এতা বো বশ্ম্যুদ্যতা যজত্ৰা অতক্ষন্নায়বো নব্যসে সম্
শ্রবস্যবো বাজং চকানাঃ সপ্তির্ন রথ্যো অহ ধীতিমশ্যাঃ॥
অর্থাৎ, —হে যজনীয় বিশ্বদেবগণ! আমি তোমাদের উদ্যত স্তুতিগুলিকে কামনা করি। তোমরা নূতনতর স্তুতির যোগ্য। আমাদিগের ন্যায় অল্প ও বলাভিলাষী মনুষ্যগণ তোমাদের জন্য স্তুতি রচনা করিয়াছে। রথের অশ্বের ন্যায় তোমাদের দল আমাদের কর্মে আগমন করুক। ঋগ্বেদ : ২.৩১.৭ ॥
অস্য মে দ্যাবাপৃথিবী ঋতায়তো ভূতমবিত্রী
বচস: সিষাসতঃ।
যযোরায়ুঃ প্রতরং তে ইদং পুর উপস্তুতে
বসুয়ুর্বাং মহো দধে॥
অর্থাৎ,—হে দ্যাবাপৃথিবী! যে স্তোতা ঋত অনুযায়ী তোমাদিগকে বাক্যের দ্বারা প্রত করিতে ইচ্ছা করে, তোমরা তাহাদের আশ্রয়স্বরূপ হও। তোমাদের অল্প সর্বাপেক্ষ উংকৃষ্ট। দ্যাবাপৃথিবীকে সকলে স্তুতি করে, অল্পকাম হইয়া মহা স্তোত্রদ্বারা তোমাদের স্তব করিব॥ ঋগ্বেদ : ২.৩২.১॥
মাকির্নেশন্মাকীং রিযন্মাকীং সং শারি কেবটে।
অথারিষ্টাভিরা গহি ॥
অর্থাৎ, —(হে পূষন), আমাদিগের গরুগুলি যেন নষ্ট না হয়, তাহারা যেন হিংসিত না হয়, তাহারা যেন গর্তে না পড়িয়া যায়; এইরূপে অমঙ্গলহীন গরুগুলির সহিত তুমি আগমন কর। ঋগ্বেদ : ৬.৫৪.৭॥
নূ গৃণানো গৃণতে প্রত্ন রাজন্নিষল পিন্ব বসুদেয়ায় পূর্বীঃ।
অপ ওষধীরবিষা বনানি গা অৰ্বতো নৃন্বচলে রিরীহি।
অর্থাৎ, —হে পুরাতন রাজা (ইন্দ্র), তুমি স্তুত হইয়া তোমার দেয় যে ধনসমূহ সেইগুলি এবং অন্নসমূহ শীঘ্র আমাদিগকে দাও; এবং বৃষ্টি, ওষধিসমূহ নির্বিষ বৃক্ষগুলি, গরুগুলি, অশ্বগুলি এবং মনুষ্যগুলি আমাদিগকে দাও॥ ঋগ্বেদ : ৬.৩৯.৫ ॥
উদ্ধৃতিগুলি খুব কিছু সযত্ন-চয়নের পরিচায়ক নয়—প্রায় এলোমেলোভাবে নমুনা-পরিদর্শন বা sample survey-র মতো করেই গ্রহণ করা হয়েছে। এর থেকেই অনুমান করা যাবে ঋগ্বেদের কবির যে-কামনা অবলম্বন করে কবিতা বা গান রচনা করতেন সেগুলির স্বরূপ মূলতই লোকায়তিক; পরলোক বা পরকাল-সম্পর্কিত কামনা নয়, মোক্ষপ্রাপ্তির উদ্দেশ্যে প্রার্থনা-উপাসনা নয়।
অবশ্যই দেবতাদের উদ্দেশ্যে রচিত এই সাহিত্য। কিন্তু আমরা আগেই বলেছি, আধুনিক আধ্যাত্মিক অর্থে ঋগ্বেদের দেবতাদের দেবত্বপ্রাপ্তি হয়নি। উপরোক্ত উদ্ধৃতিগুলির মধ্যেই তাদের সখা বা বন্ধুভাবে আহ্বান করবার পরিচয় রয়েছে। এখানে সে-প্রসঙ্গে আরো কিছু দৃষ্টান্ত উদ্ধৃত করা যায়।
হয়ে দেবী যুয়মিদাপয় স্থ তে মূলত নাধমানায় মহ্যম্।
মা বো রথো মধ্যমবালৃতে ভূন্মা যুষ্মাবৎস্বাপিষ্ণু শ্রমিষ্ম॥
অর্থাৎ, —হে দেবগণ (বিশ্বদেবগণ)! তোমরাই আমাদের বন্ধু। আমরা, যাহারা যাঞ্চা করিতেছি, তাহাদের অভিমত ফল প্রদান কর। তোমাদের রথ আমাদের যজ্ঞে যেন মন্দগতি না হয়। তোমাদের ন্যায় বন্ধু পাইয়া আমরা যেন শ্রান্ত না হই॥ ঋগ্বেদ : ২.২৯.৮ ॥
নিষষিধ্বরীন্ত ওষধীরুতাপো রয়িং ত ইন্দ্র পৃথিবী বিভর্তি।
সখায়স্তে বামভাজঃ স্যাম মহদ্দেবানামসুরত্বমেকম্॥
—অর্থাৎ,–হে ইন্দ্র, ওষধিসমূহ এবং জল তোমারই নির্মিত, তোমার ধন পৃথিবী ধারণ করে; আমরা তোমার সখা এবং তোমার ঈপ্সিত ধনের ভাগী (বামভাজঃ); তুমি শ্রেষ্ঠ দেবগণের মধ্যে একমাত্র অসুর॥ ঋগ্বেদ : ৩.৫৫.২২ ৷।
পুরাণমোকঃ সখ্যং শিবং বাং যুবোর্নরা দ্রবিণং জহ্নাব্যাম্।
পুনঃ কৃন্বানাং সখ্যা শিবানি মধ্বা মদেম সহ নু সমানাঃ॥
অর্থাৎ, (হে অশ্বিদ্বয়!) তোমাদিগের বাসস্থান পুরাতন, তোমাদিগের সখ্য মঙ্গলকর, তোমাদিগের ধন জাহ্নবীতে অবস্থিত; পুনরায় তোমাদের বন্ধুত্ব মঙ্গলময় হউক, আমরা মধুদ্বারা তোমাদের সহিত সমানভাবে আনন্দ করি। ঋগ্বেদ; ৩.৫৮.৬॥
সংক্ষেপে : ঋগ্বেদ সংহিতা মুখেমুখে রচনা-করা কবিতা বা গানের সংকলন। কেননা, বৈদিক মানুষেরা তখনো লেখার হরফ আবিষ্কার করেননি—লেখার হরফ পশুপালনজীবী পর্যায়ের পরের আবিষ্কার। এ-সাহিত্য তবুও বিলুপ্ত হয়নি; কেননা কানে শুনে পরম যত্নে মুখস্থ করে রাখবার ব্যবস্থা ছিলো। তাই নাম শ্রুতি। কামনাই হলো এ-সাহিত্যের প্রাণবস্তু। এবং তা হওয়াই স্বাভাবিক। কেননা, পৃথিবীতে আজো যে-সব মানবদল পিছিয়ে-পড়া অবস্থায় আটকে রয়েছে তাদের পরীক্ষা করলে দেখা যায়, প্রাচীন সমাজে কামনা ছাড়া গান হয় না। শুধু তাই নয়; প্রাচীন মানুষদের কাছে সমস্ত গানেরই একটা প্রয়োগের দিক আছে, কাজের সঙ্গে সম্পর্কের দিক আছে। ঋক-মন্ত্রগুলিরও যে এককালে এই বৈশিষ্ট্য ছিলো তার স্মৃতি উত্তরযুগেও বৈদিক মানুষদের মন থেকে মুছে যায়নি : “প্রত্যেক মন্ত্রের কোনও-না-কোন কর্মে, কোনও-না-কোন অনুষ্ঠানে, বিনিয়োগ হইত। যাজ্ঞিকদের মতে প্রত্যেক মন্ত্রই কোনও-না-কোন কাজে লাগিবে, কোনও-না-কোন অনুষ্ঠানে প্রযুক্ত হইবে। অকেজো মন্ত্রের কোন সার্থকতা নাই।”(২৫) অবশ্যই পরের যুগে ব্রাহ্মণগ্রন্থগুলিতে ঋগ্বেদের মন্ত্রগুলির যে-বিনিয়োগ নির্দিষ্ট হয়েছে বৈদিক সংস্কৃতির আদিপর্বেও যে এগুলি সেই ভাবেই এবং সেই কাজেই প্রযুক্ত হতো সে-বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে। কেননা, আচার্য রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী(২৬) যে-রকম বলছেন, এই ব্রাহ্মণগ্রন্থগুলিতে বৈদিক যজ্ঞের আদি-তাৎপর্যের পরিচয় পাওয়া যায় না : “আর্যেতর অন্যান্য জাতির মধ্যেও যজ্ঞানুষ্ঠান কোনও-না-কোন প্রকারে বিদ্যমান ছিলো এবং এখনো আছে…। ভারতবর্ষে বেদপন্থী সমাজে যজ্ঞানুষ্ঠান কালক্রমে অত্যন্ত পল্পবিত হইয়া অত্যন্ত জটিলতা পাইয়াছিল। বহু অনুষ্ঠানের গোড়ার তাৎপর্য লোকে ভুলিয়া গিয়াছিল। কিন্তু তাৎপর্য আরোপ-করিবার লোকের অভাব ছিল না!” আচার্য রামেন্দ্রসুন্দরের মতে ব্ৰহ্মবাদী বা ব্রাহ্মণগ্রন্থের লেখকের উত্তরযুগে যজ্ঞের উপর এইভাবে নিজেদের কল্পনা-প্রসূত তাৎপর্য আরোপ করেছিলেন। যজ্ঞকথার আলোচনায় আমরা পরে প্রত্যাবর্তন করবো। আপাতত আমাদের মন্তব্য শুধু এই যে, প্রাচীন সমাজের সাহিত্য বলেই আধুনিক কালের অসভ্য মানুষদের সাহিত্যের মতোই ঋগ্বেদের ছন্দোবদ্ধ রচনাগুলির একটা প্রয়োগের দিক—কর্মের সঙ্গে সম্পর্কের দিক—ছিলো; এবং উত্তরকালের ওই বিনিয়োগব্যবস্থার মধ্যে তারই স্মৃতি খুঁজে পাওয়া যায়, যদিও তার আদিতাৎপর্য খুঁজে পাওয়া যায় কিনা সে-বিষয়ে বিদ্বানের সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
