কৃষিকর্ম সংক্রান্ত নানাপ্রকার দেবদেবীর পূজার কথাও আগেই বলিয়াছি। আখমাড়াই ঘরের (বা যন্ত্রের?) যিনি ছিলেন দেবতা তিনি পণ্ডাসুর (পুণ্ড্রাসুর) নামে খ্যাত, আর পুণ্ড্র বা পুঁড় যে একপ্রকারের আখ তাহা তো অন্য প্রসঙ্গে একাধিকবার বলিয়াছি। উত্তর ও পশ্চিম-বঙ্গে এই পণ্ডাসুরের পূজা এখনও প্রচলিত; সেখানে তিনি পড়াসর (সংস্কৃতিকরণ পরাশর) নামে খ্যাত। এর পূজার অর্বাচীন একটি মন্ত্র এইরূপ :
পণ্ডাসুর ইহাগচ্ছ ক্ষেত্রপাল শুভপ্রদ।
পাহি মামিক্ষুযত্রৈস্ত্বং তুভ্যং নিত্যং নিত্যং নমো নমঃ।।
পণ্ডাসুর নমস্তুভ্যামিক্ষুবাটি নিবাসিনে।
যজমান হিতার্থাং গুড়বৃদ্ধিপ্রদায়িনো।।
০২.০৪ যাত্রা (রথযাত্রা, স্নানযাত্রা, দোলযাত্রা প্রভৃতি)
ধ্বজা বা কেতনপূজার মত নানাপ্রকারের যাত্রাও বাঙলার আদিবাসী কোমগুলির অন্যতম প্রধান উৎসব বলিয়া গণ্য করা হইত। রথযাত্রা, স্নানযাত্রা, দোলযাত্রা প্রভৃতি ধর্মোৎসব মূলত তাঁহাদেরই; পরে ক্রমশ ইহাদের আর্যীকরণ নিষ্পন্ন হইয়াছে। লৌকিক ধর্মোৎসবে এই ধরনের যাত্রা বা সচল নৃত্যগীতসহ সামাজিক ধর্মানুষ্ঠানের বিবরণ কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র ও প্রাচীন বৌদ্ধ সংযুত্তনিকায়-গ্রন্থে জানা যায়।
আর্য ব্রাহ্মণ ও বৌদ্ধ উচ্চকোটির লোকেরা বোধ হয় এই ধরনের সমাজোৎসব ও যাত্রা খুব পছন্দ করিতেন না; সেই জন্যই সম্রাট অশোক সমাজোৎসবের বিরুদ্ধে অনুশাসন প্রচার করিয়াছিলেন। কিন্তু কোনও রাজকীয় অনুশাসনই লোকায়েত ধর্মের এই লৌকিক প্রকাশকে চাপিয়া রাখিতে পারে নাই; জনসাধারণের ধর্মোৎসব ক্রমশ বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্য সমাজে স্বীকৃতি লাভ করিয়াছিল, এবং তাহারই ফলে রথযাত্রা, স্নানযাত্রা, দোলযাত্রা প্রভৃতি ধর্মোৎসবের প্রচলন আজও অব্যাহত। প্রাচীন বাঙলাদেশে প্রচলিত স্নানযাত্রাগুলির মধ্যে অগস্ত্যর্ঘ্যযাত্রা (দশহরার স্নান), অষ্টমী স্নানযাত্রা, মাঘীসপ্তমী স্নানযাত্রা প্রভৃতির কথা কালবিবেক-গ্রন্থে জানা যায়।
০২.০৫ ব্রতোৎসব
যাত্রা, ধ্বজপূজা প্রভৃতি মতো ব্রতোৎসবও বাঙালীর ধর্মজীবনে একটি বড় স্থান অধিকার করিয়া আছে। এই ব্ৰন্তোৎসবের ইতিহাস অতি জটিল ও সুপ্রাচীন তবে এই ধরনের ধর্মোৎসব যে প্রাক-বৈদিক আদিবাসী কোমদের সময় হইতেই সুপ্রচলিত ছিল এ-সম্বন্ধে সংশয় বোধ হয় নাই। আর্য-ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতি যাহাদের বলিয়াছে ‘ব্রাত্য’ বা ‘পতিত’ তাহারা কি ব্ৰতধর্ম পালন করিতেন। বলিয়াই ব্রাত্য বলিয়া অভিহিত হইয়াছেন এবং সেইজন্যই কি আর্যরা তাঁহাদের পতিত বলিয়া গণ্য করিতেন? বোধ হয় তাহাই।* অন্তত সাংস্কৃতিক জনতত্ত্বের আলোচনায় ক্রমশ এই তথ্যই যেন সুস্পষ্ট হইতেছে যে, আমাদের গ্রাম্য-সমাজে বিশেষভাবে নারীদের ভিতর, যে-সব ব্ৰত আজও প্রচলিত আছে তাহার অধিকাংশই অবৈদিক, অস্মার্ত, অপৌরাণিক ও অব্রাহ্মণ্য এবং মূলত গুহ্য যাদু ও প্রজনন শক্তির পূজা, যো-পূজা গ্রাম্য কৃষিসমাজের সঙ্গে একান্ত সম্পূক্ত। ঋগ্বেদ হইতে আরম্ভ করিয়া আমাদের প্রাচীন ধর্মশাস্ত্র, ধর্মসূত্র কোথাও কোনও প্রচলিত ব্ৰতের কোনও উল্লেখ পর্যন্ত নাই। আদি বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্যধর্ম যে এই ধর্মানুষ্ঠানকে স্বীকার করিত না এতথ্য পরিষ্কার। অশোক তো স্পষ্টই বলিয়াছেন, গ্ৰাম্য লোকায়াত ধর্মের আচারানুষ্ঠান তিনি পছন্দ করিতেন না; বিশেষত নারীদের মধ্যে প্রচলিত নানাপ্রকারের মঙ্গলানুষ্ঠান প্রভৃতি তাহার বড়ই অগ্ৰীতিকর ছিল। তিনি তঁহাদের আহ্বান করিয়াছিলেন এই সব মঙ্গলানুষ্ঠান ছাড়িয়া তাহারই অনুমোদিত ধর্মমঙ্গলের পথে চলিবার জন্য। নারীসমাজে প্রচলিত এইসব মঙ্গলানুষ্ঠান বলিতে অশোক ব্ৰতানুষ্ঠানের কথাই বলিয়াছিলেন, সন্দেহ নাই, আর, সাধারণ মঙ্গলানুষ্ঠান বলিতে মধ্যযুগীয় বাঙলার মনসামঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গল ইত্যাদি জাতীয় পুরাপ্ৰচলিত পূজানুষ্ঠানের ইঙ্গিতই হয়তো করিয়া থাকিবেন। কিন্তু সে যাহাই হউক, বিষ্ণুপৰ্ব্বাণ, অগ্নিপুরাণ প্রভৃতি প্রধান প্রধান পুরাণগুলি যখন সংকলিত হইতেছিল তখন এবং বোধ হয় তাহার কিছুকাল আগে হইতেই ব্ৰতানুষ্ঠানের প্রতি আর্য-ব্রাহ্মণ্য ধর্মের মনোভাবের পরিবর্তন হইতেছিল, কারণ এই সব পুরাণে দেখিতেছি, লৌকিক অনেক ব্ৰতানুষ্ঠান ব্ৰাহ্মণ্যধর্মের অনুমোদন লাভ করিয়া ঐ ধর্মের কুক্ষিগত হইয়া পড়িয়াছে এবং ব্রাহ্মণেরা সেই সব অবৈদিক, অস্মার্তা অনুষ্ঠানে পৌরোহিত্যও করিতেছেন। প্রাক-আর্য ও অনার্য নরনারীদের ক্রমবর্ধমান সংখ্যায় আর্য-ব্রাহ্মণ্য সমাজ-সীমায় গৃহীত হইবার ফলেই ইহা সম্ভব হইয়াছিল, সন্দেহ নাই। বাঙলাদেশে সমস্ত আদি ও মধ্যযুগ ব্যাপিয়া শতাব্দীর পর শতাব্দীর ভিতর দিয়া বহু অবৈদিক, অস্মার্ত, অপৌরাণিক ব্ৰতানুষ্ঠান এইভাবে ক্রমশ ব্রাহ্মণ্যধর্মের স্বীকৃতি লাভ করিয়াছে; আজও করিতেছে। যে-সব ব্ৰত এই ধরনের স্বীকৃতি ও মর্যাদা লাভ করিয়াছে তাহাদের অনুষ্ঠানে ব্ৰাহ্মণ পুরোহিতের প্রয়োজন হয়, যে-সব করে নাই সে-সব ক্ষেত্রে কোনও পুরোহিত্যেরই প্রয়োজন হয় না; গৃহস্থ মেয়েরাই সে-সব পূজা নিষ্পন্ন করিয়া থাকেন। আমাদের চোখের সম্মুখেই দেখিতেছি, পঁচিশ বৎসর আগে গ্রামাঞ্চলে যে সব ব্ৰতানুষ্ঠানে পুরোহিত্যের প্রয়োজন হইত না আজ সে-সব ক্ষেত্রে পুরোহিত আসিয়া মন্তর পড়িতে আরম্ভ করিয়াছেন, অর্থাৎ সেই সব ব্ৰত ব্ৰাহ্মণ্যধর্মের স্বীকৃতি লাভ করিয়াছে। তবু, আজও যে-সব ব্ৰত এই স্বীকৃত-সীমার বাহিরে তাহাদের সংখ্যা কম নয়; সম্বৎসর ব্যাপিয়া মাসে মাসে এই সব বিচিত্ৰ ব্ৰতের অনুষ্ঠান আমাদের গ্রাম্য সমাজ-জীবনকে এখনও কতকটা সচল ও সজীব করিয়া রাখিয়াছে এবং বাঙালীর ধর্মকর্মে এই সব ব্ৰতানুষ্ঠান খুব বড় একটা স্থান অধিকার করিয়া আছে। অগণিত এই সব ব্ৰতের মধ্যে কয়েকটি তালিকাবদ্ধ করিতেছি :
