এখানে বিশেষ করে গ্রীক ইতিহাস থেকেই কয়েকটি দৃষ্টান্ত উদ্ধৃত করা হলো। কেননা, প্রাচীন গ্ৰীক সমাজ-এর আলোচনা প্রসঙ্গেই অধ্যাপক জর্জ টম্সন এই ডালিম ফলের তাৎপর্যটি নির্ণয় করেছেন। আমাদের যুক্তি হলো, প্রাচীন গ্ৰীক সংস্কৃতির আলোচনা-প্রসঙ্গে এই ডালিম-রহস্য যদি স্পষ্টভাবে জানতে পারা গিয়ে থাকে তাহলে তারই সাহায্যে প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আজো যা অস্পষ্ট হয়ে রয়েছে তার তাৎপর্য অনুসন্ধান করা অসম্ভব নাও হতে পারে। অতএব এই ডালিম-ফলের তাৎপর্য প্রসঙ্গে অধ্যাপক জর্জ টম্সন(৩৮৮) কী বলছেন তাই দেখা যাক।
প্রাচীন পরিব্রাজক পৌসানিয়াস্-এর কাছ থেকে প্রাচীন গ্ৰীক সমাজ সংক্রান্ত নানা খবর পাওয়া যায়। কিন্তু ডালিম-ফলের রহস্য উদঘাটন করতে তিনি দ্বিধাগ্রস্ত : ‘ডালিমের কথা আমি বিশেষ কিছু বলবে না, কেননা তার রহস্য অত্যন্ত গোপন। অধ্যাপক জর্জ টম্সন প্রশ্ন তুলছেন, গোপন রহস্যটা কী রকম?
ডালিম-ফলের ভিতরটা টুকটুকে লাল। ডালিমের দানা থেকেই গ্ৰীক ভাষায় রক্তবর্ণসূচক শব্দটি এসেছে। ডালিম তাই রক্তের প্রতীক। এ-কথা অনেকেই স্বীকার করেছেন। কিন্তু রক্তের তাৎপর্য এখানে ঠিক কী?— এ-প্রশ্নের সমাধান ঠিকমতো করা হয়নি। কেউ কেউ মনে করেন, খুন বা অপঘাত-মৃত্যুর সঙ্গেই এ-রক্তের সম্পর্ক। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে টাইটানরা ডাইওনিসাসকে হত্যা করলে পর তাঁরই রক্ত থেকে ডালিম গাছের জন্ম হয়। এ-ছাড়াও মৃত্যু ও অপঘাতের সঙ্গে ডালিম-এর সম্পর্ক আরো কোনো কোনো দিক থেকে পাওয়া যায় : প্রাচীনদের বিশ্বাস অনুসারে ডালিমের স্বপ্ন অপঘাতের সূচনা করে। কিন্তু অধ্যাপক জর্জ টম্সন দেখাচ্ছেন, রক্ত ও রক্তবর্ণের প্রতীক ডালিমের এই অনুষঙ্গগুলি মুখ্য নয়,—গৌণ। অর্থাৎ এগুলির পিছনে একটি মুখ্য তাৎপর্য আছে—সেই তাৎপর্যেরই আলোচনা তুলতে পৌসানিয়াসের সংকোচ হয়েছে।
ডালিম হলো রক্তের প্রতীক। কিন্তু কোন ধরনের রক্ত? প্রাচীন গ্ৰীক বৈদ্যশাস্ত্র থেকে তা আন্দাজ করা যেতে পারে। গ্ৰীক বৈদ্যর ঋতু ও গর্ভ ব্যাপারেই ডালিম ব্যবহার করবার নির্দেশ দিয়েছেন। এই কারণেই, কোনো কোনো গুহ্য-সম্প্রদায়ের কাছে ডালিম ছিলো ‘টাবু’ : ঋতু-রজকে প্রাচীন কালের মানুষেরা ‘টাবু’ মনে করতেন। থেস্মোফোরিয়া-উৎসবের সময় মেয়েদের পক্ষে শুধুই যে মৈথুন নিষিদ্ধ ছিলো তাই নয়; সেই সঙ্গে ডালিমও ছিলো নিষিদ্ধ। আর সেই সঙ্গে নির্দেশ ছিলো, তাদের শ্বেত-শয্যায় শুতে হবে, কেননা এই শ্বেত-শয্যার দরুন তাদের কামভাব সংহত থাকবে এবং তাছাড়াও শয্যার কাছে সাপ আসতে পারবে না। (প্রাচীনদের কল্পনা অনুসারে সাপের সঙ্গেও মেয়েদের যৌন-জীবনের যোগাযোগ আছে। c.f. ‘সাপের স্বপ্ন দেখলে ছেলে হয়’।) অধ্যাপক জর্জ টম্সন তাই সিদ্ধান্ত করছেন, শ্বেত-শয্যা যদি মেয়েদের রতিবাসনার প্রতিষেধক বলে বিবেচিত হয় তাহলে সেইসঙ্গেই ডালিম-পরিহারের নির্দেশ থেকে অনুমান করা অসঙ্গত নয় যে, এই ডালিম রতিবাসনার উদ্দীপক বলেই বিবেচিত হয়েছিলো। আর তাই, ডালিম যে-রক্তের প্রতীক সে-রক্তের আদি-তাৎপর্য আঘাত-জাত রক্ত নয়; নারীর যৌন-জীবনের সঙ্গে সংযুক্ত রক্ত—ঋতু-রজ। প্রাচীনদের কল্পনা অনুসারে, নারীর উৎপাদিকা-শক্তির মূলে রয়েছে এই ঋতুরজই। এবং এই ঋতুরজের সঙ্গে সাদৃশ্যের দিক থেকেই ডালিম তাদের কাছে উর্বরতার প্রতীক। পৌসানিয়াস যে কেন ডালিমের রহস্য ব্যাখ্যা করতে সংকোচ বোধ করেছিলেন তা বুঝতে পারাও তাই কঠিন নয়।
এদিক থেকে মনে হয় কৃষিকেন্দ্রিক ওই ব্রতটিকে ষোলো আনা মেয়েলি ব্যাপার হবার সুযোগ দিয়ে অনুষ্ঠানের কেন্দ্র থেকে সরে দাঁড়িয়ে আমাদের গণপতি শোভন কাজই করেছিলেন। অন্যত্র, বার্তাশস্ত্রোপজীবী পর্যায়ের আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে তিনি পুরুষ হয়েও যখন সংশ্রব ছাড়তে রাজি হন না তখন তার আচরণ সত্যিই অশোভন এবং অসংলগ্ন হয়ে দাঁড়ায়। যেমন, গণেশের হাতে ঋতুরজের ওই প্রতীকটি। কিংবা, ওই ডালিমের রহস্যের সূত্র ধরেই আরো অগ্রসর হলে আরো অশোভনতার এবং অসংলগ্নতার পরিচয় পাওয়া যায়। সে-অসংলগ্নতার প্রকৃত কারণ বুঝতেও তেমন অসুবিধে হবার কথা নয়। কৃষিকাজ মেয়েদের আবিষ্কার, কৃষিকেন্দ্রিক প্রাচীন অনুষ্ঠান তাই নারীজীবনের নানারকম গোপন ও গভীর রহস্যের সঙ্গে জড়িত।
ইতিপূর্বে আমরা উল্লেখ করেছি, রক্ত বর্ণের সঙ্গে নানাদিক থেকে গণেশের নানারকম সম্পর্ক রয়েছে। সিদুঁরের নাম নাম গণেশ-ভূষণ। অথচ, এই ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতেই অশোভন এবং অসংলগ্ন। কেননা এই সিদুঁর সধবাদেরই সিঁথির ভূষণ। সিঁদুরের তাৎপর্যটা কী? এই প্রশ্নের উত্তরেও অধ্যাপক জর্জ টম্সন বহু তথ্য পর্যালোচনা করে যে সাধারণ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন তারই উল্লেখ করা যাক। অধ্যাপক টম্সনের মন্তব্য প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতির নানা মৌলিক বিষয়ের উপর আলোকপাত করবে। তাই সুদীর্ঘ উদ্ধৃতি অবান্তর হবে না(৩৮৯) :
It is important to observe that the magic of human fecundity attaches to the process, not to the result—to the lochial discharge, not to the child itself; and consequently all fluxes of blood, menstrual as well as lochial, are treated alike as manifestations of the life-giving power inherent in the female sex. In primitive thought menstruation is regarded, quite correctly, as a process of the same nature as childbirth.
