সরকার। যে আজ্ঞে।
[সরকার চলিয়া যাইতেছিল, বিজয়া ফিরিয়া ডাকিল]
বিজয়া। শুনুন সরকারমশাই! কাছারির ঐ নতুন দরোয়ান কতদিন বহাল হয়েছে?
সরকার। মাস-তিনেক হবে বোধ হয়।
বিজয়া। ওকে আর দরকার নেই। এক মাসের মাইনে বেশী দিয়ে আজই ওকে জবাব দেবেন। (একটু থামিয়া) না না, দোষের জন্য নয়, লোকটাকে আমার ভালো লাগে না—তাই।
রাস। বিনাদোষে কারো অন্ন মারাটা কি ভালো মা?
সরকার। তা হলে তাকে কি—
বিজয়া। আমার আদেশ ত শুনলেন সরকারমশাই | আজই বিদায় দেবেন।
রাস। (নিজেকে সামলাইয়া লইয়া) এবার কষ্ট করে একটু চল। পুরনো দলিলগুলো বেশ করে একবার পড়া চাই-ই।
বিজয়া। কেন?
রাস। বললাম কারণ আছে। তবুও বার বার এক কথা বলবার ত আমার সময় নেই বিজয়া!
বিজয়া। কারণ আছে বলেছেন, কিন্তু কারণ ত একটাও দেখান নি!
রাস। না দেখালে তুমি যাবে না? (একটু থামিয়া) তার মানে আমাকে তুমি বিশ্বাস করো না।
[বিজয়া নিরুত্তর]
রাস। (লাঠিটা মাটিতে ঠুকিয়া) কিসের জন্যে আমাকে তুমি এত বড় অপমান করতে সাহস করো? কিসের জন্যে আমাকে তুমি অবিশ্বাস করো শুনি?
বিজয়া। (শান্তস্বরে) আমাকেও ত আপনি বিশ্বাস করেন না আমারি টাকায় আমারি ওপর গোয়েন্দা নিযুক্ত করলে মনের ভাব কি হয় আপনি বুঝতে পারেন না? এবং তারপরে আমার সম্পত্তির মূল দলিলপত্র হস্তগত করার তাৎপর্য যদি আমি আর কিছু বলে সন্দেহ করি সে কি অস্বাভাবিক? না, সে আপনাকে অপমান করা?
[রাসবিহারী নির্বাক স্তম্ভিত হইয়া গেলেন। তাঁহার এত বড় পাকা চাল একটা বালিকার কাছে ধরা পড়িবে এ সংশয় তাঁহার পাকা মাথায় স্থান পায় নাই। এবং ইহাই সে অসঙ্কোচে মুখের উপর নালিশ করিবে সে ত স্বপ্নের অগোচর। কিছুক্ষণ বিমূঢ়ের মত স্তব্ধ থাকিয়া এই প্রকৃতির লোকেরা যাহা চরম অস্ত্র তাহাই তূণীর হইতে বাহির করিয়া প্রয়োগ করিলেন]
রাস। বনমালীর মুখ রাখবার জন্যেই এ কাজ করতে হয়েছে। বন্ধুর কর্তব্য বলেই করতে হয়েছে। একটা অজানা-অচেনা হতভাগাকে পথ থেকে শোবার ঘরে ডেকে এনে রাত-দুপুর পর্যন্ত হাসি-তামাশায় কাটালে এর অর্থ কি বুঝতে পারিনে? এতে তোমার লজ্জা হয় না বটে, কিন্তু আমাদের যে ঘরে-বাইরে মুখ পুড়ে গেল। সমাজে কারো সামনে মাথা তোলবার জো রইল না! (রাসবিহারী আড়চোখে চাহিয়া তাঁহার মহামন্ত্রের মহিমা নিরীক্ষণ করিলেন) বলি এগুলো ভালো না, নিবারণ করার চেষ্টা করা আমার কাজ নয়? (বিজয়া নিরুত্তর) (লাঠি ঠুকিয়া) না, চুপ করে থাকলে চলবে না, এ-সব গুরুতর ব্যাপার। তোমাকে জবাব দিতে হবে।
বিজয়া। ব্যাপার যত গুরুতর হোক, মিথ্যে কথার আমি কি উত্তর দিতে পারি!
রাস। মিথ্যে কথা বলে একে উড়োতে চাও নাকি?
বিজয়া। আমি উড়োতে কিছু চাইনে কাকাবাবু। শুধু এ যে মিথ্যে তাই আপনাকে বলতে চাই। এবং মিথ্যে বলে একে আপনি নিজেই সকলের চেয়ে বেশী জানেন তাও এই সঙ্গে আপনাকে জানাতে চাই।
রাস। মিথ্যে বলে আমি নিজেই জানি?
বিজয়া। হাঁ জানেন। কিন্তু আপনি গুরুজন,—এ নিয়ে তর্কবিতর্ক করতে আমার প্রবৃত্তি হয় না। দলিলপত্র দেখা এখন থাক, মামলা-মকদ্দমারা আবশ্যক বুঝলে আপনাকে ডেকে পাঠাব।
[বিজয়া চলিয়া গেল। রাসবিহারী অভিভূতের মত দাঁড়াইয়া রহিলেন]
বিজয়া – ৩.৪
চতুর্থ অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
বিজয়ার বাটী-সংলগ্ন উদ্যানের অপর প্রান্ত
[অদূরে সরস্বতী নদীর কিছু কিছু দেখা যাইতেছে, বিজয়া ও কানাই সিং। দয়াল প্রবেশ করিলেন]
দয়াল। তোমাকেই খুঁজে বেড়াচ্চি মা। শুনলাম এইদিকেই এসেছো, ভাবলাম বাড়ি যাবার আগে এদিকটা দেখে যাই যদি দেখা মেলে।
বিজয়া। কেন দয়ালবাবু।
দয়াল। আজ তৃতীয়া, পূর্ণিমা হলো সতেরোই। আর কটা দিন বাকী বলো ত মা?
বিবাহের সমস্ত উদ্যোগ-আয়োজন এই ক’দিনেই সম্পূর্ণ করে নিতে হবে। অথচ রাসবিহারীবাবু সমস্ত দায়িত্ব আমার উপর ফেলে নিশ্চিন্ত হয়েছেন।
বিজয়া। দায়িত্ব নিলেন কেন?
দয়াল। এ যে আনন্দের দায়িত্ব মা,—নেবো না?
বিজয়া। তবে অভিযোগ করচেন কেন?
দয়াল। অভিযোগ করিনি বিজয়া; কিন্তু মুখে বলচি বটে আনন্দের দায়িত্ব, তবু কেন জানিনে, কাজে উৎসাহ পাইনে, মন কেবলি এর থেকে দূরে সরে থাকতে চায়!
বিজয়া। কেন দয়ালবাবু?
দয়াল। তাও ঠিক বুঝিনে। জানি এ-বিবাহে তুমি সম্মতি দিয়েছ, নিজের হাতে নামসই করেছ,—আগামী পূর্ণিমায় বিবাহও হবে, তবু এর মধ্যে যেন রস পাইনে মা। সেদিন আমার অসম্মানে বিরক্ত হয়ে তুমি বিলাসবাবুকে যে তিরস্কার করলে সে সত্যই রূঢ়, সত্যই কঠোর; তবু, কেন জানিনে মনে হয়ে এর মধ্যে কেবল আমার অপমানই নেই, আরও কিছু গোপন আছে যা তোমাকে অহরহ বিঁধচে। (কিছুক্ষণ মৌন থাকিয়া) তোমার কাছে সর্বদা আসিনে বটে, কিন্তু চোখ আছে মা। তোমার মুখে আসন্ন-মিলনের স্বর্গীয় দীপ্তি কৈ,—কৈ সে সূর্যোদয়ের অরুণ আভা? তুমি জানো না মা, কিন্তু কতদিন নিরালায় তোমার ক্লান্ত বিষণ্ণ মুখখানি আমার চোখে পড়েছে। বুকের ভেতর কান্নার ঢেউ উথলে উঠেচে—
বিজয়া। না দয়ালবাবু, ও-সব কিছুই নয়।
দয়াল। আমার মনের ভুল, না মা?
বিজয়া। (ম্লান হাসিয়া) ভুল বৈ কি।
দয়াল। তাই হোক মা, আমার ভুলই যেন হয়। এ-সময়ে বাবার জন্যে বোধ করি মন কেমন করে—না বিজয়া? (বিজয়া নীরবে মাথা নাড়িয়া সায় দিল) (দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া) এমন দিনে তিনি যদি বেঁচে থাকতেন!
