বিলাস। (কটুকণ্ঠে) সে সম্মানবোধ আমার আছে, তোমাকে স্মরণ করিয়ে দিতে হবে না। কিন্তু দয়ালবাবু শুধু আচার্যই নন, ওঁর অন্য কাজও আছে। সে স্বীকার করেই উনি এসেছেন।
দয়াল। (ব্যস্তভাবে উঠিয়া দাঁড়াইয়া) মা, আমার অপরাধ হয়ে গেছে, আমি এক্ষুনি যাচ্ছি।
বিজয়া। না, আপনি বসুন, আপনাকে খেয়ে যেতে হবে। আর মাইনে ত উনি দেন না, দিই আমি। আমার সঙ্গে দু’দণ্ড গল্প করাটাকে আমি যদি অকাজ না মনে করি, তবে বুঝতে হবে আপনার কর্তব্যে ত্রুটি হয়নি। বিলাসবাবুর কর্তব্যের ধারণা যাই কেন না হোক।
বিলাস। না, কর্তব্যের ধারণা আমাদের এক নয়। এবং তোমাকে বলতে আমি বাধ্য যে তোমার ধারণা ভুল।
বিজয়া। তা হলে সেই ভুল ধারণাটাই আমার এখানে চলবে বিলাসবাবু।
বিলাস। তোমার ভুলটাকেই আমায় স্বীকার করে নিতে হবে নাকি?
বিজয়া। স্বীকার করে নিতে ত আমি বলিনি, আমি বলেচি সেইটেই এখানে চলবে।
বিলাস। তুমি জানো এতে আমার অসম্মান হয়।
বিজয়া। (অল্প হাসিয়া) সম্মানটা কি কেবল একলা আপনার দিকেই থাকবে নাকি?
দয়াল। (ব্যস্তভাবে উঠিয়া দাঁড়াইয়া) মা, এখন আমি যাই, দেখি গে তাঁদের কোন অসুবিধা হচ্ছে নাকি।
বিজয়া। না, সে হবে না। আমাদের গল্প এখনও শেষ হয়নি। আপনি বসুন।(একটু উচ্চকণ্ঠে) কালীপদ!
কালীপদ। (দ্বারের কাছে মুখ বাড়াইয়া সাড়া দিল) কি মা?
বিজয়া। পরেশের মাকে বলো গে দয়ালবাবু এখানে খাবেন। আমার শোবার ঘরের বারান্দায় তাঁর ঠাঁই করে দিতে বলে দাও। চলুন দয়ালবাবু, আমরা ওপরে গিয়ে বসি গে।
[বিজয়া ও তাহার পিছনে দয়ালবাবু সভয়-মন্থরপদে প্রস্থান করিলেন। বিলাস সেইদিকে
ক্ষণকাল আরক্তনেত্রে চাহিয়া বাহির হইয়া গেল]
বিজয়া – ২.৪
চতুর্থ দৃশ্য
বাটীর একাংশের ঢাকা বারান্দা
[নরেন প্রবেশ করিল। পরনে সাহেবী পোশাক, টুপি খুলিয়া সেটা বগলে চাপিয়া হাতের লাঠিটা একধারে ঠেস দিয়া রাখিল]
নরেন। (এদিকে-ওদিকে চাহিয়া) উঃ—কোথাও একফোঁটা হাওয়া নেই। আর এই বিজাতীয় পোশাকে যেন আরও ব্যাকুল করে তুলেছে। এদিকে কি কেউ নেই নাকি? এই যে কালীপদ—
[কালীপদ প্রবেশ করিল]
নরেন। কালীপদ, তোমার মা-ঠাকরুনকে একটা খবর দিতে পার?
কালীপদ। দিতে হবে না, মা নিজেই নেমে আসচেন। ভেতরে গিয়ে বসবেন না বাবু?
নরেন। না বাপু, ঘরে ঢুকে আর দম আটকাতে চাইনে,—এখান থেকেই কাজ সেরে পালাব। বারোটার ট্রেনেই ফিরতে হবে।
কালীপদ। হাঁ বাবু, আজ বড় গরম, কোথাও বাতাস নেই। তবে এখানেই একটা চেয়ার এনে দিই বসুন।
[কালীপদ চেয়ার আনিয়া দিল, নরেন বসিয়া টুপিটা
পায়ের কাছে রাখিয়া মুখ তুলিয়া কহিল]
নরেন। আর সুমুখের ঐ জানালাটা একবার খুলে দাও, নিশ্বেস ফেলে বাঁচি।
কালীপদ। ওটা খোলা যায় না। এখন মিস্ত্রী কোথায় পাব বাবু?
নরেন। মিস্ত্রী কি হে? দোর-জানালা কি তোমরা মিস্ত্রী দিয়ে খোলাও, আর রাত্তিরে পেরেক ঠুকে বন্ধ করো?
কালীপদ। আজ্ঞে না, কেবল এইটেই কিছুতে খোলা যায় না। মা ক’দিন ধরে মিস্ত্রী ডাকতে বলছিলেন।
নরেন। এমন কথাও ত শুনিনি। কৈ দেখি, (নিকটে গিয়া টানিয়া খুলিয়া ফেলিয়া) একটুখানি চেপে বসেছিল। তোমার মা-ঠাকরুনকে একবার ডাক।
কালীপদ। এই যে আসচেন।
[বিজয়া প্রবেশ করিতেই নরেন সঙ্গে সঙ্গে ফিরিয়া চাহিল]
নরেন। নমস্কার। বাঃ—কি চমৎকার দেখাচ্ছে আপনাকে। যে কেউ ছবি আঁকতে জানে—আপনাকে দেখে তারই আজ লোভ হবে।
বিজয়া। কালীপদ, আমাকে বসবার একটা জায়গা এনে দাও। আর বল গে বাবুর জন্যে চা করতে। এখনও চা খাওয়া হয়নি বোধ হয়?
নরেন। না, কলকাতা থেকে সকালেই বেরিয়ে পড়েছিলুম। স্টেশন থেকে সোজা আসচি।
[কালীপদ চলিয়া গেল
বিজয়া। আপনাকে কি আমার ছবি আঁকবার বায়না নিতে ডেকেছি যে আমাকে ও-রকম অপদস্থ করলেন?
নরেন। অপদস্থ করলুম কোথায়?
বিজয়া। চাকরদের সামনে কি ঐরকম বলে? কাণ্ডজ্ঞান কি একেবারে নেই?
নরেন। (লজ্জিতমুখে) হাঁ, তা বটে। দোষ হয়ে গেচে সত্যি।
বিজয়া। আর যেন কখনো না হয়।
[কালীপদ চেয়ার লইয়া প্রবেশ করিল]
কালীপদ। বলে এলুম মা। অমনি কিছু খাবার করতেও বলে আসব?
বিজয়া। হাঁ, বলগে। (জানালার প্রতি চোখ পড়ায়) এই যে তবু একটা কথা শুনেছিস কালীপদ। কাকে দিয়ে জানালাটা খোলালি?
কালীপদ। (ইঙ্গিতে দেখাইয়া) উনি খুলে দিলেন।
[এই বলিয়া সে বাহিরে গিয়া একটা ছোট টিপয় আনিয়া নরেনের পাশে রাখিয়া চলিয়া গেল]
বিজয়া। আপনি? কি করে খুললেন?
নরেন। হাত দিয়ে টেনে।
বিজয়া। শুধু হাতে টেনে খুলেছেন? অথচ ওরা সবাই বলে মিস্ত্রী ছাড়া খুলবে না। আপনার হাতটা কি লোহার নাকি?
নরেন। (সহাস্যে) হাঁ, আমার আঙুলগুলো একটু শক্ত।
বিজয়া। (হাসি চাপিয়া) আপনার মাথাটাই কি কম শক্ত? ঢুঁ মারলে যে-কোন লোকের মাথাটা ফেটে যায়।
নরেন। (উচ্চহাস্য করিয়া উঠিল, তারপরে পকেট হইতে নোট বাহির করিয়া টেবিলের উপর রাখিয়া দিয়া) এই নিন আপনার দুশো টাকা। দিন, আমার সেই ভাঙ্গা যন্ত্রটা। (একটু হাসিয়া) আমি জোচ্চোর, ঠক, আরও কত কি গালাগালি ওই ক’টা টাকার জন্যে আমাকে বলে পাঠিয়েছিলেন। নিন, আপনার টাকা,—দিন আমার জিনিস।
বিজয়া। ঠক, জোচ্চোর কাকে দিয়ে বলে পাঠিয়েছিলুম?
নরেন। যাকে দিয়ে টাকা পাঠিয়েছিলেন সেই ত ও-সব বলেছিল।
বিজয়া। তাকে দিয়ে আর কি বলে পাঠিয়েছিলুম মনে আছে?
নরেন। না, আমার মনে নেই। কিন্তু সেটা আনতে বলে দিন, আমি দুপুরের ট্রেনেই কলকাতা ফিরে যাব। ভালো কথা, আমি কলকাতাতেই একটা চাকরি পেয়ে গেছি। বেশী দূরে আর যেতে হয়নি।
