একাদশ দিবসের দিন পুনরায় সেই স্থানে গমন করিলাম। পূর্বে যেরূপ ভাবে মাণিকচাঁদ এবং তাহার দ্বারবানকে দেখিতে পাইয়াছিলাম, আজ উভয়কেই সেইরূপ ভাবে দেখিলাম। দেখি লাম, দ্বারবান্ সেই ঘরের দরজায় বসিয়া আছে, আর মাণিকচাঁদ ঘরের ভিতর বসিয়া লেখাপড়ায় নিযুক্ত আছেন।
আমি ঘরের ভিতর প্রবেশ করিবামাত্রই মাণিকচাঁদ পূর্বের ন্যায় আমাকে বসিবার স্থান প্রদান করিলেন। আমি সেই স্থানে উপ বেশন করিলে, তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, কেমন মহাশয়! আপনার উপর আমি যে কাৰ্যের ভার অর্পণ করিয়াছিলাম, তাহা শেষ করিতে পারিয়াছেন কি?
উত্তরে আমি কহিলাম, সে কাৰ্য্য আমার অনেকদিবস শেষ হইয়া গিয়াছে। আমি তাহার একটা সম্পূর্ণ তালিকাও প্রস্তুত করিয়া আনিয়াছি। এই বলিয়া আমি যে তালিকাখানি প্রস্তুত করিয়া আনিয়াছিলাম, তাহা তাহার হস্তে প্রদান করিলাম। তিনি উহা আপন হস্তে গ্রহণ করিয়া একবার আদ্যোপান্ত উত্তমরূপে দেখিলেন ও পরিশেষে কহিলেন, আমার বোধ হইতেছে, আপনি যে তালিকা প্রস্তুত করিয়াছেন, তাহাতেই আপাততঃ আমাদিগের কাৰ্য্য চলিতে পারিবে। অছ এই তালিকাখানি আমার নিকট থাকুক, সময়মত আমি উহা একবার আদ্যোপান্ত দৈখিয়া রাখিব। আপনি কল্য পুনরায় আগমন করিবেন, সেই সময় উভয়ে পরামর্শ করিয়া, যে যে স্থানে শাখা-কাৰ্যালয় স্থাপন করা বিবেচনা-সিদ্ধ হয়, সেই সেই স্থানে কাৰ্যালয় স্থাপন করিবার বন্দোবস্ত করা যাইবে। এই বলিয়া, সেই তালিকাখানি মাণিক্তচাদ আপনার নিকট রাখিয়া দিলেন। আমিও আপন স্থানে প্রত্যাবর্তন করিলাম।
পরদিবস পুনরায় রাজার কাটায় গমন করিয়া দেখিলাম, মাণিকটা পূর্বের ন্যায় আপন আফিসে বসিয়া কৰ্ম্ম-কাৰ্য্য করিতেছেন। আমাকে দেখিয়া তিনি নিতান্ত দুঃখভাব প্রকাশ করিয়া কহিলেন, আমি বড়ই দুঃখের সহিত আপনাকে বলিতেছি যে, আপনি এত পরিশ্রম ও এত সময় নষ্ট করিয়া যে তালিকাখানি প্রস্তুত করিয়াছেন, এবং যাহা গত কল্য আমার নিকট রাখিয়া গিয়াছিলেন, তাহা যে আমি কোথায় ফেলিয়াছি, আমি তাহার কিছুই সন্ধান করিয়া উঠিতে পারিতেছি না। আমার বোধ হই তেছে, আপনাকে পুনরায় সেইরূপ আর একখানি তালিকা প্রস্তুত করিতে হইবে।
মাণিকদের কথা শুনিয়া আমি কহিলাম, তালিকাখানি দৈবাৎ হারাইয়া গিয়াছে বলিয়া আপনাকে সবিশেষ চিন্তিত হইতে হইবে না। আমি যে তালিকাখানি আপনাকে প্রদান করিয়া ছিলাম, তাহার একখানি নকল আমার নিকট আছে; যদি অনু মতি করেন, তাহা হইলে এখনই আনিয়া আমি উহা আপনাকে প্রদান করিতে পারি।
আমার কথার উত্তরে মাণিকচাঁদ কহিলেন, আপনি যে সেই তালিকার একটী নকল রাখিয়াছেন, ইহা শুনিয়া আমি সবিশেষ রূপে সন্তুষ্ট হইলাম। আপনাকে পরিশ্রম করিয়া উহা এখনই আনি বার কিছুমাত্র প্রয়োজন নাই, কল্য আপনি উহা লইয়া আমার নিকট এই সময় আসিবেন। এই বলিয়া মাণিকচাঁদ, সেই দিবসও আমাকে সেই স্থান হইতে বিদায় করিলেন।
আমার নিকটে যে তালিকাখানি ছিল, তাহার একটী নকল প্রস্তুত করিয়া মাণিকচাঁদের আদেশ-অনুযায়ী সেই তালিকাখানি সঙ্গে লইয়া পরদিবস পুনরায় তাহার নিকট গিয়া উপস্থিত হই লাম। সেই দিবস তিনি আমার সহিত উত্তমরূপে কোন কথা কহিলেন না, কেবলমাত্র আমার নিকট হইতে তালিকাখানি গ্রহণ করিলেন, এবং এইমাত্র কহিলেন, অন্ত আমার শরীর একটু
অসুস্থ বোধ হইতেছে। তালিকাখানি এখন আমার নিকট থাকিল, আমি সময়মত উহা দেখিয়া রাখিব। আপনি চারিদিবস পরে পুনরায় আসিবেন, সেই দিবস সমস্ত কাৰ্য্যের বন্দোবস্ত ঠিক করিয়া দিব।
আমি তাহারই আদেশ-অনুযায়ী চারিদিবস পরে, অর্থাৎ গত কল্য তাহার নিকট পুনরায় গমন করিয়াছিলাম। কল্যও তিনি আমাকে এই বলিয়া বিদায় করিয়া দিয়াছেন, আমি সেই তালিকাখানি এখন পর্যন্তও উত্তমরূপে দেখিয়া উঠিতে পারি নাই। আপনি পরশ তারিখে পুনরায় আগমন করিবেন, সেই দিবস উল্লিখিত কাৰ্য্যের সমস্ত বন্দোবস্ত ঠিক করিয়া ফেলিব।
মহাশয়! আমি আমার এই চাকরীর অবস্থা কিছুই বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছি না। আমি প্রতিদিন মাণিকচাঁদ কর্তৃক কার্যে নিযুক্ত হইতেছি, বা কোনরূপ জুয়াচোরের হস্তে পতিত হইয়া কোনরূপ বিপদগ্রস্ত হইবার পথ প্রসারিত করিতেছি; তাহার কিছুই আমি বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছি না। এই নিমিত্ত মামি আপনার পরামর্শ লইবার মানসে আপনার নিকট আসিয়া উপস্থিত হইয়াছি, এবং এ পর্যন্ত যেরূপ অবস্থা ঘটিয়াছে, তাহা যতদূর সম্ভব আমি মনে করিতে পারিয়াছি, তাহা আপনার নিকট আমি বিবৃত করিলাম। এখন মাণিকচাঁদের আদেশ আমাকে প্রতিপালন করিতে হইবে, অর্থাৎ আগামী কল্য পুনরায় আমাকে সেই স্থানে যাইতে হইবে। এরূপ অবস্থায় আপনি আমাকে যেরূপ উপদেশ প্রদান করিবেন, সেই উপদেশই আমি শিরোধার্য করিয়া, আপনার আদেশমত কাৰ্য্য করিতে প্রবৃত্ত হইব।
.
চতুর্থ পরিচ্ছেদ।
বালমুকুনের কথাগুলি আমি সবিশেষ মনোযোগের সহিত শ্রবণ করিলাম। তাহার কথাগুলি শেষ হইয়া গেলে, আমি সমস্ত অবস্থাগুলি একবার উত্তমরূপে ভাবিয়া দেখিলাম; কিন্তু ভাবিয়া চিত্তিয়া কিছুই স্থির করিয়া উঠিতে পারিলাম না। একবার ভাবিলাম, যে ব্যক্তি অগ্রিম বেতন একশত টাকা প্রদান করিয়াছে, অথচ বালমুকুনের নিকট হইতে একটামাত্র পয়সাও গ্রহণ করে নাই, সে যে উহার সহিত জুয়াচুরি করিতেছে, একথা কিরূপেই বা বিশ্বাস করিতে পারি? অথচ যে ব্যক্তি নিজ হইতে অগ্রিম বেতন দিয়া বালমুকুনকে তাহার কার্যে নিযুক্ত করিয়াছেন, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাহাকে কোন কার্যে নিযুক্ত না করিয়া সামান্য সামান্য কাৰ্য্যের ভান করিয়া কেবলমাত্র সময় অতিবাহিত করি তেছেন, তাঁহার মনে একবারেই যে কোনরূপ দুরভিসন্ধি নাই, তাহাও সহজে বিশ্বাস করিতে ইচ্ছা করে না। অথচ ইহার ভিতর একটী নূতন কথাও শুনিতেছি। এ পর্যন্ত আমি কখন শুনি নাই যে, সরকারী বা ব্যবসাদারী কোন আফিসে কি কোন ফারুমে প্রত্যেকমাসে অগ্রিম বেতন দেওয়ার নিয়ম আছে। এরূপ অগ্রিম বেতন প্রদান করার অর্থই বা কি, তাহাও বুঝিয়া উঠা নিতান্ত সহজ নহে। যে ব্যক্তি মাণিকচাঁদ নামে আত্ম-পরিচয় প্রদান করিতেছে, সে লোকটাই বা কে, তাহা একবার দেখিলে কোন ক্ষতি নাই। তাহাকে স্বচক্ষে দেখিলে ও তাহার সহিত দুই চারিটী কথা কহিলেও, সে যে কি চরিত্রের লোক, অথবা ইহার মধ্যে তাহার কোন দুরভিসন্ধি আছে কি না, তাহাও বোধ হয়, অনেকটা অনুমান করিয়া লওয়া যাইতে পারিবে।
