বিজয়া। কিন্তু মামার পূজোবাড়িতে এসে তাঁকে সাহায্য না করে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন যে বড়ো? গুটি-দুই পুঁটি মাছ দিয়ে ত তাঁর সাহায্য হবে না!
নরেন। (হাসিয়া) না, কিন্তু প্রথমতঃ, মামার বাড়িতে আমি আসিনি, দ্বিতীয়তঃ, তাঁকে সাহায্য করবার বহুলোক আছে। আমার প্রয়োজন নেই।
বিজয়া। মামার বাড়ি আসেন নি? এখানে তবে আছেন কোথায়?
নরেন। বাড়ি আমার ঐ দিঘ্ড়া গ্রামে। এই বাঁশের সাঁকো দিয়ে যেতে হয়।
বিজয়া। দিঘ্ড়ায়? তা হলে নরেনবাবুকে তো আপনি চেনেন? তিনি কি রকম লোক বলতে পারেন?
নরেন। ও—নরেন? তার বাড়িটা ত আপনি দেনার দায়ে কিনে নিয়েছেন? এখন তার সম্বন্ধে অনুসন্ধানে আর ফল কি? যে উদ্দেশ্যে নিলেন সে কথাও এ অঞ্চলের সবাই শুনেছে।
বিজয়া। একেবারে নেওয়া হয়ে গেছে এই বুঝি এদিকে রাষ্ট্র হয়েছে?
নরেন। হবারই কথা। জগদীশবাবুর সর্বস্ব আপনার বাবার কাছে বিক্রি-কবলায় বাঁধা ছিলো, তাঁর ছেলের সাধ্য নেই তত টাকা শোধ করে। মেয়াদও শেষ হয়েছে—এ খবর সবাই জানে কিনা!
বিজয়া। আপনি নিজেই যখন গ্রামের লোক তখন খবর জানবেন বৈ কি। আচ্ছা, শুনেছি নরেনবাবু বিলেত থেকে ভাল করেই ডাক্তারি পাস করে এসেছেন। কোন ভাল জায়গায় practice আরম্ভ করে আরও কিছুদিন সময় নিয়ে কি বাপের ঋণটা শোধ করতে পারেন না?
নরেন। সম্ভব নয়। শুনেছি practice করাই নাকি তার সঙ্কল্প নয়।
বিজয়া। তবে তাঁর সঙ্কল্পটাই বা কি? এত খরচপত্র করে বিলেত গিয়ে কষ্ট করে ডাক্তারি শেখবার ফলটাই বা কি হতে পারে? একেবারে অপদার্থ।
নরেন। অপদার্থ? (হাসিয়া) ঠিক ধরেছেন। এইটেই বোধ হয় তার আসল রোগ। তবে শুনতে পাই নাকি সে নিজে চিকিৎসা করার চেয়ে এমন একটা-কিছু বার করে যেতে চায়, যাতে বহুলোকের উপকার হবে। খবর পাই এ নিয়ে সে পরিশ্রমও খুব করে।
বিজয়া। সত্যি হলে ত এ খুব বড় কথা। কিন্তু বাড়িঘর গেলে কি করে এ-সব করবেন? তখন ত রোজগার করা চাই। আচ্ছা আপনি ত নিশ্চয়ই বলতে পারেন বিলেত যাবার জন্যে এখানকার লোক তাঁকে একঘরে করে রেখেছে কিনা।
নরেন। সে ত নিশ্চয়ই। আমার মামা পূর্ণবাবু তারও একপ্রকার আত্মীয়, তবুও পূজোর কদিন বাড়িতে ডাকতে সাহস করেন নি। কিন্তু তাতে তার ক্ষতি হয়নি। নিজের কাজকর্ম নিয়ে থাকে, সময় পেলে ছবি আঁকে। বাড়ি থেকে বড় বারই হয় না।
কানাই। মা-জী, সন্ঝা হয়ে আসলে; বাড়ি ফিরতে রাত হবে।
নরেন। হাঁ, কথায় কথায় সন্ধ্যা হয়ে এলো।
বিজয়া। তা হলে বাড়িটা গেলে কোনও আত্মীয়-কুটুম্বের ঘরেও তাঁর আশ্রয় পাবার ভরসা নেই বলুন?
নরেন। একেবারেই না।
বিজয়া। (মুহূর্তকাল নীরব থাকিয়া) তিনি যে কারও কাছেই যেতে চান না—নইলে এই মাসের শেষেই ত তাঁকে বাড়ি ছেড়ে দেবার নোটিশ দেওয়া হয়েছে—আর কেউ হলে অন্ততঃ আমাদের সঙ্গেও একবার দেখা করবার চেষ্টা করতেন।
নরেন। হয়ত তার দরকার নেই, নয়, ভাবে লাভ কি? আপনি ত সত্যিই তাকে বাড়িতে থাকতে দিতে পারেন না।
বিজয়া। চিরকাল না পারলেও আর কিছুকাল থাকতে দেওয়া ত যায়। কিন্তু মনে হচ্ছে আপনার সঙ্গে তাঁর বিশেষ পরিচয় আছে। কি বলেন সত্যি না?
নরেন। কিন্তু এদিকে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে যে।
বিজয়া। আসুক।
নরেন। আসুক? অর্থাৎ, দেশের প্রতি আপনার সত্যিকার টান আছে।
বিজয়া। (গম্ভীর হইয়া) তার মানে?
নরেন। মানে এই যে সন্ধ্যাবেলায় এখানে দাঁড়িয়ে থেকে দেশের ম্যালেরিয়াটা পর্যন্ত না নিলে আপনার চলছে না।
বিজয়া। (হাসিয়া) ওঃ, এই কথা! কিন্তু দেশ ত আপনারও। ওটা আপনারও নেওয়া হয়ে গেছে বোধ হয়? কিন্তু মুখ দেখে ত মনে হয় না।
নরেন। ডাক্তারদের একটু সবুর করে নিতে হয়।
বিজয়া। আপনিও কি ডাক্তার নাকি?
নরেন। হাঁ ডাক্তার বটে কিন্তু খুব ছোট্ট ডাক্তার।
বিজয়া। তা হলে আপনি শুধু প্রতিবেশী নন,—তাঁর বন্ধু। তাঁর সম্বন্ধে যে-সব কথা আমি বলেচি, হয়ত গিয়ে তাঁকেই গল্প করবেন—না?
নরেন। (হাসিয়া) কি গল্প করব, বলেছেন একটা অপদার্থ হতভাগা লোক, এই ত? আপনার চিন্তা নেই, এ অত্যন্ত পুরোনো কথা, এ তাকে সবাই বলে। নতুন করে বলবার দরকার নেই। তবে, বললে হয়ত সে কোনদিন আপনার সঙ্গে দেখা করতে যেতে পারে।
বিজয়া। আমার সঙ্গে দেখা করে তাঁর লাভ কি? কিন্তু তাঁর সম্বন্ধে ত ঠিক ও-রকম কথা আপনাকে আমি বলিনি।
নরেন। না বলে থাকলেও বলা উচিত ছিল।
বিজয়া। উচিত ছিল? কেন?
নরেন। ঋণের দায়ে যার বাস করবার গৃহ, যার সর্বস্ব বিক্রি হয়ে যায়, তাকে সবাই হতভাগ্য বলে। আমরাও বলি। সুমুখে না পারলেও আড়ালে বলতে বাধা কি?
বিজয়া। (হাসিয়া) আপনি ত তাঁর চমৎকার বন্ধু!
নরেন। (ঘাড় নাড়িয়া) হ্যাঁ, অভেদ্য বললেও চলে। এমন কি তার হয়ে আমি নিজে গিয়েই আপনাকে ধরতুম, যদি না জানতুম সৎ উদ্দেশ্যেই তার বাড়িখানি আপনি গ্রহণ করছেন।
বিজয়া। আচ্ছা, আপনার বন্ধুকে একবার রাসবিহারীবাবুর কাছে যেতে বলতে পারেন না?
নরেন। কিন্তু তাঁর কাছে কেন?
বিজয়া। তিনি বাবার বিষয়-সম্পত্তি দেখেন কিনা।
নরেন। সে আমি জানি; কিন্তু তাঁর কাছে গিয়ে লাভ নেই। সন্ধ্যা হয়—আসি তবে,—নমস্কার।
[নরেন পুল পার হইয়া বনের ভিতর অদৃশ্য হইয়া গেল। বিজয়া সেইদিকে চাহিয়া রহিল।]
কানাই। এ বাবুটি কে মা-জী?
বিজয়া। (চমকিয়া আপন মনে কহিল) কে তা ত জানিনে। ঐ যাঁদের বাড়িতে পূজো হচ্ছে তাঁদের ভাগনে।
