing or prostrating themselves (there, in prayer).
