ওদের স্তোত্রর একটি নমুনা :
Father Rain falls into a solitary place.
Father Rain falls into a solitary place.
The Lord was in untrodden ground.
Hold the Father well, He holds our few souls.
Hold the Rain well, He holds our few souls.(২০)
পৃথিবীতে আজো যারা পশুপালন-জীবিকার দ্বিতীয় স্তরে আটকে রয়েছে এই হলো তাদের সাহিত্যের নমুনা। বৈদিক আর্যরাও এক সময়ে ওই পর্যায়েই জীবন-যাপন করতেন এবং আজকের ওই আফ্রিকার ট্রাইবদের মতোই সাহিত্য-রচনাও করতেন। অধ্যাপক সেলিগ্মানের মন্তব্য অনুসারে দিনকদের সাহিত্যে আধুনিক আধ্যাত্মিক অর্থে প্রার্থনা-উপাসনার পরিচয় নেই; তার পরিবর্তে সহজ-সরল ভাষায় মনের কামনাগুলির সফলতা চাওয়া : to ask in ordinary simple sentences that their immediate want may be granted। ঋগ্বেদেও তাই; অন্তত ঋগ্বেদের প্রাচীনতর অংশগুলিতে নিশ্চয়ই তাই। সে-আলোচনায় আমরা একটু পরেই প্রত্যাবর্তন করবো। তার আগে, বৈদিক সংস্কৃতির বিচারে নৃতত্ত্বমূলক জ্ঞানের উপযোগিতা সংক্রান্ত কয়েকটি সাধারণ কথা আলোচনা করে নেওয়া বাঞ্ছনীয় হবে। কেননা, বহু শতাব্দী ধরে আমাদের দেশে বৈদিক সাহিত্যকে চরম শ্রদ্ধাভক্তির দৃষ্টিতে দেখা হয়েছে বলেই এ-সম্বন্ধে আমাদের মনে সাধারণভাবে একটা রহস্যঘন আবহাওয়া সৃষ্টি হয়েছে। তার দরুন, বৈদিক সাহিত্যের সবচেয়ে সহজ ও স্পষ্ট অর্থও আমাদের চোখে পড়তে চায় না—কার্ল মার্কস্ যাকে বলেছেন, a certain judicial blindness (পৃ. 549) I নৃতত্ত্বের দিক থেকে বোঝবার চেষ্টার করলে আমাদের কাছে অন্তত একটি কথা স্পষ্ট হয়ে থাকবে : যাঁরা এ-সাহিত্য রচনা করেছিলেন তাঁরা ঠিক কোন স্তরের জীবন-যাপন করতেন। এ-বিষয়ে চেতনা, আমাদের মনের ওই রহস্যঘন আবহাওয়াকে কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করবে এবং বৈদিক সাহিত্যের সহজ-সরল ইংগিতগুলিকে গ্রহণ করবার জন্য আমাদের মনকে প্রস্তুত করা যাবে।
——————
১. M.. W।internitz HIL 65n.
২. ERE 4:704ff.
৩. F. Engels OFPPS 259ff. G. Thomson SAGS 33.
৪. G. Childe A 78-93.
৫. ERE 4:705.
৬. M. Winternitz op, cit. 64.
৭. ERE 2:351.
৮. ERE 4:708.
৯. ERE 4:709.
১০. রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী : রচনাবলী ৩:৫২৮।
১১. ঐতরেয় ব্রাহ্মণ (ত্রিবেদী) ১২১-২।
১২. A. A. Macdonell VM 65.
১৩. ERE 4:707.
১৪. Ibid.
১৫. Ibid.
১৬. G. Thomson SAGS 158.
১৭. A. A. Macdonell op. cit. 27.
১৮. Ibid. 45.
১৯. ERE 4707.
২০. Ibid.
০২. বৈদিক সংস্কৃতি ও নৃতত্বের জ্ঞান
কিন্তু নৃতত্বের দিক থেকে প্রাচীন সাহিত্যকে বোঝবার বিরুদ্ধে আধুনিক মনের একটা বাধাও আছে; সে-বাধার কথা শুধুমাত্র আমাদের দেশের প্রাচীন সাহিত্য সম্বন্ধেই প্রযোজ্য নয়।
প্রাচীন রোমের আধুনিক ইতিহাস প্রসঙ্গেও অধ্যাপক জর্জ টম্সন(২১) মন্তব্য করছেন, এ-সম্প্রদায়ের ঐতিহাসিকদের নিয়ে মুস্কিল এই যে, ট্রাইব্যালসমাজ বলতে ঠিক কী বোঝায়, সে-প্রশ্ন না তুলেই এঁরা প্রাচীন রোমের ট্রাইব্যাল সংগঠনগুলির ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করেন।
এর কারণ, ট্রাইব্যাল-সমাজকে সম্যকভাবে চেনবার বিরুদ্ধে আধুনিক মনের প্রতিবন্ধ। কেননা, সে-সমাজের অকৃত্রিম রূপটি হলো প্রাক্-বিভক্ত সাম্য-সংগঠন। সেখানে আধুনিক অর্থে পরিবার-জীবন, ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও রাষ্ট্রশক্তির পরিচয় নেই; অথচ আধুনিক মনের কাছে এগুলিই পবিত্রতম সমাজ-উপকরণ। আজীবন গবেষণার ফলে মর্গান ট্রাইব্যাল-সমাজের স্বরূপ আবিষ্কার করেছেন। তাঁর গবেষণা যুগান্তকারী হলেও আধুনিক বিদ্বানসমাজে স্বীকৃত হয়নি।
গ্রীক-পুরাণে দেবী এথিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন পূর্ণ রণসাজে সজ্জিতা অবস্থায়। কিন্তু বাস্তব পৃথিবীতে কোনো মানবীই এ-সুযোগ পায় না। তেমনি, বাস্তব ইতিহাসে মানবজাতির কোনো শাখাও সভ্য ও উন্নত অবস্থায় আবির্ভূত হবার সুযোগ পায়নি। আধা-জানোয়ারের মতো অবস্থা থেকে শুরু করেই কয়েক লক্ষ বছরের প্রচেষ্টায় মানুষ নানা পর্যায় পার হয়ে শেষ পর্যন্ত সভ্যতার আঙিনায় এসে পৌঁছেছে। আমাদের পূর্বপুরুষদের সম্বন্ধেও এই কথা। বৈদিক আর্যদের সম্বন্ধেও এই কথাই। এ-কথা ভাবতে আমাদের হয়তো কিছুটা ক্ষুন্ন হয়; কিন্তু প্রাচীন-সমাজকে সম্যকভাবে চেনবার বিরুদ্ধে আসল বাধাটা এই রকম মান-অভিমানের(২২) ব্যাপার নয়। কেননা, আমাদের আরো সুদূর পূর্বপুরুষেরা বনমানুষ ছিলেন—এ-কথা স্বীকার করায় অভিমান আহত হবার সম্ভাবনা অনেক বেশি হলেও জীবজগতের ক্রমবিকাশের কাহিনী শুনতে আমাদের আটকায় না। কিন্তু প্রাচীন-সমাজের প্রকৃত কাহিনী শুনতে আটকায়। তার কারণ, মানব-ইতিহাসের ওই অতীত অধ্যায়গুলি মৃত ও মূক অতীতমাত্র নয়; ভবিষ্যতের উপর থেকেও সেগুলি যবনিক উত্তোলনের আয়োজন করে।
এই কারণেই মর্গানের গবেষণার বিরুদ্ধে আধুনিক সমাজের এতোখানি প্রতিবন্ধ। এবং সে-প্রতিবন্ধের দরুন প্রাচীন ইতিহাসের অনেক অধ্যায়ই আমাদের কাছে অস্পষ্ট হয়ে আছে। আধুনিক ঐতিহাসিকেরা প্রাচীন যুগ প্রসঙ্গে ট্রাইব বা ট্রাইব্যাল সমাজ প্রভৃতি কথা যতো সহজে ব্যবহার করেন, তার অনুপাতে এ-সমাজের প্রকৃত রূপটিকে চেনবার ও স্বীকার করবার উৎসাহ প্রদর্শন করেন না।
