তিনি আরও কহিলেন যে, তাঁহার বিবেচনায় সেই ব্যক্তির মৃত্যু চব্বিশ ঘণ্টার ভিতর হইয়াছে বলিয়া অনুমান হয় না। তিনি তখন এই সকল বিষয় সম্বন্ধে তাঁহার ঠিক মত প্রকাশ করিতে পারিলেন না, ও কহিলেন যে, এখন তিনি যাহা, বলিতেছেন, তাহা কেবল অনুমানের উপর নির্ভর করিয়া বলিতেছেন মাত্র। যে পর্যন্ত সেই শব ছেদন করিয়া তিনি উত্তমরূপে পরীক্ষা করিয়া না দেখিতে পারিবেন, সেই পৰ্যন্ত তিনি তাঁহার ঠিক মত প্রকাশ করিতে সমর্থ হইবেন না।
ডাক্তার সাহেবের এই কথা শুনিয়া, সেই মৃতদেহ যে স্থানে ছেদন করিলে, পরীক্ষা হইতে পারে, সেই স্থানে উহা তৎক্ষণাৎ পাঠাইয়া দিবার নিমিত্ত ঊর্ধ্বতন কর্মচারী সাহেব আদেশ প্রদান করিলেন।
এই আদেশ সম্বন্ধে তাহার মতের সহিত আমাদিগের কাহারও মতের ঐক্য হইল না। তখন আমরা সকলে মিলিয়া তাঁহাকে কহিলাম, এই মৃতদেহ এখনই পাঠাইয়া দিবার সম্বন্ধে আপনি যে আদেশ প্রদান করিতেছেন, তাহা এখনই প্রতিপালন করা আমাদিগের কর্তব্য কৰ্ম্ম; কিন্তু এই মৃত দেহ যে কাহার, এ পর্যন্ত তাহার কিছুই, নির্ণয় হয় নাই। অতএব যে পর্যন্ত উহা স্থিরীকৃত না হইবে, সেই পর্যন্ত এই
হত্যার কোনরূপ উদ্ধার হইবে না, বা প্রকৃত অপরাধীও ধৃত হইবে না। এরূপ অবস্থায় আমাদিগের নিতান্ত ইচ্ছা যে, এই মৃতদেহ পরীক্ষার নিমিত্ত উহাকে কোন প্রকাশ্য স্থানে অনাবৃত ভাবে রাখিয়া দেওয়া কর্তব্য। কারণ, তাহা হইলে এই মৃতদেহ দেখিবার নিমিত্ত সেই স্থানে বিলক্ষণ জনতা হইবে, ও অনেক লোকে এই মৃতদেহ দেখিতে পাইবে। এইরূপ অবস্থায় যদি কেহ এই মৃতদেহ চিনিতে পারে, তাহা হইলে আমাদিগের অভিলাষ অনেকটা পূর্ণ হই বার সম্ভাবনা।
ঊর্ধ্বতন কর্মচারী সাহেব আমাদিগের মনের ভাব বুঝিতে পারিলেন, এবং ডাক্তার সাহেবের সহিত পরামর্শ করিয়া কহিলেন, আচ্ছা তাহাই ঠিক; কিন্তু দিবা বারটার পর এই মৃতদেহ যেন আর রাখা না হয়। কারণ, তাহা হইলে উহা একবারে পচিয়া যাইবে। মৃতদেহ পচিয়া গেলে ডাক্তার সাহেব তাহা উত্তমরূপে পরীক্ষা করিতে সমর্থ হইবেন না।
তিনি আরও কহিলেন, আমি এখনই প্রত্যেক থানায় সংবাদ প্রদান করিতেছি। সেই সকল থানার এলাকায় প্রত্যেক পল্লীতে যে সকল লোক বাস করে, তাহাদিগের মধ্যে কোন না কোন লোককে আনিয়া যেন এই মৃতদেহ দেখান হয়। তাহা হইলে সেই সকল লোকের মধ্য হইতে কোন না কোন লোক এই মৃতদেহ চিনিলেও চিনিতে পারিবে।
এই বলিয়া ঊর্ধ্বতন কর্মচারী সাহেব, ডাক্তার সাহেব এবং করোণার সাহেবের সহিত সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিলেন।
তাঁহারা চলিয়া যাইবার পর আমরা সেই মৃতদেহটা চটের ভিতর হইতে বাহির করিয়া একটী প্রকাশ্য স্থানে অনাবৃত অবস্থায় রাখিয়া দিলাম। সেই মৃতদেহ দেখিবার নিমিত্ত সেই স্থান লোকে লোকারণ্য হইয়া পড়িল। কয়েকজন উচ্চ ও নিম্নপদস্থ বুদ্ধিমান্ কর্মচারীকে পুলিশের পোক না পরাইয়া সেই ভিড়ের মধ্যে রাখিয়া দেওয়া হইল। সেই মৃতদেহ দেখিয়া কোন্ ব্যক্তি কি বলে, কেহ উহাকে চিনিতে পারিলে আপনাদিগের মধ্যে কি কথা বলাবলি করে, তাহা জানিয়া লইবার ভার তাহাদিগের উপরই অর্পিত হইল।
এদিকে উর্ধতন কর্মচারী মহাশয়ের আদেশ প্রচারিত হইবামাত্র প্রত্যেক থানার এলাকা হইতে রাশি রাশি লোক আসিয়া সেই স্থানে সমবেত হইয়া সেই মৃতদেহ দেখিতে লাগিল। কিন্তু তাহা যে কাহার দেহ, তাহা কেহ চিনিতে পারিল না, বা চিনিয়াও কেহ বলিল না। এইরূপে প্রায় দিবা এগারটা বাজিয়া গেল।
ঊর্ধ্বতন কর্মচারী সাহেব সেই স্থান হইতে প্রস্থান করি বার পর, যে চটে সেই মৃতদেহ মোড়া ছিল, সেই চটটা আমরা উত্তমরূপে দেখিলাম। দেখিলাম, তাহাতে এরূপ কোন কথা লেখা নাই, বা এরূপ কোন চিহু নাই যে, যাহার দ্বারা, সেই চট যে কোথা হইতে আনীত হইয়াছে, বা তাহা কাহার, তাহার কিছুমাত্র সন্ধান পাওয়া যাইতে পারে।
যে টিনের বাক্সের ভিতর সেই মৃতদেহ পাওয়া গিয়াছিল, সেই টিনের বাক্সটীর মধ্যে উত্তমরূপে দেখাতে, দেখিতে পাইলাম, তাহার ভিতর একটা পুরাতন ও নিতান্ত ক্ষুদ্র শিশি রহিয়াছে। সেই শিশিটা নিজের হাতে করিয়া উত্তমরূপে পরীক্ষা করিয়া দেখিলাম। দেখিলাম, প্রায় পাঁচ ছয় বৎসর পূৰ্বে সেই শিশিতে করিয়া ব্যাথগেট কোম্পানির ঔষধালয় হইতে একজন সাহেবের নিমিত্ত ঔষধ আসিয়াছিল। এরূপ শিশি প্রায় সকল গৃহেই পাওয়া যায়। বিশেষতঃ সাহেব দিগের গৃহের শিশি, বোতল প্রভৃতি তাহাদিগের খানসামা। বাবুর্চিরা প্রায়ই বিক্ৰীওয়ালাদিগের হস্তে বিক্রয় করিয়া ফেলে। বিক্ৰীওয়ালারা সেই সকল শিশি-বোতল আনিয়া শিশি-বোতল-ব্যবসায়ী দোকানদারের হস্তে বিক্রয় করে।, তাহাদিগের দোকান হইতে যাহাদিগের প্রয়োজন হয়, তাঁহারা ক্রয় করিয়া লইয়া যায়। এরূপ অবস্থায় সেই ঔষধের শিশি উপলক্ষ করিয়া অনুসন্ধান করিলে যে কোন রূপ সবিশেষ ফল লাভের সম্ভাবনা, তাহা বিবেচনা করি লাম না। যে স্থানের শিশি সেই স্থানে রাখিয়া দিয়া, অন্য কোন উপায় চিন্তা করিতে লাগিলাম। কিন্তু ভাবিয়া চিন্তিয়া কোন উপায়ই স্থির করিয়া উঠিতে পারিলাম না।
এদিকে নানা স্থান হইতে নানা লোক আসিয়া সেই মৃতদেহ দর্শন করিতে লাগিল। কেহ বা তাহার অবস্থা দেখিয়া দুঃখ প্রকাশ, কেহ বা হত্যাকারীর উদ্দেশে গালি প্রদান, প্রভৃতি যাহার মনে যাহা আসিতে লাগিল, সে তাহাই বলিতে বলিতে সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিতে লাগিল। তাহাদিগের কথার ভাবে স্পষ্টই অনুমান হইতে লাগিল যে, সেই মৃতদেহ তাহাদিগের মধ্যে কেহই চিনিয়া উঠিতে পারে নাই।
