১৭৫. অর্থশাস্ত্র (রাধাগোবিন্দ বসাক) ২:২০৮।
১৭৬. cf. W. W. Hunter IGI 4:177.
১৭৭. Ibid 4:191ff.
১৭৮. অর্থশাস্ত্র (রাধাগোবিন্দ বসাক) ২:২০৮-১২।
১৭৯. ঐ ২:২০৯-১২।
১৮. ভারতবর্ষের মানুষ : গণ-সমাজের অসম্পূর্ণ বিলোপ
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই জাতীয় নীতিগর্হিত নানান উপায়ে গণ বা সংঘের একতা ভাঙবার পর সে-সমাজের মানুষগুলিকে নিয়ে ঠিক কী ব্যবস্থা করা হবে? এই প্রশ্নের উত্তরে কৌটিল্য যা বলছেন তা শুধুই চিত্তাকর্ষক নয়, ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য বোঝবার ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বলে বিবেচিত হতে পারে।
প্রথমত, কৌটিল্য বলছেন, রাজা এই মানুষগুলিকে নিজের সৈন্যদলে ভর্তি করবার চেষ্টা করবেন। ‘সর্বপ্রথম কলহ-বিষয়েই রাজা হীনপক্ষকে কোষ ও দণ্ডদ্বারা স্বপক্ষে আনিয়া তাহাকে নিজ-প্রতিপক্ষ বা শত্রুর বধে নিযুক্ত করিবেন’(১৮০)। আমরা ব্রিটিশ আমলে যে-রকম দেখেছি—কোষ ও দণ্ড দ্বারাই ট্রাইব্যাল সমাজ থেকে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের জন্যে কামানের খোরাক সংগ্রহ করবার ব্যবস্থা—অনেকটা সেই রকমই নয় কি? ব্রিটিশ আমনের কথা না-হয় আলাদা। কিন্তু কৌটিল্যের বহুদিন পরেও তাঁর এই নীতিটি যে ভারতীয় রাষ্ট্রশক্তির অধিনায়কেরা বাস্তবে প্রয়োগ করতেন তা অনুমান করবার মতো একটি তথ্যের উল্লেখ করা যায়। অষ্টম ও নবম শতাব্দীর ধর্মপাল ও দেবপালের শিলালিপিতে তাঁদের সৈন্যবাহিনীর যে-বর্ণনা পাওয়া(১৮১) যায় তা থেকে স্পষ্টই অনুমান করা সম্ভব যে, নানা রকম ট্রাইব্যাল মানুষ নিয়েই এই সৈন্যদল গঠিত হয়েছিলো। কেননা, এই সৈন্যদলের বর্ণনায় যে-সব মানুষদের নাম পাওয়া যায় সেই নামগুলি প্রায়ই সরাসরি ট্রাইব্যাল নাম। তার মানে, রাজার সৈন্যবাহিনীতে নিযুক্ত হবার পরও ওই ট্রাইব্যাল মানুষেরা নিজেদের ট্রাইব্যাল নামগুলিকে ছেড়ে দেননি।
দ্বিতীয়য়, কৌটিল্য(১৮২) বলছেন, গণ-সমাজ থেকে উৎপাটিত ওই মানুষগুলিকে পাঁচ-ঘর বা দশ-ঘর ওই রকম ছোটো-ছোটো দলে বিভক্ত করে আলাদা-আলাদা ছোটো-ছোটো গ্রামে বসিয়ে কৃষিকার্যে নিযুক্ত করতে হবে : দশকুলিং পঞ্চকুলিং বা কৃষ্যাং নিবেশয়েৎ–‘ভূমিতে কৃষিকর্ম করিতে যোগ্য ইহাদের কুলপঞ্চক বা কুলদশক লইয়া (ভিন্নভিন্ন) গ্রামনিবেশ করাইবেন’। মনে রাখতে হবে, কৌটিল্য বিশেষ করে উপদেশ দিচ্ছেন, এই গ্রামগুলি যেন স্বতন্ত্র ও পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কহীন হয়। কেননা, গণসমাজের প্রধান শক্তি—এবং, অতএব, রাষ্ট্রশক্তির পক্ষে গণসমাজ সম্বন্ধে আতঙ্কের প্রধান কারণ হলো—গণবান্ধব বা মানুষগুলির মধ্যে একতা। ইংরেজীতে, group-bond। তাই কৌটিল্যের কাছে গণসমাজকে ভাঙবার প্রধানতম কৌশল হলো এর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা। অতএব, গণসমাজকে ভাঙবার পর যে-সতর্কতা অবলম্বন করবার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তা হলো ওই মানুষগুলি যাতে আবার না এক হতে পারে। ওরা আবার এক হতে পারলেই রাজার বিরুদ্ধে আয়ুধ ধারণ করবে। তাই, এরা আবার এক হবার উপক্রম করছে দেখলে প্রতিকারের ব্যবস্থা করতে হবে। কৌটিল্য(১৮৩) বলছেন, ‘ইহাদিগকে একত্র হইয়া থাকিতে দিলে, ইহারা (বিজিগীষু রাজার বিরুদ্ধে) শস্ত্রগ্রহণে সমর্থ হইয়া উঠিতে পারে। এবং ইহারা সমবেত হইয়া অবস্থান করিলে, (তিনি) ইহাদের উপর দণ্ড বিধান করিবেন’।
কৌটিল্যের এই দ্বিতীয় নির্দেশটির মূল্যই সবচেয়ে বেশি। কেননা, ভারতীয় সমাজ-ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য বোঝবার ব্যাপারে এখন থেকেই একটি মূল্যবান সূত্র পাবার সম্ভাবনা রয়েছে।
কৌটিল্য ঠিক কে ছিলেন,–এমনকি তিনি একান্তই কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তি ছিলেন কিনা—এই জাতীয় সমস্যার পূর্ণাঙ্গ সমাধান আমাদের পণ্ডিতমহলে হয়তো আজো হয়নি। তবে, সাধারণত ধরে নেওয়া হয় তাঁর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মন্ত্রণার উপরই মৌর্যসাম্রাজ্যের ভিত্তি ছিলো। যদি তাই হয় তাহলে তাঁকে যীশুখ্রীষ্টের অন্তত সওয়া তিন শ’ বছর আগেকার মানুষ মনে করতে হবে। কিন্তু এ-কথাতেও কোনো সন্দেহ নেই যে, যীশুখ্রীষ্টের বহু শতাব্দী পর পর্যন্ত ভারতবর্ষে রাষ্ট্রশক্তির অধিনায়কেরা এই অর্থশাস্ত্রকেই নিজেদের মূলমন্ত্র করবার চেষ্টা করেছেন। তার মানে, কৌটিল্যের ওই নীতিটি—ট্রাইব্যাল সমাজ ভেঙে সে-সমাজের মানুষগুলিকে নিয়ে ছোটো ছোটো স্বয়ংসম্পূর্ণ কৃষিমূলক গ্রাম নিবেশ করতে হবে—আমাদের দেশে বহুদিন পর্যন্ত অনুসরণ করা হয়েছে।
আমাদের এই অনুমানের পক্ষে এখানে একটি তথ্যের উল্লেখ করা যায়। তথ্যটি হলো ভারতবর্ষের মানুষদের প্রকৃতি-বিশ্লেষণ।
অবশ্যই, নির্ভরযোগ্য সেন্সাস রিপোর্ট বলতে খুব পুরোনোকালের বিশেষ কোনো দলিল পাওয়া যায় না। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষাশেষিই সর্বপ্রথম দেশের মানুষগুলিকে ভালো করে গুনে দেখবার ও তাদের প্রকৃতি-বিশ্লেষণ করবার চেষ্টা করা হয়েছিলো(১৮৪)। এতো সাম্প্রতিক কালের হলেও এই রিপোর্টের থেকে কয়েকটি বড়ো চিত্তাকর্ষক তথ্য পাওয়া যায়। প্রথমত, ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষাশেষি পর্যন্ত (এবং আধুনিকতম রিপোর্ট অনুসারে নিশ্চয়ই আজও, অর্থাৎ, বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত(১৮৫)) আমাদের দেশ থেকে ট্রাইব্যাল-সমাজ বিলুপ্ত হয়নি—১৮৭১-৭২ সালের রিপোর্ট অনুসারে ১৮৬০ লক্ষ মানুষের মধ্যে ১৮০ লক্ষ মানুষ তখনো ট্রাইব্যাল সমাজেই জীবন-যাপন করছে(১৮৬)। ব্রিটিশ কলোনিয়াল অফিস থেকে এদের নাম দেওয়া হয়েছে জংলী লোক বা এ্যবরিজিন্। এবং জনৈক সুদক্ষ ইংরেজ আমলা(১৮৭) এদের প্রসঙ্গে বলছেন :
Thurst back by the Aryans from the plains, they have lain hidden away in the recesses of the mountains, like the remains of extinct animals which paleontologists find in the hill-caves. India this forms a great museum of races, in which we can study man from his lowest to his highest stages of culture.
অর্থাৎ, আর্য-আক্রমণের দরুন সমতল দেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে এরা পর্বতে গিয়ে আত্মগোপন করে রয়েছে—বিলুপ্ত জীবজন্তুবিষয়ক বৈজ্ঞানিকরা পাহাড়ের গুহায় যেরকম বিপুপ্ত জানোয়ারের অস্থি আবিষ্কার করেন এদের অবস্থাও খানিকটা তার মতন। তাই ভারতবর্ষের অবস্থানটা যেন জাতিতত্ত্বের এক বিরাট যাদুঘরের মতো—এখানে আমরা মানুষকে তার সংস্কৃতির সবচেয়ে নিচুস্তর থেকে শুরু করে সবচেয়ে উঁচুস্তর পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করতে পারি।
লেখক অন্যত্র এই ট্রাইব্যাল-সমাজের মানুষগুলির বর্ণনায় বলেছেন, the fragments of a pre-historic world,–প্রাগৈতিহাসিক পৃথিবীর টুকরোর মতো(১৮৮)। ইংরেজ-আমলের ভারতবর্ষের চেহারাটাই যদি এই হয় তাহলে হিন্দু-আমলের ভারতবর্ষের ছবিটা নিশ্চয়ই অনুমান করা কঠিন নয়। কিন্তু ১৮৭১-৭২ সালের ওই রিপোর্টটির আরো বিস্ময়কর তথ্য হলো, বাকি ১৬৪০ লক্ষ মানুষের মধ্যে প্রায় ১৫২০ লক্ষ মানুষ যে কোথা থেকে এলো তার সঠিক হদিস দিতে পারা যাচ্ছে না(১৮৯)। কেননা, এই রিপোর্টে দেশের মাত্র ১৬০ লক্ষ মানুষকে উঁচু-জাতের বলে—অর্থাৎ, বর্ণনাদাতাদের ভাষায়, বিশুদ্ধ আর্যসন্তান হিসেবে—সনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে, এই ১৫২০ লক্ষ মানুষদের ব্যাখ্যা হিসেবে শুধু এইটুকুই বলা হচ্ছে যে এরা আদিতে ছিলো স্থানীয় অসভ্য ও অনার্য মানুষ—আর্যরা এ-দেশে এসে সভ্যতা বিস্তার করবার পর এরা ক্রমেক্রমে আর্যসভ্যতার অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়েছে এবং সভ্য হয়ে উঠেছে। (১৮৭১-৭২-এর সেন্সাস অনুসারে অবশ্য পরে এই ১৫২০ লক্ষের মধ্যে ৪১০ লক্ষ মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে।
