বিজয়া। আপনি যা ভাল বুঝবেন তাই হবে। টাকা পরিশোধের মেয়াদ ত তাদের শেষ হয়ে গেছে?
রাস। অনেকদিন। শর্ত ছিল, আট বৎসরের, কিন্তু এটা নয় বৎসর চলছে।
বিজয়া। শুনতে পাই তাঁর ছেলে নাকি এখানে আছেন। তাঁকে ডেকে পাঠিয়ে আরও কিছুদিনের সময় দিলে হয় না? যদি কোন উপায় করতে পারেন?
রাস। (মাথা নাড়িতে নাড়িতে) পারবে না—পারবে না—পারলে—
বিলাস। পারলেই বা আমরা দেব কেন? টাকা নেবার সময় সে মাতালটার হুঁশ ছিল না কি শর্ত করেছি? এ শোধ দেব কি করে?
বিজয়া। (বিলাসের প্রতি মাত্র একবার দৃষ্টিপাত করিল। রাসবিহারীর মুখের দিকে চাহিয়া শান্ত-দৃঢ়কণ্ঠে কহিল) তিনি বাবার বন্ধু ছিলেন, তাঁর সম্বন্ধে সসম্মানে কথা কইতে বাবা আমাকে আদেশ করে গেছেন।
বিলাস। (সগর্জনে) হাজার আদেশ করলেও সে যে একটা—
রাস। আহা চুপ কর না বিলাস। পাপের প্রতি তোমার আন্তরিক ঘৃণা যেন না পাপীর ওপর গিয়ে পড়ে। এইখানেই যে আত্মসংযমের সবচেয়ে প্রয়োজন বাবা।
বিলাস। না বাবা, এই-সব বাজে sentiment আমি কিছুতেই সহ্য করতে পারিনে তা সে কেউ রাগই করুক আর যাই করুক। আমি সত্য কথা কইতে ভয় পাইনে, সত্য কাজ করতে পেছিয়ে দাঁড়াই নে।
রাস। তা বটে, তা বটে। তোমাকেই বা দোষ দেব কি। আমাদের বংশের এই স্বভাবটা যে বুড়ো বয়স পর্যন্ত আমারই গেল না! অন্যায় অধর্ম দেখলেই যেন জ্বলে উঠি। বুঝলে না মা বিজয়া, আমি আর তোমার বাবা এই জন্যই সমস্ত দেশের বিরুদ্ধে সত্যধর্ম গ্রহণ করতে ভয় পাইনি। জগদীশ্বর তুমিই সত্য। (এই বলিয়া দুই হাত কপালে ঠেকাইয়া উদ্দেশে নমস্কার করিলেন)
রাস। কিন্তু দেখো মা, আমি যাই হই তবু তৃতীয় ব্যক্তি। তোমাদের উভয়ের মতভেদের মধ্যে আমার কথা কওয়া উচিত নয়। কারণ, কিসে তোমাদের ভাল সে আজ নয় কাল তোমরাই স্থির করে নিতে পারবে। এ বুড়োর মতামতের আবশ্যক হবে না। কিন্তু কথা যদি বলতেই হয় ত বলতেই হবে যে, এক্ষেত্রে তোমারই ভুল হচ্চে। জমিদারি চালাবার কাজে আমাকেও বিলাসের কাছে হার মানতে হয়, এ আমি বহুবার দেখেছি। আচ্ছা তুমিই বল দেখি কার গরজ বেশি? আমাদের না জগদীশের ছেলের? ঋণ পরিশোধের সাধ্যই যদি থাকত, একবার নিজে এসে কি চেষ্টা করে দেখত না? সে ত জানে তুমি এসেছ? এখন আমরাই যদি উপযাচক হয়ে ডাকিয়ে পাঠাই, সে নিশ্চয়ই একটা বড়রকমের সময় নেবে। তাতে ফল শুধু এই হবে যে, দেনাও শোধ হবে না, আর তোমাদের সমাজ-প্রতিষ্ঠার সঙ্কল্পও চিরদিনের মত ডুবে যাবে। বেশ করে ভেবে দেখ দিকি মা, এই কি ঠিক নয়? আর তার অগোচরেও ত কিছু হতে পারবে না। তখন নিজে যদি সে সময় চায় তখন না হয় বিবেচনা করে দেখা যাবে। কি বল মা?
বিজয়া। (অপ্রসন্ন-মুখে) আচ্ছা। কাকাবাবু, আমার বড় দেরি হয়ে গেল, এখন কি যেতে পারি?
রাস। যাও মা যাও, আমিও চললাম।
[বিজয়ার প্রস্থান]
বিলাস। (সক্রোধে) সে যদি দশ বছরের সময় চায় ত বিবেচনা করতে হবে নাকি?
রাস। (ক্রুদ্ধ চাপাকণ্ঠে) হবে না ত কি সমস্ত খোয়াতে হবে? মন্দির-প্রতিষ্ঠা! দেখ বিলাস, এই মেয়েটির বয়স বেশি নয়, কিন্তু সে বেশ জানে যে সেই তার বাপের সমস্ত সম্পত্তির মালিক, আর কেউ নয়। মন্দির-স্থাপনা না হলেও চলবে, কিন্তু আমার কথাটা ভুললে চলবে না।
[প্রস্থান]
[কালীপদর প্রবেশ]
কালী। মা জিজ্ঞাসা করলেন আপনাকে কি আর চা পাঠিয়ে দেবেন?
বিলাস। না।
কালী। শরবত কিংবা—
বিলাস। না দরকার নেই।
কালী। ফল কিংবা কিছু মিষ্টি?
বিলাস। আঃ দরকার নেই বলচি না? তাকে বলে দিও আমি বাড়ি চললুম।
[প্রস্থান]
কালী। বলতে হবে না, তিনি গেলেই জানতে পারবেন।
[প্রস্থান]
বিজয়া – ১.২
দ্বিতীয় দৃশ্য
গ্রাম্যপথ
[পূর্ণ গাঙ্গুলী ও দুই-তিনজন গ্রামবাসীর প্রবেশ]
১ম ব্রাহ্মণ। হাঁ পূর্ণখুড়ো, শুনচি নাকি পূজো করবার হুকুম পাওয়া গেছে?
পূর্ণ। হাঁ বাবা, জগদম্বা মুখ তুলে চেয়েছেন। জমিদারবাড়ি থেকে হুকুম পাওয়া গেছে, পূজোয় তাঁর আপত্তি নেই।
১ম ব্রাহ্মণ। শুনে পর্যন্ত দুশ্চিন্তার অবধি ছিল না খুড়ো। সবাই ভাবছিল তোমাদের এতকালের পূজোটা বুঝি এবার বন্ধ হয়ে যায়। হুকুম দিলে কে?
পূর্ণ। জমিদারকন্যা স্বয়ং। এ-সব ব্যাপারের তিনি নিজে কিছুই জানতেন না। আমাদের নরেন গিয়ে বলতেই আশ্চর্য হয়ে বললেন, সে কি কথা। আপনার মামাকে জানাবেন তিনি যথারীতি মায়ের পূজো করুন, আমার বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই। এ-সমস্তই ওই দু ব্যাটা বজ্জাত বাপ-ব্যাটার কারসাজি! আমার ওপর ওদের জাতক্রোধ।
১ম ব্রাহ্মণ। মেয়েটি ত তা হলে ভাল?
২য় ব্রাহ্মণ। হুঁ ভাল! ম্লেচ্ছ, বিধর্মী, বলি খোঁজ রেখেছ কিছু?
পূর্ণ। হোক ম্লেচ্ছ। বাবা, তবুও রায়বংশের মেয়ে-হরি রায়ের নাতনী! শুনলুম ঐ বিলেস ছোঁড়াটা অনেক চেষ্টা করেছিল বন্ধ করতে, কিন্তু তিনি কোন কথায় কান দেননি। স্পষ্ট বলে দিলেন, হাজার অসুবিধে হলেও আমি পরের ধর্মকর্মে হাত দিতে পারব না। এ কি সহজ কথা!
১ম ব্রাহ্মণ। বল কি খুড়ো? প্রথম যেদিন জুতোমোজা পরে ফেটিং চড়ে ও দেশেতে এলো লোক ত ভয়ে মরে। গুজব রটে গেল এরই সঙ্গে হবে নাকি বিলাসবাবুর বিয়ে, তাই এসেছে দেশে। সবাই ভাবলে, একা রামে রক্ষে নেই সুগ্রীব দোসর-আর কাউকে বাঁচাতে হবে না, দেড়েল ব্যাটা এবার গ্রামসুদ্ধ সবাইকে ধরে ধরে ফাঁসি দেবে। কিন্তু তোমার ব্যাপারটা দেখলে যেন মনে ভরসা হয়। না খুড়ো?
