শাহরানপুরের ম্যাজিস্ট্রেট বলেছেন, “কতিপয় সুদখোর মহাজন সম্প্রদায়, যাদের নীতি বলতে কিছু নেই তাদেরকে অজ্ঞ দরিদ্র কৃষক শ্রেণীর উপর জোরজুলুম করার সুযোগ করে দেয়ার কারণেই কৃষিজীবীরা আমাদের শাসনকে মন-প্রাণ দিয়ে ঘৃণা করে। আমি দেখেছি সামান্য জমির মালিকেরাই আমাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত প্রতিশোধের মননাভাব পোষণ করছে। কারণ বেনিয়ারা আইন এবং আদালতের সাহায্যেই তাদের দখলী স্বত্ব থেকে উচ্ছেদ করেছে।
শুধুমাত্র জমিদার এবং তালুকদার শ্রেণী পিতৃপুরুষের পেশা থেকে বঞ্চিত হয়নি, নতুন আইন কৃষকদেরও চরম সর্বনাশ করেছে। মহাজনদের কাছে তারা সব সময় ঋণের দায়ে আবদ্ধ থাকতো। কুসিদজীবী বেনিয়ারা জাল জুয়াচুরি করে আইনের বলে দখলী জমি আদালতের সাহায্যে নিজেদের দখলে নিয়ে এলো। একই বিপদের কারণে নয় শুধু, সামন্ততান্ত্রিক প্রশ্রয় এবং আনুগত্য ভূমিহারা কৃষক এবং জমিদারের ঐক্য জোরদার করে তুললো। জমিদারেরা বাস করতেন গ্রামে। মাঝে মধ্যে কৃষকদের ওপর অত্যাচার নির্যাতন করলেও কৃষকেরা বিপদের দিনে জমিদারের পক্ষই সমর্থন করতো। বেনিয়ারা হলো বহিরাগত। তারা লাভের আশায় কৃষকের জমির মালিকানা স্বত্ত্ব ক্রয় করতো। সুতরাং তাদের এবং কৃষকদের মধ্যে কোনো আনুগত্য, স্নেহ কিংবা গভীর অনুভূতির বন্ধন সম্ভব ছিলো না। এখনও কৃষকেরা সামন্ত প্রভুদের সমর্থন করতে বাধ্য।
গ্রামের রাত্রিকালীন চৌকিদার, যাদেরকে বলা হতো পাচি, সরকারের বিরুদ্ধে তাদেরও অভিযোগ আছে। ভূমি মালিক শ্রেণীর ন্যায় তারা পিতৃপুরুষের পেশা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। লখনৌর ওয়ালী বিরজিস কাদের আরেক ফরমানে জনিয়েছেন, “প্রতিটি শহর এবং গ্রাম পাহারা দেয়ার প্রহরীরা জেনে রেখো, ইংরেজ সরকার তোমাদের স্থলে বরকন্দাজ বাহিনী নিয়োগ করে তোমাদেরকে পূর্বপুরুষের পেশা থেকে বঞ্চিত করেছে।” এভাবে গ্রামীণ অর্থনীতি সম্পূর্ণভাবে ওলোট পালোট হয়ে গেলো এবং উৎসাহী ইংরেজ সরকার যে সকল সংস্কার করেছিলো সেগুলো জীবনের সকল ক্ষেত্রে নির্যাতনরূপে দেখা দিলো। ফলে অসন্তোষ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়লো। সময় এবং শিক্ষার প্রভাবে হয়তো ক্ষতি পুরিয়ে নেয়া যেতো। কিন্তু নতুন প্রবর্তিত এ সকল আইনকানুনের একটি ভালো দিকও তারা দেখতে পায়নি।
সীতাপুরের কমিশনার জি. জে. ক্রিশ্চিয়ান সাহেব বিদ্রোহ আরম্ভ হওয়ার পরে রাইক সাহেবের কাছে লেখা এক চিঠিতে আক্ষেপ করে বলেছেন যে সকল গ্রামীণ সংস্কার দারিদ্র্যের দিক দিয়ে যা সকল মানুষকে এক সমান করে ফেলেছে, বিক্ষুব্ধ জেলাসমূহে তারাও এখন ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে। তাদেরকে বশে রাখতে পারার মতো একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিও সরকারের নেই। সেনাবাহিনীর এই রকম অবস্থা। বলতে গেলে মৃতকল্প। একজনও ভদ্রলোক নেই। সামরিক মর্যাদা ছাড়া তাদের আর কিছুই নেই।
নতুন আইন এবং শাসন ব্যবস্থার ফলে এক শ্রেণীর মানুষের উদ্ভব হলো, যারা আইনের সুযোগ নিলো পুরোপুরি এবং এটাকে তাদের অধিকার মনে করলো। কিন্তু খ্রস্টান ধর্ম প্রচারকদের বাড়াবাড়ির ফলেই বিপত্তি ঘনিয়ে আসতে লাগলো। সৈয়দ আহমদ বলেছেন, ১৮৩৭ সালের দুর্ভিক্ষের সময় অনেকগুলো অনাথ শিশুকে খাবার এবং আশ্রয় দেয়া হয়। পরে তাদেরকে খ্রীস্টান করে ফেলা হয়। দেখে জনগণের মনে গভীর সন্দেহের উদ্রেক হলো, সরকার প্রথমে সমস্ত অধিবাসীদেরকে দরিদ্র করবে এবং পরে তাদেরকে খ্রীস্টান বানাবে। হিন্দুস্থানের বাসিন্দারা ভাবতে লাগলো তাদেরকে গরীব করার জন্য ও তাদের ধর্মনাশ করার জন্যই সমস্ত আইন পাশ করা হয়েছে।
আজমগড় বিদ্রোহীদের ঘোষণায়, স্পষ্টতঃ এ মনোভাবের প্রকাশ দেখা যায়। বিধর্মী ব্রিটিশের বিরুদ্ধে সকল শ্রেণীর অধিবাসীকে তারা আহ্বান করেছিলেন। জমিদারদের বলা হলো ব্রিটিশ সরকার জমির দাম বেশি দিয়ে থাকে এবং তা আপনাদের জানা কথা। তা ছাড়া আপনাদের বিরুদ্ধে কোনো চাকর কিংবা চাকরাণী নালিশ করলে কোনো রকমের তদন্ত ছাড়াই আপনাদেরকে আদালতে হাজির হতে হবে। এভাবে আপনাদের সম্মান এবং মর্যাদা ধূলায় লুটিয়ে দেয়া হয়েছে। তাদের আদালতে কোনো নালিশ রুজু করতে চাইলে আপনাদের ষ্ট্যাম্প কিনতে হবে, কোর্টে ফি দিতে হবে, এ সব অত্যন্ত জঘন্য প্রথা। তার বাদেও আপনাকে পথ কর এবং স্কুলের শিক্ষা কর দিতে হবে।
ব্যবসায়ীদের বলা হলো, আপনারাও ভালোভাবে জানেন যে বিধর্মী ইংরেজ নীল, আফিম, কাপড় সমস্ত লাভের ব্যবসা দখল করে বসেছে। অলাভজনক ব্যবসাগুলোই আপনাদের জন্য রয়েছে। আপনাদের তাদের আদালতের আশ্রয় নিতে হয়, স্ট্যাম্প ইত্যাদি ক্রয় করে টাকা খরচ করতে হয়। অধিকন্তু তারা জনগণের কাছ থেকে ডাকটিকেট এবং স্কুলের তহবিলের জন্য টাকা আদায় করে। জমিদারদের মতো আপনাদেরও ছোট-লোকেরা নালিশ করলে তাদের আদালতে নিয়ে গিয়ে আপনাদের সম্মানের হানি করে, দণ্ড দিতে বাধ্য করে।
সরকারি কর্মচারীদের সজাগ না হয়ে উপায় নেই, কারণ সামরিক এবং সাধারণ সমস্ত কম মাইনের অসম্মানের চাকুরি ভারতীয়দের আর বেশি মাইনের, মর্যাদার সমস্ত চাকুরিতে ইউরোপীয়রাই বহাল হয়!” কারিগর শ্রেণীর চেয়ে দেখুন, ইউরোপীয়রা সমস্ত রকমের জিনিস ইউরোপ থেকে নিয়ে আসে। আপনাদের হাতের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে, ঘোষণার উপসংহারে বলা হয়েছে, উভয় সম্প্রদায়ের ধর্মবেত্তা পণ্ডিত এবং মৌলানারা ভুলে যাবেন না যে, ব্রিটিশেরা হলো আপনাদের ধর্মের দুশমন। আপনাদের আমাদের সঙ্গে যোগ দিয়ে সৃষ্টিকর্তার অনুগ্রহ লাভে ধন্য হওয়া উচিত। নয়তো আপনারা পাপী বলে বিবেচিত হবেন।
