দুর্ভাগ্যবশত : এ অসন্তোষ শুধুমাত্র সেপাইদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রইলো না। পদাতিক বাহিনীরও অভিযোগ ছিলো। সিন্ধু প্রদেশে ছাউনি ফেলতে হবে, অথচ তখন বাঙালি রেজিমেন্টগুলো বিশেষ ভাতা ছাড়া সেখানে যেতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করলো। সে সময়ে মাদ্রাজ সরকার দু’রেজিমেন্ট পদাতিক বাহিনী পাঠাতে সিদ্ধান্ত নিলেন। মাদ্রাজের গভর্ণর যিনি, তিনি প্রধান সেনাপতিও ছিলেন, ব্রহ্মদেশে গেলে যে সুযোগ-সুবিধা পেতো সে সুবিধা দেয়ার ব্যবস্থা করলেন সেপাইদের। এই ব্যবস্থা আনুসারে মাদ্রাজের সেপাইরা তাদের পরিবারবর্গকে সেখানে রেখে নিজেদের খরচের অল্পস্বল্প টাকা পয়সা মাত্র সম্বল করে বোম্বাইয়ে এসে হাজির হলো। এখানে এসে তাদেরকে হতবাক হতে হলো। তারা জানতে পারলো ভারত সরকার মাদ্রাজের গভর্ণরের প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে রাজী নন। কারণ তা বেঙ্গল রেগুলেশানের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তারা সরকারের এ ব্যবস্থাকে চূড়ান্ত নিষ্ঠুর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ বলে মনে করলো। সেপাইরা চরম বিশৃঙ্খলভাবে খাদ্যের দাবি করতে থাকে। কিছু টাকা অগ্রিম দেয়া হলো। অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে টাকা তারা গ্রহণ করলো। এখানে ব্যাপারটা শেষ হয়ে গেলো।
তবে ভারতের গভর্ণর জেনারেল একটি প্রদেশের গভর্ণরের প্রতিশ্রুতিকে সম্মান করার ফলে সেপাইরা গোটা সরকারকেই অবিশ্বাস করতে আরম্ভ করলো। এর জন্য সেপাইদের কোনো দোষ দেয়া চলে না। তারা শুধু দেখলো, যে সরকারের অধীনে তারা চাকুরি করে, সে সরকারের প্রতিশ্রুতির উপর আর নির্ভর করবার কোনো উপায় নেই। লর্ড এলেনবরোও নিজের ভাবে ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহে ইন্ধন জুগিয়েছিলেন।
লর্ড ডালহৌসীর বড়লাট থাকার সময়ে ১৮৪৯ সালে একই ব্যাপার ঘটেছিলো। কতিপয় রেজিমেন্ট রাওয়ালপিণ্ডিতে আলাদা ভাতা দাবি করলো। ভাতা ছাড়া তারা তাদের মাসিক মাইনে নিতে রাজী হলো না। তৎকালীন প্রধান সেনাপতি স্যার চার্লস নেপিয়ের শক্তি প্রয়োগ করে সেপাইদের বিদ্রোহ দমন করলেন। সতর্কমূলক ব্যবস্থা অবলম্বন করেই তিনি সন্তুষ্ট রইলেন না। তিনি অনুসন্ধানে বের হলেন এবং সেপাইদের মধ্যে অসন্তোষ লক্ষ্য করলেন। ডিসেম্বর মাসে ৬৬নং রেজিমেন্ট গোবিন্দগড়ে বিদ্রোহ করে বসলো। কিন্তু অশ্বারোহী বাহিনীর সহায়তায় সে বিদ্রোহ সম্পূর্ণভাবে দমন করা হলো। নেপিয়ের দেখতে পেলেন যে সেপাইদের সত্যিকারের অভিযোগ রয়েছে। তাদের অসুবিধার ক্ষতিপূরণ না করে নতুন অন্তর্ভুক্ত অঞ্চলে তাদেরকে বদলী করা অসঙ্গত। তাই তিনি গভর্ণর জেনারেলের আদেশ মুলতবী রেখে পুরোনো কায়দা অনুসারে সেপাইদের উচ্চহারে ভাতা দিতে নির্দেশ দান করলেন। লর্ড ডালহৌসী নেপিয়েরের এই কাজকে অনুমোদন করলেন না। তাঁর নির্দেশ অমান্য করার জন্য তিনি নেপিয়েরকে তিরস্কার করলেন। নেপিয়ের এই অপমান হজম করতে না পেরে প্রধান সেনাপতির পদ থেকে ইস্তফা দিলেন। সেপাইদের মধ্যে তার কি রকম প্রতিক্রিয়া হয়েছিলো অনুমান করতে মোটেই অসুবিধা হয় না।
ধর্মীয় ভীতি ছাড়াও সেপাইদের অনেক অভাব অভিযোগ ছিলো। মাইনে এবং ভাতাই হলো সরকার এবং সেপাইদের মধ্যে একমাত্র বন্ধন। কিন্তু তাও এমন কিছু আকর্ষণীয় নয়। পদাতিক সেপাইদের মাইনে ছিলো মাসিক সাত টাকা। অশ্বারোহী সেপাইরা প্রতি মৌসুমের জন্য পেতো সাতাশ টাকা এবং এ টাকা থেকেই খরচ করে আপনাপন ঘোড়া কিনতে হতো। সাদা সেপাইদের তুলনায় তাদের বেতন বেদনাদায়ক ভাবে অল্প ছিলো। হোমস বলেছেন, হায়দার আলীর মতো সামরিক প্রতিভার হলেও একজন সেপাইকে কিছুতেই অধীনস্থ একজন ইংরেজ সেপাইর মাইনে দেয়া হবে না। একজন অবসরপ্রাপ্ত অফিসারের মতে ভারতের মোট সৈন্যসংখ্যা ৩,১৫,৫২০ জন। তাতে খরচ পড়ে ৯৮,০২,৮৩৫ পাউণ্ড। তার মধ্যে ৫১,৩১৫ জন ইউরোপীয় সৈন্য এবং অফিসারের পেছনে ৫৬,৬৮,১১০ পাউণ্ড খরচ হয়ে যায়। কিন্তু ইউরোপীয় সৈন্যরা কোনো কাজ করে না। তারা কীভাবে থাকে, খায় এবং কীভাবে মাইনে দেয়া হয়, অন্যান্য সেপাইদের তা জানা নয়। এই বৈষম্যের কারণে কর্তৃপক্ষের প্রতি সেপাইদের বিশ্বাস ক্রমশ: শিথিল হয়ে আসে।
এটা বিশ্বাস করা হতো যে মাইনে অল্প হলেও সেপাইদের অবস্থা বেশ স্বচ্ছল। তাদের প্রয়োজন অল্প, জীবনযাত্রার মান অনুন্নত। কিন্তু তাদের প্রথম কয় মাসের মাইনে অফিসারদের অন্যায়ভাবে তোষণ করতেই ব্যয় হয়ে যায়। সীতারাম বলেছেন, ড্রিল হাবিলদার এবং তাঁর রেজিমেন্টের ইউরোপীয় সার্জেন্ট তাকে পছন্দ করতো না। কারণ ভর্তি হবার সময়ে তিনি উপযুক্ত ফি দেননি। এই ফির পরিমাণ ছিলো ১৬ টাকা যার অধীনে পয়লা চাকুরি করতে হতো সে ইউরোপীয়ান এ টাকা থেকে ৫ কিংবা ৬ টাকা পেতেন। তিনি আরো বলেছেন, মাসে ৭ টাকা মাইনে দিয়ে একজন পাঞ্জাবী অথবা একজন মুসলমান চলতে পারে না।
বেরিলীর অশ্বারোহী বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন বাঙালি কেরাণীর বর্ণনা থেকে আমরা জানতে পারি, সেপাইদেরকে সামরিক পোশাকের জন্য টাকা দিতে হতো। রেজিমেন্টের বাজারের বানিয়াদের কাছ থেকে দৈনিক রসদ সংগ্রহ করতে হতো। মাইনের দিন রসদ ইত্যাদির দাম কেটে রাখার পর যা বাকী থাকে সৈনিকদের হাতে তা আসতো। কোনো সেপাই মাসে এক টাকা আট আনা এবং কোনো কোনো সেপাই কয়েক আনার বেশি সঞ্চয় করতে পারতো না। শুধু ডাল রুটি খেয়েই তাদের জীবনধারণ করতে হতো। অল্প মাইনের কারণে কোনো রকমের ভাল খাবার-দাবার তাদের ভাগ্যে জুটতো না বললেই চলে। কঠিন কঠোর জীবনযাপন করতে হতো সেপাইদের। নয় টাকার বেশি কখনো আশা করতো না। সেও পদোন্নতি হলে। উৎকর্ষ বিচার না করে চাকুরির মেয়াদ অনুসারেই পদোন্নতি হতো। অশ্বারোহী সেপাইদের অবস্থাও সাধারণ সেপাইদের চাইতে এমন কিছু ভালো ছিলো না। তারা একুশ থেকে ত্রিশ টাকা পর্যন্ত মাইনে পেতো। তা থেকে অনেকভাবে টাকা কেটে রাখা হতো।
