বাঙালীর ইতিহাসের আদিপর্বে এই সমন্বয় সাক্ষ্য খুব বেশি উপস্থিত নাই, কিন্তু তখনকার দিনের বাঙালী সমাজে ও বাঙলা সংস্কৃতিতে এর চেয়ে বড় সত্য কমই আছে। বস্তুত, বাঙালীর ধর্মকর্মের গোড়াকার ইতিহাস হইতেছে। রাঢ়-পুণ্ড্র-বঙ্গ প্রভৃতি বিভিন্ন জনপদগুলির অসংখ্য জন ও কোমের, এক কথায় বাঙলার আদিবাসীদেরই পূজা, আচার, অনুষ্ঠান, ভয় বিশ্বাস, সংস্কার প্রভৃতির ইতিহাস। শুধু বাঙালীরই বা বলি কেন, ভারতবর্ষের সকল প্রদেশের লোকদের ধর্মকর্ম সম্বন্ধেই এ-কথা সত্য। এ-তথ্য সর্বজনস্বীকৃত যে, আর্য-ব্রাহ্মণ্য বা বৌদ্ধ, জৈন ইত্যাদি সম্প্রদায়ের ধর্মকর্ম, শ্ৰাদ্ধ, বিবাহ, জন্ম, মৃত্যু প্রভৃতি সংক্রান্ত বিশ্বাস, সংস্কার ও আচারানুষ্ঠান, নানা দেবদেবীর রূপ ও কল্পনা, আহার-বিহারের ছোয়াছুয়ি অনেক কিছুই আমরা সেই আদিবাসীদের নিকট হইতেই আত্মসাৎ করিয়াছি। বিশেষভাবে, হিন্দুর জন্মান্তরবাদ, পরলোক সম্বন্ধে ধারণা, প্রেততত্ত্ব, পিতৃতর্পণ, পিণ্ডদান, শ্ৰাদ্ধাদি সংক্রান্ত অনেক অনুষ্ঠান, আভ্যুদয়িক ইত্যাদি সমস্তই আমাদেরই প্রতিবাসীর এবং আমাদের অনেকেরই রক্তস্রোতে বহমান সেই আদিবাসী রক্তের দান। হিন্দুর ধর্মকর্মের গােড়ায় এ কথাটা না জানিলে অনেকখানিই অজানা থাকিয়া যায়।
০২.০ আর্যপূর্ব ও আর্যেতর ধর্ম
বাঙালীর ইতিহাস বলিতে বসিয়া বাঙলার কথাই বিশেষভাবে বলি; সমস্ত ভারতবর্ষে ছড়াইয়া পড়িয়া লাভ নাই। গ্রন্থারম্ভে এক অধ্যায়ে বলিয়াছি, ভারতীয় আদিবাসীরা অন্যান্য দেশের অনেক আদিবাসীদের মতো, বিশেষ বৃক্ষ, পাথর, পাহাড়, ফল, ফুল, পশু, পক্ষী, বিশেষ বিশেষ স্থান ইত্যাদির উপর দেবত্ব আরোপ করিয়া পূজা করিত; এখনও খাসিয়া, মুণ্ডা, সাঁওতাল, রাজবংশী, বুনো, শবর ইত্যাদি কোমের লোকেরা তাঁহাই করিয়া থাকে। বাঙলাদেশে হিন্দু-ব্ৰাহ্মণ্য সমাজের মেয়েদের মধ্যে, বিশেষত পাড়াগাঁয়ে, গাছপূজা এখনো বহুল প্রচলিত, বিশেষভাবে তুলসী গাছ, সেওড়া গাছ ও বট গাছ। অনেক পূজায় ও ব্ৰন্তোৎসবে গাছের একটা ডাল আনিয়া পুঁতিয়া দেওয়া হয়, এবং ব্রাহ্মণ্যধৰ্মস্বীকৃত দেবদেবীর সঙ্গে সেই গাছটিরও পূজা হয়। আমাদের সমস্ত শুভানুষ্ঠানে যে আম্রপল্লবে ঘটের প্রয়োজন হয়, যে কলা-বৌ পূজা হয়, অনেক ব্ৰতে যে ধানের ছড়ার প্রয়োজন হয়, এ-সমস্তই সেই আদিবাসীদের ধর্মকর্মানুষ্ঠানের এবং বিশ্বাস ও ধারণার স্মৃতি বহন করে। একটু লক্ষ্য করিলেই দেখা যায়, এই সব ধারণা, বিশ্বাস ও অনুষ্ঠান আদিম কৃষি ও গ্রামীণ সমাজের গাছ-পাথর পূজা, প্রজনন শক্তির পূজা, পশুপক্ষীর পূজা প্রভৃতির স্মৃতি বহন করে। বিশেষ বিশেষ ফলমূল সম্বন্ধে আমাদের সমাজে যে সব বিধিনিষেধ প্রচলিত, যে সব ফলমূল- যেমন আক, চাল-কুমড়া, কলা ইত্যাদি— আমাদের পূজাৰ্চনায় উৎসর্গ করা হয়, আমাদের মধ্যে যে নবান্ন উৎসব এবং আনুষঙ্গিক অনুষ্ঠান প্রচলিত, আমাদের ঘরের মেয়েরা যে সব ব্ৰতানুষ্ঠান প্রভৃতি করিয়া থাকেন, বস্তুত, আমাদের দৈনন্দিন অনেক আচারানুষ্ঠানই বাঙলার আদিমতম জন ও কোমদের ধর্মবিশ্বাস ও আচারানুষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত। আমাদের নানা আচারানুষ্ঠানে, ধর্ম, সমাজ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আজও ধান, ধানের গুচ্ছ, ধানদুর্বার আশীৰ্ব্বাদ, কলা, হলুদ, সুপারি, পান, নারিকেল, সিন্দুর, কলাগাছ, ঘট, ঘটের উপর আঁকা প্রতীক চিহ্ন, নানা প্রকার আলপনা, গোবর, কড়ি প্রভৃতি অনেকখানি স্থান জুড়িয়া আছে। বস্তুত, আমাদের আনুষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে যাহা কিছু শিল্প-সুষমাময় তাহার অনেকখানিই এই আদিবাসীদের সংস্কার ও সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত। বাঙলাদেশে, বিশেষভাবে পূর্ব-বাঙলায়, এক বিবাহ-ব্যাপারেই পানখিলি, গাত্ৰহরিদ্রা, গুটিখেলা, ধান ও কড়ির স্ত্রী আচার, খৈ ছড়ানো, লক্ষ্মীর ঝাপি স্থাপনা, দধিমঙ্গল প্রভৃতি সমস্তই আদিবাসীদের দান বলিয়া অনুমিত। বস্তুত, বিবাহ-ব্যাপারে সম্প্রদান, যজ্ঞ, এবং সপ্তপদী অর্থাৎ মন্ত্র অংশ ছাড়া আর সবটাই অবৈদিক, অস্মার্ত ও অব্রাহ্মণ্য। অন্যান্য অনেক ব্যাপারেও তাই। পূজাৰ্চনার মধ্যে ঘটলক্ষ্মীর পূজা, ষষ্ঠীপূজা, মনসাপূজা, লিঙ্গ-যোনী পূজা, শ্মশান-শিব ও ভৈরবের পূজা, শ্মশান-কালী পূজা প্রভৃতির প্রায় সব বা অধিকাংশই মূলত এই সব আদিবাসীদের ধর্মকর্মানুষ্ঠান হইতেই আমরা গ্রহণ করিয়াছি, অল্পবিস্তর রূপান্তর ও ভাবান্তর ঘটাইয়া। এই সব আচারানুষ্ঠানের প্রত্যেকটির সুবিস্তৃত বিশ্লেষণ এবং ইহাদের রহস্য উদঘাটন আমাদের সাংস্কৃতিক জনতত্ত্বের আলোচনা-গবেষণার বর্তমান অবস্থায় সম্ভব নয়; মাত্র দুই চারিটি আচারানুষ্ঠানের জীবনেতিহাস আমরা জানি, যেমন চড়কপূজা, হােলী, ষষ্ঠীপূজা, চণ্ডী-দু্র্গা-কালী প্রভৃতি মাতৃকাতন্ত্রের পূজা, মনসাপূজা, পৌষপার্বণ, নবান্ন উৎসব ইত্যাদি। আগেও বলিয়াছি, এবং একটু লক্ষ্য করিলেই দেখা যায়, এই সব আচারানুষ্ঠানের অনেকগুলিই মূলত গ্রামীণ কৃষিজীবী সমাজের প্রধানতম ও আদিমতম ভয়-বিস্ময়-বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত। সকল কথা বলিবার বা আলোচনা-গবেষণার স্থান ও সুযোগ এই গ্রন্থ নয়, উপায়ও নাই; তবু ইঙ্গিতটুকু ধরিয়া না দিলে বাঙালীর ধর্ম-কর্মানুষ্ঠানের গোড়ার কথাটি, তাহার অন্তর্নিহিত অর্থটি বুঝা যাইবেন।
