বাঙালী ব্রাহ্মণদের দেহদৈর্ঘ্যও মধ্যমাকৃতি; মুণ্ডের আকৃতিও মাধ্যমিক (mesocephalic), অর্থাৎ গোলও নয়, দীর্ঘও নয়; নাসিকা তীক্ষ্ণ ও উন্নত। বিরজাশংকর গুহ মহাশয় রাঢ়ীয় বাহ্মণদের যে পরিমিতি গ্রহণ করিয়াছিলেন, তাহাতে এই বৈশিষ্ট্যগুলি ধরা পড়িয়ছিল। কিন্তু, সাম্প্রতিক কালে যাহারা এই বর্ণের মুণ্ডাকৃতি বিশ্লেষণ করিয়াছেন তাহারা মনে করেন যে, উত্তর বা দক্ষিণ রাঢ়ীয়, বারেন্দ্র বা বৈদিক—সকল পর্যায়ের ব্রাহ্মণদের মধ্যেই গোল মাথার (brachycephalic) একটা সুস্পষ্ট ধারা একেবারে অস্বীকার করা য়ায় না; কায়স্থদের মধ্যেও তাহাই সঙ্গে সঙ্গে এই তিন পর্যায়ের ব্রাহ্মণদের মধ্যে আবার চ্যাপটা বিস্তৃত নাসার (platyrhine) একটা অস্পষ্ট ধারাচিহ্নও অনস্বীকার্য, যদিও গোল এবং মধ্যমাকৃতির মুণ্ড ও উন্নত সুগঠিত নাসাই সাধারণ বৈশিষ্ট্য। কিন্তু এই বিশ্লেষণের পরেও এ কথা বলা প্রয়োজন যে, ব্রাহ্মণদের মধ্যে দীর্ঘ মস্তিষ্কাকৃতি(dococephaic) স্বল্প হইলেও একটা অনুপাত ধরা পড়ে। এ কথা সাধারণভাবে অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের পরিমিতিবৈশিষ্ট্য সম্বন্ধেও সত্য; কারণ, আগেই বলিয়াছি, প্রধান ধারার উল্লেখই সম্ভব, উপধারাগুলির ইঙ্গিত দেওয়া যায় মাত্র।
ব্রাহ্মণদের দেহগঠন সম্বন্ধে আমরা যাহা জানি, বাঙালী কায়স্থদের দেহবৈশিষ্ট্য সম্বন্ধেও তাহা সত্য। বস্তুত, মুণ্ড ও নাসাকৃতির দিক হইতে ব্রাহ্মণ ও কায়স্থের মোটামুটি কোনও পার্থক্যই নৃতত্ত্ববিদের চোখে ধরা পড়ে না; নরতত্ত্বের দিক হইতে ইহারা সকলেই একই নরগোষ্ঠী। রাহ্মণদের মতো ইহারাও মধ্যমাকৃতি, ইহাদেরও চুলের রং কালো, চোখের মণি মোটামুটি পাতলা হইতে ঘন বাদামী যাহা সাধারণ দৃষ্টিতে কালো বলিয়াই মনে হয়। গায়ের রং পাতলা বাদামী হইতে আরম্ভ করিয়া পাতলা গৌর। কাহারও কাহারও মতে রাঢ়ীয় কায়স্থদের মধ্যে দীর্ঘ অনুন্নত করোটির প্রাধান্য দেখা যায়, মূধ্যমাকৃতির বৈশিষ্ট সেখানে কম। কিন্তু এই কমবেশি যেহেতু মানদণ্ডনির্ভর এবং যেহেতু বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন মানদণ্ড ব্যবহার করিয়া পরিমিতি গ্রহণ করা হইয়াছে, সেই হেতু শেষোক্ত মত সম্বন্ধে নিশ্চয় করিয়া কিছু বলা যায় না।
বাহ্মণেতর অন্যান্য যে সমস্ত জাতির দেহবৈশিষ্ট্য-পরিমিতি গ্রহণ করা হইয়াছে, তাঁহাদের মধ্যে কায়স্থ, গোয়ালা, কৈবর্ত, পোদ, বাগদী, বাউরী, চণ্ডাল, মালো, মালী, মুচি, রাজবংশী, সদগোপ, বুনা, বাঁশফোঁড়, কেওড়া, যুগী, সাঁওতাল, নমঃশূদ্র, ভূমিজ, লোহার মাঝি (বেদে), তেলি, সুবর্ণবণিক, গন্ধবণিক, ময়রা, কলু, তত্ত্ববায়, মাহিষ্য, তাম্লী, নাপিত এবং রজকই প্রধান। ইহা ছাড়া যশোহর ও খুলনা অঞ্চলের নলুয়া (মুসলমান) এবং পূর্ব বাঙলার মুসলমানদের কিছু কিছু পরিমিতিও গণনা করা হইয়াছে। কিন্তু সমস্ত জাত-এরই পরিমিতি-গণনা সমসংখ্যায় হইয়াছে এবং দেশের সর্বত্র সমভাবে বিস্তৃত হইয়াছে, এ কথা বলা যায় না। ব্রাহ্মণ, কায়স্থ ও পাদদের পরিমিতি গণনা করিয়াছেন বিরজাশংকর গুহ মহাশয়। পশ্চিম বাঙলার কয়েকটি জেলার সাঁওতাল, ভূমিজ, বাউর, বাগদী, লোহার মাঝি, তেলি, সুবর্ণ ও গন্ধ-বণিক, ময়রা, কলু, তন্তুবায়, মাহিষ্য, তামলী, নাপিত, রজক ইত্যাদি গণনা করিয়াছেন ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত মহাশয়; পারেন্দ ব্রাহ্মণদের পরিমিতি লইয়াছেন তারকচন্দ্র রায়চৌধুরী এবং হারাণচন্দ্র চাকলাদার লইয়াছেন কলিকাতার ব্রাহ্মণ ও বীরভূমের মুচিদের। রিজলি গণনা করিয়াছেন সদগোপ, রাজবংশী, মুচি, মালী, মালো, কৈবর্ত, গোয়ালা, চণ্ডাল, বাউরী, বাগদী এবং পূর্ব বাঙলার মুসলমানদের, কিন্তু অমুসলমান নিদর্শনগুলি কোথা হইতে আহৃত তাহা বলেন নাই। মীনেন্দ্রনাথ বসু মহাশয় গণনা করিয়াছেন উত্তর, মধ্য ও দক্ষিণ বাঙলার আটটি জেলার, বুনা, নলুয়া (মুসলমান), বাঁশফোঁড়, মুচি, রাজবংশী, মালো (এই দুই বর্ণেরই ব্যবসা মাছ ধরা ও মাছ বিক্রি), কেওড়া ও যুগীদের। ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, সদগোপ, কৈবর্ত, রাজবংশী, পোদ এবং বাগদীদের পরিমিতি গণনা করিয়াছেন প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ। মোটামুটিভাবে এইসব বর্ণ ও শ্রেণীগুলির মধ্যে বৃহদ্ধর্মপুরাণের উত্তম সংকর, মধ্যম সংকর ও অন্ত্যজ—এই বিভাগ তিনটির প্রতিনিধিদের অনেকেরই সন্ধান মিলিবে। নমঃশূদ্রবর্ণের যে অসংখ্য জনসাধারণ মধ্য ও বর্তমান যুগের একটি বলিষ্ঠ বর্ণ ও শ্রেণী-স্তর তাহাদের দেহগঠনের পরিমিতি যাহারা গ্রহণ করিয়াছেন, তাঁহাদের মধ্যে হাটন ও রিজলির নাম করিতেই হয়।
ইঁহাদের সকলের সম্মিলিত বিশ্লেষণ হইতে দেহগঠন, চোখ ও চামড়ার রং, কেশ-বৈশিষ্ট্য প্রভৃতি সম্বন্ধে কতকগুলি তথ্য সহজেই ধরা পড়ে। ইহাদের মধ্যে সর্বাগ্রে নমঃশূদ্রদের কথা বলিতেই হয়, কারণ ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, বৈদ্য প্রভৃতি উচ্চবর্ণের লোকদের সঙ্গে নরতত্ত্বের দিক হইতে ইহাদের কোনও পার্থক্য নাই এ কথা প্রায় নিঃসন্দেহে বলা যায়। উচ্চবর্ণের লোকদের মতো ইহারাও দৈর্ঘ্যে মধ্যমাকৃতি, মুণ্ডের গঠন মাধ্যমিক, এবং নাসা তীক্ষ্ণ ও উন্নত; ইহাদের চোখ ও চামড়ার রঙও মোটামুটিভাবে ব্রাহ্মণ, বৈদ্য, কায়স্থদেরই মতো, অথচ স্মৃতিশাসিত হিন্দুসমাজে ইহাদের স্থান এত নিচে যে নরতত্ত্বের পরিমিতি-গণনার মধ্যে তাহার কোনও যুক্তি খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। সে যুক্তি হয়তো পাওয়া যাইবে জাত-সংঘর্ষের ইতিহাসের মধ্যে অথবা রাষ্ট্ৰীয় ও সামাজিক ইতিহাসের মধ্যে।
