বিশেষ উল্লেখযোগ্য এই যে, বৈদিক সমাজ যতো অবধারিতভাবেই পুরুষপ্রধান হোক না কেন ঋগ্বেদেই এমন কিছুকিছু নিদর্শন পাওয়া যাচ্ছে যা থেকে অনুমিত হয় যে, ওই অংশগুলি রচিত হবার সময়েও নারীদের সভাগমনঅধিকার বর্তমান ছিলো।
গুহা চরন্তী মনুষো ন যোষা সভাবতী বিদথ্যেব সং বাক্।
অর্থাৎ,—মানুষ নিগূঢ়ভাবে বিচরণ করে, যেমন সভাস্থিত নারী সভার উপযোগী বাক্য প্রয়োগ করে ।। ঋগ্বেদ : ১ ১৬৭.৩ ॥
ত্রী যধস্থা সিদ্ধবস্ত্রিঃ কবীনামুত ত্রিমাতা বিদথেষু সম্রাট।
ঋতাবরীর্যোষণাস্তিস্রো অপ্যাস্ত্রিরা দিবো বিদথে পত্যমানাঃ ॥
অর্থাৎ, —হে সিন্ধুগণ, তিনটি লোক, কবিদিগের তিনটি মাতা, বিদথগুলির সম্রাট্, ঋতযুক্ত তিনটি নারী দিবসে তিনবার সভায় আগমন করে।। ঋগ্বেদ : ৩.৫৬.৫ ॥
দিবসে তিনবার সভায় আগমন-প্রসঙ্গ অবশ্যই যজ্ঞের কথা মনে করিয়ে দেয়। অন্যত্রও সভার সঙ্গে যজ্ঞের সম্পর্কের ইংগিত পাওয়া যায়।
ব্ৰাতংব্রাতং গণংগণং সুশস্তিভিরগ্নের্তামং মরুতামোজ ঈমহে।
পৃষদশ্বাসো অনবভ্ররাধসে গন্তারো যজ্ঞং বিদথেষু ধীরাঃ ॥
অর্থাৎ, —ধীর আমরা প্রতি ব্রাতে ও প্রতি গণে অগ্নি ও মরুৎগণের ওজঃ এবং বিচিত্রবর্ণ অশ্বসমূহ ও ক্রটিবিহীন ধনসমূহ-যাহা যজ্ঞের অভিমুখে গমন করে সেইগুলিকে— শোভন ভতিদ্বারা এই বিদথগুলিতে যাজ্ঞা করিতেছি।। ঋগ্বেদ : ৩.২৫.৬ ॥
অতএব, সভার প্রসঙ্গ থেকে আমরা বৈদিক যজ্ঞের আলোচনায় উপনীত হই। বস্তুত, যজ্ঞকথা বাদ দিলে বৈদিক সাহিত্যের আলোচনাই সম্ভব নয়। এবং যজ্ঞকথা প্রসঙ্গে প্রথমেই আমাদের আলোচনা-পদ্ধতির বিরুদ্ধে একটি আপত্তি উঠতে পারে।
——————
৩৯. H. L. Morgan AS. 73, cf. K. P. Jayaswal HP 1:11-2 “the Samiti was the national assembly of the whole people or visah ; for we find the whole people’ or samiti, in the alternative, electing and re-electing the rajan or ‘king (Rigveda 10. 173. 1 & Atharvaveda 6. 87.1 ; 6.88. 3.; 3.4.2). The whole people were supposed to be present in the Assembly. The functions of the samiti may be gathered from different references. We have already noticed the most important business of the samiti, to wit, electing the rajan. It could also re-elect king who had been banished. They were thus a sovereign body from the constitutional point of view.”
৪০. H. L. Morgan op cit 84.
৪১. A. B. Keith & A. A Macdonell op. cit. Sabha di Samiti.
৪২. Ibid 2:430.
৪৩. Ibid.
৪৪. JAOS XII:148-52.
৪৫. G. Thomson SAGS ch. 3 &4·
০৮. বৈদিক যজ্ঞের আদিরূপ ও রূপান্তর
পূর্বপক্ষ বলবেন, বৈদিক যজ্ঞই হলো সামগ্রিকভাবে বৈদিক সাহিত্যের প্রাণবস্তু। অতএব, ঋগ্বেদের মন্ত্রগুলিকে বিচার করবার বা বোঝবার একমাত্র যুক্তিসঙ্গত পটভূমি বলতে এই যজ্ঞই। তাই, কোন্ যজ্ঞে কোন্ মন্ত্রের কী বিনিয়োগ তার আলোচনা বাদ দিয়ে শুধুমাত্র ঋগ্বেদের মন্ত্রগুলির উপর নির্ভর করে বৈদিক মানুষদের সমাজ-ইতিহাস অন্বেষণ করার প্রচেষ্টা ভ্রান্ত হতে বাধ্য।
যজ্ঞই মুখ্য। যজ্ঞই প্রাথমিক। সায়নাচার্যও এই রকমই একটা যুক্তির উপর নির্ভর করেছেন বলেই ঋগ্বেদের আগে যজুর্বেদের ভাষাকে স্থান দেবার প্রয়োজন বোধ করেছেন—যজ্ঞই যজুর্বেদের প্রধানতম উপজীব্য। এবং সায়ন(৪৬) বলছেন, “যজ্ঞে যজুর্বেদবিৎ ঋত্বিকের প্রাধান্য পরিকীর্তিত হইয়া থাকে। সেইজন্য সর্বপ্রথম যজুর্বেদের ব্যাখ্যা করা হইয়াছে। অতঃপর হোমকরণসমর্থ ঋত্বিকের জন্য ঋগ্বেদের ব্যাখ্যা করা যাইতেছে।” কেননা, “অধ্বর অর্থাৎ যজ্ঞকে যোজিত যিনি করেন—ইহাই অধ্বর্য্যু বা অধ্বরষু শব্দের যোগার্থ এবং যজ্ঞের নেতা এইটিই তাৎপর্য।”(৪৭) অবশ্যই শ্রুতিতে যে ঋগ্বেদের শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রথমত্ব কথিত হয়েছে সে-কথা স্বয়ং সায়নও স্বীকার করছেন; কিন্তু শ্ৰুতির এই মন্তব্যের অর্থ ঠিক কী? সায়্ন(৪৮) বলছেন, “সর্বাগ্রে ঋকের পাঠ করা হয় বলিয়া যে উহার শ্রেষ্ঠত্ব বা উপাদেয়ত্ব, তাহা নহে। যজ্ঞের অঙ্গকে দৃঢ় করিবার ক্ষমতা ইহার আছে, সেইজন্য এই ঋক্ শ্রেষ্ঠ বলিয়া পরিগণিত হয়।…মন্ত্রার্থজ্ঞান ব্যতীত যজুর্বেদ-বিহিত যজ্ঞানুষ্ঠানের প্রবৃত্তি আসিতে পারে না। সুতরাং মন্ত্রার্থজ্ঞান বিষয়ে এবং অনুষ্ঠানের প্রবৃত্তিকরণাংশে যজুর্বেদেরই প্রাধান্য দেখা যাইতেছে। অতএব তাহার ব্যাখ্যাই প্রথমে করা উচিত।”…
অতএব, আগে যজ্ঞ এবং এই যজ্ঞের পটভূমিকা বাদ দিয়ে ঋগ্বেদের মন্ত্রের আলোচনা ব্যর্থ ও ভ্রান্ত।
উত্তরে আমরা নিশ্চয়ই এমন দাবি করবো না যে, কোন যজ্ঞে ঋগ্বেদের কোন্ মন্ত্রের কী ভাবে বিনিয়োগ হচ্ছে তার থেকে মন্ত্রগুলির আদি-তাৎপর্যের উপর কোনোরকম আলোকপাতই হয় না। বস্তুত, পৃথিবীর পিছিয়ে-পড়া মানুষদের সম্বন্ধে সাধারণভাবে জানতে-পারা তথ্যের ভিত্তিতে আমরা মনে করতে পারি, আদিম সমাজে কাজ বা উৎপাদনক্রিয়া ছাড়া গান হয় না এবং গান ছাড়া কবিতা হয় না এবং জাদুবিশ্বাসগত অনুষ্ঠান (ritual) আদিম মানুষের কাছে জীবনসংগ্রামের—উৎপাদন-ক্রিয়ার—একটি অন্যতম সহায়। ঋগ্বেদ যদি প্রাচীন সমাজের গান ও কবিতার সঙ্কলন হয়, তাহলে সে-গান বা কবিতার সঙ্গে কাজের—অতএব, জাদুঅনুষ্ঠান বা ritual-এরও—কোনো-না-কোনো প্রকার আদি-সম্পর্ক অনুমিত হতে বাধ্য। পরের যুগে মন্ত্রগুলির বিনিয়োগ থেকে সেই আদি-সম্পর্কের ইংগিত খুঁজে পাওয়া অসম্ভব নয়। কেননা, যজুর্বেদ ও ব্রাহ্মণ-সাহিত্যে যেভাবে যজ্ঞকথা বর্ণিত হয়েছে তা পরবর্তী যুগের ব্যাপার—অতএব অনেকাংশে কৃত্রিম—হলেও শুধুমাত্র আকস্মিক উদ্ভাবনের পরিণাম নয়; অর্থাৎ তার পিছনেও একটা পুরোনো ইতিহাসের কিছু কিছু ইংগিত খুঁজে পাওয়া যেতে পারে এবং সে-ইতিহাস অনুসরণ করলে আমরা হয়তো প্রাচীন-সমাজের জাদুঅনুষ্ঠান বা ritual-এরই পরিচয় পেতে পারি।
