অতএব, দেবীমাহাত্ম্যে দেবীকে যেভাবে বেদবন্দিতা (৩৫৬) বলতে শোনা যায় তা আর যাই হোক বৈদিক ঐতিহ্যের পরিচায়ক নয়। কেননা ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের দেবীমূক্ত যে অনেক অর্বাচীন, এ-কথায় আধুনিক গবেষকেরা একমত (৩৫৭)। বৈদিক সাহিত্যের এই বৈশিষ্ট্যটির কথা আধুনিক পণ্ডিতদের মধ্যে অনেকেই (৩৫৮) উল্লেখ করছেন। কিন্তু এর ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা সকলে করেন না। আমাদের যুক্তি হলো, বৈদিক মানুষদের জীবনে পশুপালন-প্রাধান্য থেকেই ওই পুরুষপ্রধান বৈদিক দেবলোকের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।
বৈদিক ধ্যানধারণা যে পুরুষপ্রধান তার নজির হিসেবে ম্যাকডোন্তান্ড প্রমুখ আধুনিক বিদ্বানের প্রধানতই বৈদিক দেবলোকটিকে এইভাবে বিশ্লেষণ করতে চেয়েছেন ; এ-দেবলোক পুরুষমাহাষ্মে পূর্ণ, দেবীদের দৃষ্টান্ত এখানে দুর্লভ। কিন্তু বৈদিক ধ্যানধারণার ওই পুরুষ-প্রাধান্যের আরো চূড়ান্ত নিদর্শন হলো ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের বিখ্যাত পুরুষসূক্ত (৩৫৯):
পুরুষং এবেদং সৰ্ব ষদ্ভূতং যচ্চ ভব্যম্
উতামৃতত্বস্যেশানো যদন্নেনাতিরোহতি।।
ইত্যাদি। ইত্যাদি।
শ্রীযুক্ত রমেশচন্দ্র দত্তর (৩৬০) তর্জমা থেকে এখানে পুরুষসূক্তের কিয়দংশ উদ্ধৃত করা যাক :
যাহা হইয়াছে, অথবা যাহা হইবেক, সকলি সেই পুরুষ। তিনি অমরত্বলাভে অধিকারী হয়েন, কেননা তিনি অন্নদ্বারা অতিরোহন করেন।
তাঁহার এতাদৃশ মহিমা, তিনি কিন্তু ইহা অপেক্ষাও বৃহত্তর। বিশ্বজীবসমূহ তাঁহার একপাদ মাত্র, আকাশে অমর অংশ তাঁহার তিনপাদ।
পুরুষ আপনার তিনপাদ লইয়া উপরে উঠলেন। তাহার চতুর্থ অংশ এই স্থানে রহিল। তিনি তদনন্তর ভোজনকারী ও ভোজনরহিত তাবৎ বস্তুতে ব্যাপ্ত হইলেন। ইত্যাদি। ইত্যাদি।
এই পুরুষসূক্তকে অবলম্বন করে বহু আধ্যাত্মিক আলোচনার (৩৬১) অবতারণা করা হয়েছে। কিন্তু বিদ্বানেরা এখনো এই প্রসঙ্গে সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্নটি উত্থাপন করেননি : এখানে নারীর বদলে পুরুষকেই কেন আদি-কারণ বলে বর্ণনা করা হয়েছে? প্রশ্নটি প্রাসঙ্গিক। কেননা, আদি-কারণ হিসেবে পুরুষের বদলে নারীকেও বর্ণনা করা সম্ভব। বস্তুত, আমাদের দেশেই বৈদিক চিন্তাধারা ছাড়াও আর একটি চিন্তাধারা প্রবাহিত ছিলো। সেই ধারা অনুসারে বিশ্বের আদি-কারণ পুরুষ নয়—নারী। এই অবৈদিক চিন্তাধারাটির নাম তন্ত্র। তন্ত্রমতে নারীই আদ্যাশক্তি, জগদম্বা।
আমাদের মন্তব্য হলো, মানুষের ধ্যানধারণা স্বয়ম্ভু নয়। তার মধ্যে বাস্তব সমাজ-জীবনের প্রতিবিম্ব খুজে পাওয়া যায়। ওই পুরুষসূক্তে পুরুষপ্রধান সমাজেরই প্রতিচ্ছবি। এবং বৈদিক সমাজ যে পুরুষপ্রধান ছিলো তাও অকারণ নয় : বৈদিক মানুষদের প্রধানতম জীবনোপায় বলতে পশুপালনই।
বলাই বাহুল্য, তার মানে এই নয় যে, বৈদিক সাহিত্যে কৃষিকাজের কোনো পরিচয় নেই। কৃষিকাজেরও পরিচয় পাওয়া যায়। এ-বিষয়ে অনেকেই (৩৬২) ইতিপূর্বে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। এমনকি, অশ্বমেধ যজ্ঞাদির আলোচনা প্রসঙ্গে কপ্পারস্ (৩৬৩), এরেনফেলস্ (৩৬৪) প্রমুখ কোনো কোনো আধুনিক গবেষক দেখাবার চেষ্টা করেছেন যে, বাজসনেয়ী সংহিতায় নারী-প্রাধান্যমূলক ধ্যানধারণা ও আচার-অনুষ্ঠানের পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে। আমরা ইতিপূর্বে (পৃ. ১৩৪) বাজসনেয়ী সংহিতা থেকে কিছুটা অংশ বিশ্লেষণ করবার চেষ্টা করেছি এবং ওই বামাচারী অনুষ্ঠানটির সঙ্গে কী ভাবে ক্ষেত্রে বীজবপনের প্রসঙ্গ উঠলে সে-দিকে পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। অতএব, সংহিতা-সাহিত্যের এই অংশে যদি নারীপ্রাধান্যের পরিচয় সত্যিই পাওয়া যায় তাহলে তার সঙ্গে কৃষিকর্মের যোগাযোগের ইঙ্গিতটুকুও অস্পষ্ট নয়। আলোচনার বর্তমান পর্যায়ে আমাদের যুক্তি হলো, এই জাতীয় নারীপ্রাধান্য ও কৃষিকর্মের পরিচয় বৈদিক সাহিত্যের মুখ্য অঙ্গ নয়। অর্থাৎ, বেদে কৃষিকর্মের নিদর্শন আবিষ্কার করা সম্ভব হলেও বৈদিক মানুষদের প্রধানতম জীবনোপায় বলতে পশুপালনই। তেমনি, বৈদিক মানুষদের চেতনায় ও আচার-অনুষ্ঠানে নারীপ্রাধান্যের চিহ্ন খুঁজে পাওয়া অসম্ভব না হলেও সে-চেতনার প্রধানতম বৈশিষ্ট্য হলো পুরুষপ্রাধান্য।
বৈদিক সাহিত্য সম্বন্ধে কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হবার আগে মনে রাখা দরকার, এ-সাহিত্য সুবিশাল ও জটিল। সেই সঙ্গে একথাও মনে রাখা দরকার যে, আমাদের দেশে বৈদিক ঐতিহ্যই একমাত্র ঐতিহ্য নয়। অ-বৈদিক মানুষদের মধ্যে যারা আয়ুধজীবী পর্যায়কে পিছনে ফেলে এগিয়ে এসেছিলো তারা পশুপালনের দিকে অগ্রসর না হয়ে প্রধানতই বার্তাশস্ত্রোপজীবী পর্যায়ে উপনীত হয়েছিলো। এই কারণেই, ভারতীয় সংস্কৃতির অ-বৈদিক ধারাটি শক্তি-প্রধান বা মাতৃপ্রধান।
২ : সাধারণত যাদের স্থানীয় অনার্য বলে উল্লেখ করা হয় তারা কৃষিজীবী ছিলো এবং কৃষিজীবী হিসেবেই থেকে গিয়েছিলো। এবং এর ফলে তাদের মধ্যে মাতৃপ্রাধান্যের বিকাশ ঘটাই স্বাভাবিক। শ্ৰীযুক্ত ক্ষিতিমোহন সেন (৩৬৫) বলছেন, “আর্যদের মধ্যে প্রধান হলো পুরুষ। তাকে বলে বীজপ্রাধান্য। পরে দ্রাবিড়াদি জাতির মাতৃতন্ত্র সমাজের প্রভাবে মায়ের জাতই সন্তানেরা পেতে লাগলেন। তার নাম ক্ষেত্রপ্রাধান্য। তা অনার্য প্রভাবের ফল।” এবং “শ্রাদ্ধের নিমন্ত্রণে গুরু এবং মাতামহ, মামা, ভাগ্নে, দৌহিত্র, জামাতা, মাসতুত-পিসতুত ভাই প্রভৃতি কন্যাগত সম্বন্ধযুক্তদেরই আদর বেশি। কন্যাতন্ত্রতাও আর্যদের নয়। কূর্মপুরাণে বলেন, মাতৃযাগ না করে বৃদ্ধিশ্রাদ্ধ করলে মাতৃগণ হিংসা করেন। অকৃত্বা মাতৃযাগন্তু য: শ্ৰাদ্ধন্তু নিবেশয়েং। তস্ত ক্ৰোধসমাবিষ্ট হিংসামিচ্ছন্তি মাতরঃ।” (৩৬৬) শ্ৰীযুত ক্ষিতিমোহন সেন-এর মতে এটা অবশুই অনার্য প্রভাবের ফল।
ওই তথাকথিত দ্রাবিড় বা আর্য-বহির্ভূতদের মধ্যে মাতৃপ্রাধান্যের বিকাশ কেন হয়েছিলো ? এই সমস্যার সমাধান পাওয়া যাবে তাদের কৃষিপ্রাধান্য থেকেই। এবং আমরা দেখবার চেষ্টা করবো, এই কৃষিবিদ্যার দিক থেকেই লোকায়তিক, তথা তান্ত্রিক, ধ্যানধারণার উৎস আবিষ্কার করা অসম্ভব নয়। তাই, আর্য-বহির্ভূত ওই কৃষিজীবীদের বিষয় নানা দিক থেকে আলোচনা তোলবার প্রয়োজন হবে। কিন্তু বর্তমানে আশাকরি এটুকু বলা অসঙ্গত নয় যে, ব্রত ও বামাচার-প্রসঙ্গে আমরা ইতিপূর্বে একটি সমস্যার অবতারণা করেছিলাম এবং আমাদের আলোচনার বর্তমান পর্যায়ে পৌছে সে-সমস্যার সমাধান পাওয়ার সম্ভাবনা হয়েছে।
সমস্যাটা কী? আমরা ইতিপূর্বে (পৃ. ১৫১) দেখেছি যে, বৈদিক অনুষ্ঠান এবং আদি অকৃত্রিম ব্ৰতগুলির তুলনা করতে গিয়ে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলছেন, “আর্য এবং আর্যপূর্ব ইজনেরই সম্পর্ক, যে-পৃথিবীতে তারা জন্মেছে তাকেই নিয়ে,…স্কু’জনে ব্রত করছে যা কামনা করে, সেটা দেখলে এটা স্পষ্টই বোঝা যাবে ; কেবল পুরুষের চাওয়া আর মেয়েদের চাওয়া, বৈদিক অনুষ্ঠান পুরুষদের এবং ব্ৰত অনুষ্ঠান মেয়েদের, এই যা প্রভেদ।” উপনিষদে বামাচারের স্মারকগুলি নিয়ে আলোচনা করবার সময়েও লোকায়তিক বামাচারের সঙ্গে আমরা এরই অনুরূপ একটি প্রভেদ দেখেছি (পৃ. ১১৬) : বৈদিক বামাচার পুরুষপ্রধান, লোকায়তিক বামাচার স্ত্রী-প্রধান। সমস্যা হলো, এই প্রভেদের কারণ কী? আলোচনার বর্তমান পর্যায়ে পৌছে আমরা এই প্রভেদের কারণটি অনুমান করবার সুযোগ পাই। ভারতীয় সংস্কৃতির ওই ছুটি মূল ধারা, অর্থাৎ বৈদিক ও অ-বৈদিক ধারার মধ্যে মৌলিক তফাত আছে : বৈদিক সংস্কৃতি পুরুষ-প্রধান, অ-বৈদিক সংস্কৃতি নারী-প্রধান। এবং এই প্রভেদের কারণ হলো, বৈদিক মানুষদের জীবিকা-বৃত্তি প্রধানতই পশুপালন-মূলক, তথাকথিত অনার্য বা আর্যপূর্ব মানুষদের জীবিকা-বৃত্তি প্রধানতই কৃষিমূলক।
