১২৮ গুপ্ত সংবতে (৪৪৭ খ্ৰীষ্টাব্দে) বর্তমান বগুড়া জেলার অন্তর্গত প্রাচীন শৃঙ্গবেরবীথির পূর্ণকৌশিকা অধিকরণে কিছু ভূমি ক্রয়বিক্রয় ও দানক্রিয়া হয়েছিল; ক্রয়বিক্রয়ের ব্যাপারটা পটীকৃত করেছিলেন আয়ুক্তক অচ্যুত। পট্টোলীটি অধুনা জগদীশপুর পট্টোলী বলে খ্যাত এবং রক্ষিত আছে রাজশাহীর বরেন্দ্ৰ অনুসন্ধান সমিতিতে। যাই হোক, ঐ সময়ে শৃঙ্গবেরবীথিতে ভূমির দাম ছিল প্রতি কুল্যবাপে দুই দীনার। প্রায় সমসাময়িক কালে বর্তমান বগুড়া-দিনাজপুর সীমাসঙ্গমে পঞ্চনগরী বিষয়েও ভূমির দাম একই ছিল, অথচ কোটিবর্ষ বিষয়ে ছিল তিন দীনার, ফরিদপুরে চার দীনার। মনে হয়, প্রায় পঞ্চম শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে শুরু করে মোটামুটি দুশ বছর উত্তরবঙ্গে ভূমির দাম প্রতি কুলবাপে দুই থেকে তিন দীনার, পূর্ববাঙলায় চার দীনার।
ভূমির মাপ সম্বন্ধে প্রায় তুচ্ছ করবার মতো হলেও একটু নৃতন খবর আছে লড়হচন্দ্র ও গোবিন্দচন্দ্রের (আঃ ১০০০-২০ ও আ- ১০২০-৪৫ খ্ৰীষ্টাব্দ) তিনটি ময়নামতী তাম্রপট্টোলীতে। এখানে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে, ভূমি পরিমাণ দেওয়া হচ্ছে পর পর ক্রমহ্রস্বায়মান পাচটি মাপে; পটক, দ্রোণ, যষ্টি, কাক এবং বিন্দু। পাটক ও দ্রোণ (৪০ দ্ৰোণে এক পাটক) সুপরিজ্ঞাত; কােকও তাই। কিন্তু যষ্টি, যার অর্থ লাঠি, এই যষ্টি মাপটি কী? দ্রোণের সঙ্গে তার সম্পর্ক কী? সেনবংশীয় রাজাদের লিপিমালায় ‘নল’ বলে একটি ভূমি-মাপের উল্লেখ আছে; এই নল’ মোপ পূর্ববাঙলায় কোনও কোনও জায়গায় কিছুদিন আগে পর্যন্তও প্রচলিত ছিল। যষ্টি কি “নল; দু’য়ে কি কোনও সম্বন্ধ ছিল? বিন্দু মাপটিই বা কী? কাকের সঙ্গে বিন্দুর সম্বন্ধ কি? এ-সব প্রশ্নের কোনও উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না।
গোবিন্দচন্দ্রের ঊর্ধর্বতন তৃতীয় পূর্বপুরুষ রাজা শ্ৰীচন্দ্রের পশ্চিমভাগ লিপিতেও একটু নূতন সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে। এখানে দেখছি, শ্ৰীহট্ট জেলার মৌলবীবাজার অঞ্চলে দশম শতকে ১০ দ্ৰোণে। ১ পাটক ভূমি গণনা করা হতো, অথচ ষষ্ঠ শতাব্দীর গোড়ার দিকে (৫০৭ খ্ৰীষ্টাব্দ) গুণাইঘর পট্টোলীর সাক্ষ্যে দেখেছিলাম, ত্রিপুরা অঞ্চলে ৪০ দ্রোণবাপে ১ পাটক ধরা হত। তা হলে এই দাঁড়াচ্ছে যে, ষষ্ঠ শতাব্দীর ত্রিপুরার ১ পাটক জমি দশম শতাব্দীর শ্ৰীহট্টের ১ পাটক জমির চারগুণ, অবশ্যই যদি ধরে নেওয়া যায়, দ্রোণ বলতে দুই কালে দুই জায়গায়ই একই পরিমাণ ভূমি বুঝাতো!! আর তা না হলে বলতে হয়, চার শতাব্দীর ভেতর দ্রোণের ভূমি পরিমাণ বেড়ে গিয়েছিল, অথবা বিভিন্ন স্থানে ভূমিপরিমাণ বিভিন্ন ছিল বরাবরই।
০৬. বর্ণ বিন্যাস
০১. যুক্তি – বর্ণ বিন্যাস
বর্ণাশ্রম প্রথার জন্মের ইতিহাস আলোচনা না করিয়াও বলা যাইতে পারে, বর্ণবিন্যাস ভারতীয় সমাজ-বিন্যাসের ভিত্তি। খাওয়া-দাওয়া এবং বিবাহ ব্যাপারের বিধিনিষেধের উপর ভিত্তি করিয়া আর্যপূর্ব ভারতবর্ষের যে সমাজ-ব্যবস্থার পত্তন ছিল তাহাকে পিতৃপ্রধান আর্যসমাজ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরিয়া ঢালিয়া সাজাইয়া নুতন করিয়া গড়িয়াছিল। এই নূতন করিয়া গড়ার পশ্চাতে একটা সামাজিক ও অর্থনৈতিক যুক্তি কিছুতেই অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু সে-সব আলোচনা বর্তমান ক্ষেত্রে অপ্রাসঙ্গিক। যে-যুগে বাংলা দেশের ইতিহাসের সূচনা সে-যুগে বর্ণাশ্রম আদর্শ গড়িয়া উঠিয়াছে, ভারতীয় সমাজের উচ্চতর এবং অধিকতর প্রভাবশালী শ্রেণীগুলিতে তাহা স্বীকৃত হইয়াছে, এবং ধীরে ধীরে তাহা পূর্ব ও দক্ষিণ ভাবতবর্ষে বিস্তৃত হইতেছে। বর্ণাশ্রমের এই সামাজিক আদর্শের বিস্তারের কথাই এক হিসাবে ভাবতবর্ষে আর্য সংস্কার ও সংস্কৃতির বিস্তা্রের ইতিহাস, কারণ ঐ আদর্শের ভিতরই ঐতিহাসিক যুগের ভারতবর্ষের সংস্কার ও সংস্কৃতির সকল অর্থ নিহিত। বর্ণাশ্রমই আর্যসমাজের ভিত্তি, শুধু ব্রাহ্মণ্য সমাজেরই নয়, জৈন এবং বৌদ্ধ সমাজেরও। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরিয়া আর্যপূর্ব ও অনার্য সংস্কার এবং সংস্কৃতি এই বর্ণাশ্রমের কাঠামো এবং আদর্শের মধ্যেই সমন্বিত ও সমীকৃত হঠযাছে। বস্তুত, বর্ণাশ্রমগত সমাজ-বিন্যাস এক হিসাবে যেমন ভারত-ইতিহাসের প্রধান বৈশিষ্টা, তেমনই অন্য দিকে এমন সর্বব্যাপী এমন সবগ্রাসী এবং গভীর অর্থবহ সমাজ-ব্যবস্থা ও পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যায় না। প্রাচীন বাংলার সমাজ-বিন্যাসের কথা বলিতে গিয়া সেই জন্য বর্ণবিন্যাসের কথা বলিতেই হয়।
বর্ণাশ্রম প্রথা ও অভ্যাস যুক্তিপদ্ধতিবদ্ধ করিয়াছিলেন প্রাচীন ধৰ্ম স্বত্র ও স্মৃতিগ্রন্থের লেখকেরা। ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়-বৈশ্য-শূদ্র এই চাতুবর্ণ্যের কাঠামোর মধ্যে তাঁহারা সমস্ত ভারতীয় সমাজ-ব্যবস্থাকে বাঁধিতে চেষ্টা করিয়াছিলেন। এই চাতুর্বর্ণ প্রথা অলীক উপন্যাস, এ সম্বন্ধে সন্দেহ নাই। কারণ ভারতবর্ষে এই চতুৰ্বর্ণের বাহিরে অসংখ্য বর্ণ, জন ও কোম ছিল, প্রত্যেক বর্ণ, জন ও কোমের ভিতর আবার ছিল অসংখ্য স্তর উপস্তর। ধর্মসূত্র ও স্মৃতিকারেরা নানা অভিনব অবাস্তব উপায়ে এই সব বিচিত্র বর্ণ, জন ও কোমের স্তর-উপস্তর ইত্যাদি ব্যাখ্যা করিতে এবং সবকিছুকেই আদি চাতুৰ্বর্ণের কাঠামোর যুক্তিপদ্ধতিতে বাঁধিতে চেষ্ট৷ করিয়াছেন। সেই মনু-যাজ্ঞবল্ক্যের সময় হইতে আরম্ভ করিয়া পঞ্চদশ ষোড়শ শতকে রঘুনন্দন পর্যন্ত এই চেষ্টার কখনও বিরাম হয় নাই। একথা অবশ্যস্বীকার্য যে স্মৃতিকারদের রচনার মধ্যে সমসামযিক বাস্তব সামাজিক অবস্থার প্রতিফলন আছে, সেই অবস্থার ব্যাখ্যার একটা চেষ্টা আছে; কিন্তু যে-যুক্তিপদ্ধতির আশ্রয়ে তাহা করা হইয়াছে অর্থাং চাতুর্বর্ণ্যের বহির্ভূত অসংখ্য বর্ণ, জন ও কোমের নরনারীর সঙ্গে চাতুর্বৰ্ণাকৃত নরনারীর যৌনমিলনের ফলে সমাজের যে বিচিত্র বর্ণ ও উপরর্ণের, বিচিত্ৰত্র সংকব বর্ণের সৃষ্টি করা হইয়াছে, তাহা একান্তই অনৈতিহাসিক এবং সেই হেতু অলীক। তৎসত্ত্বেও স্বীকার করিতেই হয় আর্যব্রাহ্মণ্য ভারতীয় সমাজ আজও এই যুক্তিপদ্ধতিতে বিশ্বাসী, এবং সুদূর প্রাচীন কাল হইতে আদি চাতুর্বর্ণ্যের যে কাঠামো ও যুক্তিপদ্ধতি অনুযায়ী বর্ণব্যাখ্যা হইয়া আসিয়াছে সেই ব্যাখ্যা প্রয়োগ করিয়া হিন্দুসমাজ আজও বিচিত্র বর্ণ, উপবর্ণ ও সংকর বর্ণের সামাজিক স্থান নির্ণয় করিম থাকেন। বাংলাদেশেও তাহার ব্যতিক্রম হয় নাই, আজও হইতেছে না।
