যাহা হউক, পরিশেষে পরম কারুণিক ভগবানের নিকট প্রার্থনা করি, যেন তাহার অনুকম্পায় পূৰ্ব্ব পূৰ্ব্ব বৎসরের ন্যায় এ বৎসরেও গ্রাহক সংখ্যা বৃদ্ধি হইয়া, দারোগার দপ্তর আরও উন্নতি পথে অগ্রসর হয়, এবং ইহার জীবনের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপিত হয়। ইতি—
শ্ৰীবাণীনাথ নন্দী,
প্রকাশক।
সিকদারবাগান-বান্ধব-পুস্তকালয় ও সাধারণ-পাঠাগার।
বেওয়ারিশ লাস
প্রথম পরিচ্ছেদ।
একদিবস প্রাতঃকালে থানার সম্মুখে বেড়াইতেছি, এরূপ সময়ে একটা লোকের মুখে শুনিতে পাইলাম যে, রাস্তার ধারে পুলিন্দার ভিতর একটা মৃতদেহ পাওয়া গিয়াছে। যাহার, নিকট হইতে আমি উহা শুনিতে পাইলাম, তাহাকে ডাকিয়া দুই একটা কথা জিজ্ঞাসাও করিলাম; কিন্তু তাহার নিকট হইতে কোনরূপ সন্তোষজনক উত্তর প্রাপ্ত হইলাম না। আমি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, আপনি মৃতদেহ কি নিজ চক্ষে দেখিয়া আসিয়াছেন?
পথিক। না।
আমি। তবে আপনি কিরূপে জানিতে পারিলেন যে, রাস্তার ধারে পুলিন্দার ভিতর একটী লাস পাওয়া গিয়াছে?
পথিক। আমি শুনিয়াছি।
আমি। কাহার নিকট হইতে আপনি শুনিয়াছেন?
পথিক। তাহার নাম ধাম জানি না। রাস্তা দিয়া একটা লোক অপর আর একজনকে বলিতে বলিতে যাইতেছিল, তাই আমি শুনিয়াছি।
আমি। কোন্ স্থানে এবং কোন্ রাস্তায় লাস পাওয়া। গিয়াছে, তাহার কিছু শুনিয়াছেন?
পথিক। না, তাহা শুনি নাই।
আমি। কবে পাওয়া গিয়াছে, তাহা কিছু শুনিয়াছেন?
পথিক। আজ পাওয়া গিয়াছে।
পথিকের এই কথা শুনিয়া একবার মনে হইল, হয় ত প্রকৃতই কোন স্থানে রাস্তার কিনারায় পুলিন্দার ভিতর একটা লাস পাওয়া গিয়া থাকিবে। ইহা যদি প্রকৃত হয়, তাহা হইলে ইহার সত্যাসত্য জানিতে অধিক বিলম্ব হইবে না, কোন না কোনরূপে এখনই তাহার সংবাদ আসিয়া উপস্থিত হইবে। আবার মনে হইল, কলিকাতা সহরে মধ্যে মধ্যে যেমন এক একটা মিথ্যা সংবাদ প্রচারিত হইয়া পড়ে, ইহাও হয় ত সেই প্রকারের কথা।
মনে মনে এইরূপ ভাবিয়া সেই পথিককে কহিলাম, যান মহাশয়। আপনি এখন প্রস্থান করুন; কিন্তু সবিশেষ রূপ না জানিয়া এরূপ কোন কথা জনসাধারণের মধ্যে কখন প্রকাশ করিবেন না। কারণ, আপনি সবিশেষরূপে নিশ্চয়ই অবগত আছেন যে, কলিকাতা সহরের মধ্যে মত প্রকার গুজব উঠে, তাহার এক তৃতীয়াংশও সত্য হয় না।
আমার কথা শুনিয়া পথিক সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিলেন, আমিও সেই স্থানে বেড়াইতে লাগিলাম।
ইহার দশ মিনিট পরেই সংবাদ আসিল, চটমোড়া একটা লাস একটা বাক্সের ভিতর বেওয়ারিশ অবস্থায় যোড়াবাগান থানায় পাওয়া গিয়াছে। এই সংবাদ পাইয়া, পূর্বের সংবাদকে আর মিথ্যা গুজব বলিতে পারিলাম না। আমাদিগের যেরূপ নিয়ম আছে, সেইরূপ ভাবে যোড়াবাগানের থানায় গিয়া উপস্থিত হইলাম। তথায় বুঝিলাম যে, যে সংবাদ প্রাপ্ত হইয়া ছিলাম, তাহার একবর্ণও মিথ্যা নহে।
আমি থানায় গিয়া দেখিলাম, সেই লাসের পুলিন্দা সম্পূর্ণ রূপে খোলা হয় নাই। আমি সেই স্থানে গমন করিবামাত্রই যে খোলা হইল, তাহাও নহে। আমি সেই স্থানে উপস্থিত হইলে পর, ক্ৰমে ঊর্ধ্বতন কৰ্ম্মচারীগণ আসিয়া সেই স্থানে একত্র হইলেন। তাঁহারা আসিলেও বাক্সের ভিতর হইতে সেই লাস বাহির করা হইল না। ডাক্তার সাহেবকে সংবাদ প্রেরণ করা হইল, এবং করোনার সাহেবের নিকট একখানি পত্র সহ একজন কর্মচারী প্রেরিত হইল। ক্রমে ডাক্তার সাহেব আসিয়া উপস্থিত হইলেন, ও কয়েকজন জুরি সমভি ব্যাহারে করোনার সাহেবও আগমন করিলেন।
এইরূপে সকলে সেই স্থানে সমবেত হইলে, যে বাক্সের ভিতর সেই মৃতদেহ রক্ষিত হইয়াছিল, তাহা সকলের সম্মুখে আনীত হইল। উহ ডবল টিনের একটা বেশ মজবুত বাক্স; কিন্তু নুতন নহে, পুরাতন। দেখিলে বোধ হয়, বহুদিবস হইতে সেই বাক্সটী অব্যবহাৰ্য্যরূপে কোন স্থানে রক্ষিত ছিল।
শুনিলাম, যে সময় বাক্সটী থানায় আনিয়া জমা দেওয়া হয়, সেই সময় উহাতে চাবি বন্ধ ছিল, এবং খুব মজবুত। দড়িতে উহা বাঁধা ছিল। আমরা সেই স্থানে উপস্থিত হইবার পূৰ্বেই, যে দড়ি দিয়া বাক্সটা বাঁধা ছিল, তাহা সম্পূর্ণরূপে খুলিয়া, বাক্সটীর চাবি ভাঙ্গিয়া ফেলা হইয়াছিল।
কিরূপে বাক্সটী থানায় আসিয়া উপস্থিত হইল, কিরূপ সন্দেহের উপর নির্ভর করিয়া উহার দড়ি খুলিয়া ফেলা হইল, ও বাক্সের চাবি ভাঙ্গিয়া ফেলা হইল, প্রথমে তাহাই জানিবার প্রয়োজন বিবেচনা করিয়া একজন ঊর্ধ্বতন কর্মচারী জিজ্ঞাসা করিলেন, কোন কর্মচারীর সম্মুখে এই বাক্সটী প্রথম থানার ভিতর আনীত হয়?
থানার দারোগা নিতান্ত ভীত অন্তঃকরণে উত্তর প্রদান করিলেন, আমারই সম্মুখে প্রথমে এই বাক্স থানার ভিতর আনয়ন করে।
ঊর্ধ্বতন কর্মচারী। কে এই বাক্স থানায় আনিয়া জমা দেয়?
দারোগা। পোর্ট কমিশনরের একজন চাপরাশি দুইজন কুলির সাহায্যে এই বাক্সটী থানার ভিতর আনয়ন করে।
ঊর্ধ্বতন কর্মচারী। পোর্টকমিশনরের সেই চাপরাশিকে তুমি চিন?
দারোগা। তাহাকে চিনি বৈ কি।
ঊর্ধ্বতন কর্মচারী। সে এখন কোথায়?
দারোগা। তাহাকে আমি থানাতেই রাখিয়াছি, এই সে উপস্থিত আছে।
ঊর্ধ্বতন কর্মচারী। উহার সঙ্গে যে দুইজন কুলি ছিল?
দারোগা। তাঁহারাও এখানে উপস্থিত আছে। উঃ কঃ। (চাপরাশির প্রতি) এ বাক্স তুমি কোথায় পাইলে?
