———————-
৪. Moreland IDA 22; R. P. Dutt IT 48.
৫. Census of 1871-2 cf. W. W. Hunter IGI 4:164-5.
৬. যথা, Queen’s Proclamation of 1858. See R. P. Dutt IT 286-7. cf. H. Maine VCEW 46.
৭. এ-জাতীয় প্রচারের চুড়ান্ত জবাব হিসেবে Castro GH দ্রষ্টব্য।
০৩. ভারতের আদিপর্ব
কিন্তু দার্শনিক হেগেলের পক্ষে কথাটা যতোই অসন্তোষজনক হোক না কেন, ভারতবর্ষেরও একটা অতীত ইতিহাস সত্যিই আছে। বরং, ওই যে তেত্রিশকোটি দেবদেবীর নজির দেখিয়ে হেগেল প্রমাণ করতে চেয়েছেন এ-দেশের কোনো ইতিহাস নেই,—ওঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করলেই এ-দেশের অতীত ইতিহাসটার আভাস পাওয়া যেতে পারে। কেননা, এই দেবদেবীদের নিজেদের ইতিহাস আছে এবং সে-ইতিহাস শুধুই যে চিত্তাকর্ষক তাই নয়, তারই মধ্যে দেশের ইতিহাসও প্রতিফলিত হতে দেখা যায়।
দেশের সেই আদিপর্বের ইতিহাসটির সন্ধান পেলে দেখা যায় অবস্থাটা চিরকালই স্বপ্নের ঘোরের মতো নয়। আর, হেগেল ওই যে স্বপ্ন-লাবণ্যের কথা বলছেন,—যা-কিছু কঠিন, যা-কিছু কঠোর, যা-কিছু দ্বন্দ্বকণ্টকিত ও সংঘাতচঞ্চল তা সবই স্বপ্নের দশায় শান্ত সমাধিস্থ হয়ে যাওয়ার লাবণ্য—তা আর যাই হোক অন্তত ভারতীয় ইতিহাসের আদিপর্বের বেলায় অলীক কল্পনামাত্র।
কিন্তু দেবদেবীদের আবার ইতিহাস কী? স্বর্গের কাহিনীর সঙ্গে মর্তের মানুষদের সম্পর্কই বা কী করে সম্ভবপর?
আসলে এই দেবদেবীরা চিরকালই স্বর্গের বাসিন্দা ছিলেন না। তার মানে, এমন একটা যুগ ছিলো যখন তাঁরা আধুনিক অর্থে দেবদেবীই হয়ে ওঠেননি। তাই মর্তের মানুষের সংগেই তাঁদের সম্পর্ক তখন খুব নিবিড়। মানুষের উৎপন্ন অন্ন থেকে নৈবেদ্য পাবার বদলে তখন তাঁরা অনেকেই মানুষের উৎপাদন-উৎসাহে, এমনকি প্রজনন-উৎসাহেও, প্রকাশ্যভাবেই নেতৃত্বগ্রহণ করতে দ্বিধা করেননি।
ভারতবর্ষের সেই আদিপর্বের চিত্রটি তাই আশ্চর্য, অপরূপ। মানুষের সমাজে তখনো উদ্বৃত্তজীবী শ্রেণীর আবির্ভাব ঘটেনি আর তাই সে-শ্রেণীর চেতনা দিয়ে গড়া নৈবেদ্যজীবী দেবদেবীরাও নয়।
তারপর অবশ্যই উদ্বৃত্তশ্রণীর মানুষের আবির্ভাব হয়েছে। যদিও অবশ্য, ঠিক কী করে তা হলো সে-প্রশ্ন খুবই জটিল। প্রাচীন ভারতে রাষ্ট্রের উৎপত্তি-ইতিহাস এখনো লেখা হয়নি। কিন্তু এ-বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, আসমুদ্রহিমাচল এই বিরাট দেশে সমস্ত মানুষের জীবনে একই তালে পরিবর্তন দেখা দেয়নি। রাষ্ট্রশক্তি গড়ে ওঠবার পাশাপাশিই থেকে গিয়েছে প্রাগ্-বিভক্ত প্রাচীন সমাজ। আর, ওর রাষ্ট্রশক্তির বর্ণধারেরা প্রাগ্-বিভক্ত সমাজের মানুষগুলিকে যে কী রকম বিষনজরে দেখেছিলেন তার দলিল রচনা করে গিয়েছেন স্বয়ং কৌটিল্য। কৌটিল্যের রচনা অনুসরণ করেই যৌথ-সমাজের প্রতি শ্রেণীবিভক্ত-সমাজের শাসক-সম্প্রদায়ের মনোভাব সম্বন্ধে পরে আলোচনা তুলবো। আপাতত প্রশ্ন হলো, দেবদেবীদের আদিরূপটির প্রতি ওই শাসক-শ্রেণীর মনোভাব কী রকম? যে-মানুষদের সঙ্গে তখনো ওই দেবদেবীদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সেই মানুষদের প্রতি যে-রকম মনোভাব, সেই রকমই। অর্থাৎ, দেশের শাসক-সম্প্রদায়ও এঁদের মোটেই সুনজরে দেখেনি, এমনকি খোদ আইনকর্তারাও এঁদের বিরুদ্ধে আইনজারি করতে বাধ্য হয়েছিলেন। অর্থাৎ, দেবলোকের অনেক যুদ্ধই তখন পর্যন্ত ঘটে চলেছিলো মরলোকের বুকেই।
আর্য-অনার্য মতবাদের জটিলতায় ভারতের আদিপর্বে শ্রেণীসমাজের আবির্ভাব-কাহিনী আজো অনেকখানি অস্পষ্ট হয়ে রয়েছে। অথচ, ওই আদিপর্বের ইতিহাস খুঁজে না পেলে প্রাচীন ভারতে ধ্যানধারণার ক্ষেত্রে সংগ্রাম ও সংঘাতকে বুঝতে পারা সম্ভব নয়। তার কারণ, ধ্যানধারণাগুলি স্বয়ম্ভূ নয়। মানুষের মূর্ত জীবনেরই প্রতিবিম্ব।
অতএব, লোকায়তিক ধ্যানধারণার উৎস-আবিষ্কারের প্রচেষ্টা ভারতের আদিপর্ব ইতিহাসটি খোঁজবার চেষ্টাও হতে বাধ্য। এবং, যে দেবদেবীদের নজির দেখিয়ে হেগেল ভারতবর্ষের গোটা ইতিহাসটাকেই অস্বীকার করতে চান তাঁদেরই অনুসরণ করে আমরা হয়তো ভারতের আদিপর্বের ওই ইতিহাসটির সন্ধান পাবো।
০৪. গণেশের কথা কেন?
কিন্তু দেবতা তো এ-দেশে এক-আধটি নন। তাঁদের মধ্যে কাকে ছেড়ে কাকে অনুসরণ করা যাবে?
আগেই বলেছি, আমরা বিশেষ করে গণপতির পদানুসরণ করবো। কেননা, তাঁকে অনুসরণ করবার অনেক রকম সুবিধে আছে।
প্রথমত, এ-নির্বাচন আমাদের ঐতিহ্য-বিচ্যুত করবে না। দেশের ঐতিহ্য অনুসারে যে-কোনো পূজোর বেলাতি গণেশ পুজো পান সর্বপ্রথম। এই ঐতিহ্য অনুসারে গণেশ হলেন সিদ্ধিদাতা। সংকল্প যতো দুরহই হোক না কেন, তাঁকে অনুসরণ করলে সিদ্ধিলাভ সুনিশ্চিত হয়।
কিন্তু ঐতিহ্যের কথা ছাড়াও অন্য যুক্তি রয়েছে। আপনি যদি চণ্ডী বা মনসা বা ওই রকম আর কোনো দেবদেবীকে অনুসরণ করতে চান তাহলে শুরুতেই আপনার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে বিঘ্ন সৃষ্টি হতে পারে—কিন্তু বিঘ্ন-বিনাশক গণেশের বেলায় সে-বিঘ্নের ভয় নেই। কী রকম বিঘ্ন? মনসা প্রভৃতির বেলায় আধুনিক পণ্ডিতেরা বলবেন, এঁরা ছিলেন স্থানীয় অনার্যদের উপাস্য দেবদেবী। তাই, আগন্তুক আর্যদের মনে, কিংবা আভিজাতিক আর্য-ঐতিহ্যের বাহকদের পক্ষে, এঁদের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড প্রতিবন্ধ থাকাই স্বাভাবিক। চাঁদসওদাগরের উপাখ্যানে তারই স্বাক্ষর রয়েছে(৮)। কিন্তু এ-প্রতিবন্ধ শুধুমাত্র ধর্মবোধপ্রসূত, আর্যদের ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে অনার্যদের ধর্মবিশ্বাসের সংঘাত-কাহিনী। সে-কাহিনী থেকে ধর্মবিশ্বাসের সংঘাত অনুমান করা যেতে পারে, তার চেয়ে বেশি কিছুই নয়। গণপতির বেলায় কিন্তু এতো সহজ একটা সমাধান দেখিয়ে আমাদের প্রচেষ্টাকে নিরস্ত করা যাবে না। কেননা, গণপতি হলেন না আর্য না অনার্য, কিংবা, আর্য আর অনার্য দুই-ই। বাজসনেয়ী সংহিতায়(৯) তাঁর গান শোনা যায় : গণানাং ত্বাং গণপতি হবামহে! এমনকি, বৈদিক সাহিত্যের প্রাচীনতম অংশে—ঋগ্বেদের দ্বিতীয় মণ্ডলে—তাঁর উল্লেখ আছে(১০)। আবার ভিলদের গ্রামেও তাঁকে দেখা যায়—চাষের আগে আবাদী জমির উপর একটি শিলাখণ্ডকে তারা গণেশ বলেই সম্বোধন করছে(১১)। গণেশ যে স্থানীয় অনার্যদের বিশ্বাস থেকে ঋগ্বেদ সংহিতায় বা বাজসনেয়ী সংহিতায় প্রবেশলাভ করেছিলেন, এমন কথা যদিও ক্ষিতিমোহন সেন মহাশয়(১২) প্রমাণ করবার চেষ্টা করেছেন তবুও তাঁর যুক্তির জোর খুবই ক্ষীণ মনে হয়। অপরপক্ষে গণেশ যে সংহিতা সাহিত্য থেকে বেরিয়ে কোলভিলদের মন জয় করেছিলেন এ-ধরনের কথা প্রমাণ করা আরো দুঃসাধ্য হবে। তাই, অন্যান্য দেবদেবীর বেলায় আধুনিক পণ্ডিতেরা যে অতিসরল সমাধান দিতে পারবেন গণেশের বেলায় তা সম্ভব হবে না।
