১. রামসিদ্ধি পাটকে দুইটি ভূখণ্ড, ৬৬টি উদান পরিমাণ, আয় ১০০ (পুরাণ) উত্তরায়ণ সংক্রান্তি উপলক্ষে রাজার দান।
২. বিজয়তিলক গ্রামে ২৫ উদ্দীন, আয় ৬০ (পুরাণ)।
৩. আজিকুল পাটকে ১৬৫ উদান, আয় ১৪০ (পুরাণ)। হলায়ুধ নিজে এই ভূখণ্ড কিনিয়াছিলেন।
৪. দেউলহন্তী গ্রামে ২৫ উদান, আয় ৫০ (পুরাণ)।
২, ৩ ও ৪ নং ভূমি হলায়ুধ চন্দ্রগ্রহণ উপলক্ষে রানীমাতার নিকট হইতে দান গ্রহণ করিয়াছিলেন।
৫. দেউলহন্তী গ্রামে আরও দুইটি ভূখণ্ড, পরিমাণ ১০ উদান, আয় ২৫ (পুরাণ)। হলায়ুধ আগে উহা কিনিয়াছিলেন, পরে কুমার সূর্যসেনের নিকট হইতে দান গ্রহণ করিয়াছিলেন, কুমারের জন্মদিন উপলক্ষে।
৬. দেউলহস্তী গ্রামেই আরও দুইটি ভূখণ্ড, পরিমাণ ৭ উদান, আয় ২৫ (পুরাণ)। হলায়ুধ আগে উহা কিনিয়াছিলেন, পরে সান্ধিবিগ্রহিক নাঞীসিংহের নিকট হইতে দান গ্ৰহণ করিয়া ছিলেন।
৭. ঘাঘরাকাট্টি পাটকে ১২.৭৫ উদান ভূমি, আয় ৫০ (পুরাণ)। হলায়ুধ বাজপণ্ডিত মহেশ্বরের নিকট হইতে উহা কিনিয়াছিলেন।
৮. পাতিলাদিবীক গ্রামে ২৪ উদান, আয় ৫০ (পুরাণ)। উত্থানদ্বাদশী তিথি উপলক্ষে কুমার পুরুষোত্তম সেনের দান।
সর্বসুদ্ধ এই ৩৩৬.৫ উন্মান ভূমির বার্ষিক আয় ছিল ৫০০ শত (পুরাণ); তখনকার দিনে এই অর্থের পরিমাণ কম নয়। ব্রাহ্মণপণ্ডিত হলায়ুধ শৰ্মা বিভিন্ন গ্রামে বিস্তুত সমগ্র পরিমাণ এই ভূমি রাজার নিকট হইতে ব্ৰহ্মত্র দানস্বরূপ গ্রহণ করিয়া ভূম্যধিকারী হইয়া বসিয়াছিলেন; রাষ্ট্রকে তাহার কোনও করই দিতে হইত না, অথচ তাহার প্রজাদের নিকট হইতে সমস্ত করই তিনি পাইতেন। পাল ও সেন বংশীয় রাজারা ও অন্যান্য ছোটখাটো রাজবংশের রাজারা অনেক সময়ই অনেক ব্ৰাহ্মণকে যে গ্রামকে-গ্রাম দান করিয়াছেন, তাহার দৃষ্টান্ত তো ভুরি ভুরি পাওয়া যায়। প্রয়োজনাধিক ভূমির অধিকারী হওয়ার ইচ্ছা, ব্যক্তিবিশেষকে কেন্দ্ৰ করিয়া ভূমির স্বত্বাধিকার কেন্দ্রীকৃত হওয়ার ঝোক সমাজের মধ্যে কী ভাবে বাড়িতেছিল, এইসব সাক্ষ্যপ্রমাণের মধ্যে তাহার সুস্পষ্ট আভাস পাওয়া যায়।
ভূমির ক্রমবর্ধমান চাহিদার ইঙ্গিত কতকটা ভূমির সূক্ষ্ম সীমা-নির্দেশের মধ্যেও পাওয়া যায়।। প্রত্যেকেই প্ৰত্যেকের ভূমির সীমা ও পরিমাণ সম্বন্ধে যথেষ্ট সচেতন ছিলেন রাষ্ট্রও এ সম্বন্ধে। কম সচেতন ছিল না। ভূমি দান-বিক্রয়কালে অন্য কাহারও ভূমিস্বর্থ যাহাতে আহত না হয়, এ ন’ সম্বন্ধে প্রজার ও রাষ্ট্রের দৃষ্টি খুবই সজাগ ছিল। তাহা ছাড়া, প্রত্যেকটি লিপিতেই ভূমি সীমা এত সূক্ষ্মভাবে ও সবিস্তারে বর্ণিত হইয়াছে যে, পড়িলেই মনে হয়, সূচ্যগ্ৰ ভূমিও কেহ সহজে ছাড়িয়া দিতে রাজী হইতেন না। কালের অগ্রগতির সঙ্গে এই চেতনাও বুদ্ধি পাইয়াছিল বলিয়া মনে হয়। অষ্টম শতক-পূর্ব লিপিগুলিতে এই সীমা-বিবৃতি খুব বিস্তুত নয়; কিন্তু পরবর্তী লিপিগুলিতে ক্রমশ এই বিবৃতি দীর্ঘ হইতে দীর্ঘতর হইবার দিকে ঝোক অত্যন্ত সুস্পষ্ট।
তাহা ছাড়া ভূমির পরিমাপের বর্ধমান সূক্ষ্মতাও ক্রমবর্ধমান চাহিদার দিকে ইঙ্গিত করে। অষ্টমশতকপূর্ব লিপিগুলিতে ভূমি-পরিমাপের নিম্নতম ক্রয় হইতেছে আঢবাপ বা আঢ়কবাপ, কিন্তু সেন আমলের লিপিগুলিতে দেখা যায়, নিম্নতম ক্রম আঢ়বাপ হইতে উন্মান, উন্মান হইতে কাকিণী পর্যন্ত নামিয়াছে। ভূমির চাহিদা যতই বাড়িতেছিল, লোকেরা সূক্ষ্মতিসূক্ষ্মী ভগ্নাংশ সম্বন্ধেও ক্রমশ সজাগ হইয়া উঠিতেছিল, এই অনুমানই স্বাভাবিক।
০৭. ভূমির সীমানির্দেশ
আগেই বলিয়াছি, ভূমি দান-বিক্রয়কালে সীমা-নির্দেশ খুব সূক্ষ্মভাবে ও সবিস্তারেই করা হইত। প্ৰস্তাবিত ভূমি দান-বিক্রয়ে যাহাতে গ্রামবাসীদের বসতি অথবা কৃষিকর্মের কোনও ব্যাঘাত না ঘটে, তাহা প্রজারা তো দেখিতেনই, স্থানীয় অধিকরণও এ সম্বন্ধে সচেতন থাকিত। পাহাড়পুর পট্টোলীতে পরিষ্কার নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে যে, প্রস্তাবিত পরিমাণ ভূমি এমনভাবে নির্বাচিত ও চিহ্নিত করিতে হইবে, যাহাতে গ্রামবাসীদের কাজকর্মে কোনও প্রকার অসুবিধা না হয় (“স্বকৰ্মবিরোধেন”)। ভূমির সীমা নির্দেশ কী করিয়া করা হইত তাহার একটু ইঙ্গিত বৈগ্রাম পট্টোলীতে পাওয়া যায়। তুষের ছাই ইত্যাদি চিরকালস্থায়ী বস্তুদ্বারা চারিদিকের সীমা চিহ্নিত করাই ছিল প্রচলিত রীতি (“চিরকালস্থায়ী-তুষারাঙ্গাদি-চিহ্নের্চতুর্দিশ্যে নিয়ম্যা”)। খুব সম্ভব, চারিদিকে লাইন ধরিয়া মাটি খুঁড়িয়া, তুষের ছাই ইত্যাদি দিয়া গর্ত ভরাট করা হইত; তাহার ফলে এই সীমারেখার উপর কোনও ঘাস, গাছ ইত্যাদি জন্মাইত না, এবং এই অপ্ৰসূ অনুর্বর রেখাই সীমা-নির্দেশের কাজ করিত। মল্লসারুল গ্রামে প্রাপ্ত লিপিতে পদ্মবীচির মালাচিহ্নিত (কমলাক্ষমালাঙ্কিত) খুঁটি বা কীলক দ্বারা সীমা-নির্দেশ করার আর-এক প্রকার রীতির উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়। সীমা চিহ্নিত করিবার এই রীতি তো ছিলই, তাহা ছাড়া গাছ, খাল, নালা, জেলা, নদী, পুষ্করিণী, মন্দির ইত্যাদি দ্বারাও সীমা নির্দিষ্ট হইত। যেখানে সমগ্র গ্রাম দান-বিক্রয়ের বস্তু, সেখানে গ্রামসীমা সবিস্তারে বর্ণিত হইয়াছে। যেখানে খণ্ড খণ্ড ভূমি দান-বিক্রয় হইতেছে, সেখানেও প্রস্তাবিত ভূমির সীমা অন্য ভূমি হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া (“অপবিঞ্ছা”, ৩ নং দামোদরপুর লিপি) কমবেশি সবিস্তারে নির্দেশ করা হইয়াছে। অষ্টমশতকপূর্ব উত্তরবঙ্গের লিপিগুলিতে এই ধরনের সীমা-নির্দেশ অনুপস্থিত, কিন্তু সমসাময়িক কালের নিম্ন ও পূর্ববঙ্গের লিপিগুলিতে ভূমি-সীমা নির্দেশ সুবিস্তারিত। এই সীমা-নির্দেশের দুই-চারিটি দৃষ্টান্তের পরিচয় লওয়া যাইতে পারে।
