গণেশকে অনুসরণ করবার তৃতীয় সুবিধে হলো, আধুনিক পণ্ডিতদের মধ্যে ইতিপূর্বে অনেকেই তাঁর ইতিহাস রচনা করবার চেষ্টা করেছেন। এ-বিষয়ে শ্রীযুক্ত হরিদাস মিত্র(১৩) ও শ্রীমতি অ্যালিস গেটীর(১৪) গবেষণা বিশেষ করে উল্লেখযোগ্য। পূর্বসুরীদের এই জাতীয় গবেষণা আমাদের প্রচেষ্টাকে অপেক্ষকৃত সহজসাধ্য করতে পারে।
সুবিধের কথা ছাড়াও আমাদের পক্ষে গণেশের ইতিহাস অন্বেষণ করাই বিশেষ করে প্রাসঙ্গিক। তারও নানান কারণ আছে। প্রথমত, আমাদের উদ্দেশ্য হলো লোকায়তিক ধ্যানধারণার উৎস অনুসন্ধান করা এবং আমরা আগেই দেখেছি লোকায়তের সঙ্গে বামাচারের সম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ঠ। এবং ওই তেত্রিশকোটির মধ্যে গণেশই বোধ হয় একমাত্র দেবতা যাঁর সঙ্গে লোকায়ত ও বামাচার দু’-এর স্পষ্ট যোগাযোগ রয়েছে। দেশের ঐতিহ্য অনুসারে লোকায়ত-দর্শনের আদি-গুরু হলেন বৃহস্পতি এবং ঋগ্বেদের মন্ত্র অনুসারে বৃহস্পতি ও গণপতিতে তফাত নেই(১৫)। অপরপক্ষে, এই গণেশই আবার তান্ত্রিক সাহিত্যের হেরম্ব—হেরম্ব ছাড়াও তন্ত্রে গণেশের আরো অনেক রকম নাম আছে। তাছাড়াও, শক্তি-গণপতির মূর্তি এবং আনন্দগিরির শঙ্কর বিজয়ে গাণপত্যসম্প্রদায়ের বর্ণনা গণেশকে একেবারে অভ্রান্তভাবেই বামাচারের সঙ্গে সংযুক্ত বলে প্রমাণ করে(১৬)। দ্বিতীয়ত, সমাজ-ইতিহাসের কথা বাদ দিয়ে দর্শনের ইতিহাস আলোচনা অসম্ভব। গণপতিকে অনুসরণ করেই প্রাচীনকালের সমাজ-ইতিহাসের দিকে অগ্রসর হওয়া সুবিধাজনক। কেননা, গণপতির কাহিনী আর গণের কাহিনী আলাদা নয়। এখানেও পূর্বসূরীদের প্রচেষ্টা আমাদের পক্ষে বিশেষভাবে সহায়ক হবে। কেননা, আধুনিক যুগের দু’জন বিখ্যাত ঐতিহাসিক,—অধ্যাপক কে. পি. জয়সওয়াল(১৭) ও অধ্যাপক রমেশচন্দ্র মজুমদার(১৮),—এই গণের কথাই বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছেন। দুর্ভাগ্যের বিষয়, আমরা একটি পরেই দেখবো, মার্কস যাকে বলেছেন ‘আইনগত অন্ধতা’ তারই দরুন এঁরা গণ সম্বন্ধে বহু তথ্য সংগ্রহ করেও শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞান-বিচ্যুত হয়েছেন। কিন্তু এঁদের সিদ্ধান্ত স্বীকারযোগ্য না হলেও এঁরা যে-সব তথ্য সঞ্চয় করেছেন তা মহামূল্যবান।
——————–
৮. A. Mitra CWB 1951—TCWB 7.
৯. বাজসনেয়ী সংহিতা ২৩.১৯।
১০. ঋগ্বেদ ২.২৩.১।
১১. W. Crooke RFNI 250.
১২. ক্ষিতিমোহন সেন : জাতিভেদ ৬৪।
১৩. H. Mitra in VQ 1931-32, 1935.
১৪. A. Getty G.
১৫. ঋগ্বেদ ২.২৩.১। cf. R. G. Bhandarkar VS 149.
১৬. এই গ্রন্থের তৃতীয় পরিচ্ছেদের “আয়ুধজীবীগণ ও বার্তাশস্ত্রোপজীবীগণ” অধ্যায় দ্রষ্টব্য।
১৭. K. P. Jayaswal HP.
১৮. R. C. Majumder CLAI.
০৫. গণেশ মানে কী?
এই সব নানান কারণে আমরা তেত্রিশকোটির মধ্যে বিশেষ করে গণপতিরই শরনাপন্ন হতে চেয়েছি।
কিন্তু গণেশ না হয়ে শিবও হতে পারতো, কৃষ্ণও হতে পারতো; হতে পারতো বুদ্ধ, হতে পারতো কপিল; এমনকি হতে পারতো স্বয়ং বৃহস্পতি—যাঁর নামের সঙ্গে লোকায়ত-দর্শনের যোগাযোগটা কিছুতেই ভোলা চলে না। কিন্তু এখানে খুবই আশ্চর্য ব্যাপার আছে—যেন, উপনিষদের ভাষায়, একবিজ্ঞানেন সর্ববিজ্ঞানম্। এক গণেশের ইতিহাসকে খুঁজে পেলেই শিব, কৃষ্ণ, বুদ্ধ, কপিল, বৃহস্পতি—অনেকেরই জন্মাদিরহস্য খুঁজে পাওয়া যায়। তাছাড়া, ভারতীয় ঐতিহ্যের এমনই জটিলতা যে, গণেশের সঙ্গে শিবের আর কৃষ্ণের, কপিলের আর বুদ্ধের একাত্মভাব একাধিকবার ঘোষিত হয়েছে। বৃহস্পতির কথা তো আগেই বলেছি। ক্ষিতিমোহন সেন মহাশয় বলছেন, “এখন আমরা গণদেবতা বলিতে শুধু গণেশকেই বুঝি। কিন্তু মহাদেবও গণেরই দেবতা। গণদেবতা অর্থাৎ সাধারণ লোকপূজ্য দেবতা(?)। মহাদেবেরই এক নাম গণেশ (বনপর্ব, ৩৯, ৭৯), তিনিই গণানাং পতিঃ (দ্রোণপর্ব, ২০১, ৪৮), তিনিই গণাধ্যক্ষ গণাধিপ (সৌপ্তিকপর্ব, ৭, ৮; শান্তিপর্ব, ২৮৪, ৭৬)। বিষ্ণুও গণদেবতা। তাই তাঁর নাম গণেশ্বর, লোকবন্ধু, লোকনাথ, ইত্যাদি (অনুশাসনপর্ব, ১৪৯, বিষ্ণু সহস্রনাম)। মহাদেবের প্রায় নামই বিষ্ণু সহস্রনামে দেখা যায়। যথা, ঈশান, স্থাণু, মহাদেব, রুদ্র, বৃষাকৃতি, লোকাধ্যক্ষ ইত্যাদি।(১৯) মনিয়ার উইলিয়ামসও(২০) বলছেন, মহাভারতের স্থানবিশেষে শিবের নাম গণাধিপতি বা গণেশ। বুদ্ধ আর কপিলের সঙ্গেও অন্তত এই রকমই নামের মাধ্যমেই গণেশের সম্পর্ক রয়েছে। কেননা, গণেশের একটি নাম হলো বিনায়ক। এবং বিণায়ক বলতে বুদ্ধকেও বোঝায়, কপিলকেও বোঝায়।
তাই, গণপতির ইতিহাস একা গণপতিই ইতিহাস নয়। কিংবা, ঘুরিয়ে বললে হয়তো একথাও বলা যায় যে, এক গণপতিই নানা রূপে প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসের নানা জায়গা জুড়ে রয়েছেন।
ভারতীয় ঐতিহ্যের এতো সব জটিলতা সত্ত্বেও কিন্তু এতোটুকুও জটিলতা নেই গণেশের নামটা নিয়ে। অতুলচন্দ্র গুপ্ত(২১) মহাশয় যেমন বলছেন, “সর্ববিঘ্নহর ও সর্বসিদ্ধিদাতা বলে যে দেবতাটি হিন্দুর পূজা-পার্বণে সর্বাগ্রে পূজা পান, তাঁর গণেশ নামেই পরিচয় যে, তিনি ‘গণ’ অর্থাৎ জনসঙ্ঘের দেবতা। এ থেকে যেন কেউ অনুমান না করেন যে, প্রাচীন হিন্দুসমাজের যাঁরা মাথা তাঁরা জনসঙ্ঘের উপর অশেষ ভক্তি ও প্রীতিমান ছিলেন। যেমন তার সব সমাজের মাথা, তেমনি তাঁরাও সঙ্ঘবদ্ধ জনশক্তিকে ভক্তি করতেন না, ভয় করতেন!…গণশক্তির প্রতি প্রাচীন হিন্দুসভ্যতার কর্তাদের মনোভাব কি ছিল। তা গণেশের নরশরীরের উপর জানোয়ারের মাথার কল্পনাতেই প্রকাশ।”
