যে দিবস আমি কলিকাতা পরিত্যাগ করিয়া বোম্বাইয়ে গমন করিবার মনস্থ করিয়াছিলাম, তাহার তিন চারিদিবস পূৰ্বে একটী লোক আসিয়া হঠাৎ আমার নিকট উপস্থিত হইলেন। তিনি যে কি করিয়া আমার বাসা চিনিলেন, তাহা আমি বলিতে পারিলাম, বা বুঝিতেও পারিলাম না। ইতিপূর্বে আর কখনও যে আমি তাঁহাকে দেখিয়াছি, তাহাও আমার বোধ হইল না। তিনি হঠাৎ আমার নিকট উপস্থিত হইয়াই কহিলেন, মহাশয়ের নামই কি বালমুকুন্?
আমি। হ মহাশয়! আমারই নাম বালমুকুন্। আগন্তুক। আপনি যে ফারমে কাৰ্য্য করিতেন, সেই ফারম এখন উঠিয়া গিয়াছে?
আমি। ধনী ইচ্ছা করিয়া তাহার দেনা-পাওনা মিটাইয়া দিয়া তাহার কারবার উঠাইয়া দিয়াছেন।
আগন্তুক। তাহা হইলে বোধ হয়, আপনি এখন বেকার বসিয়া আছেন?
আমি। বেকার বসিয়াছিলাম বটে; কিন্তু এখন বেকার বসিয়া আছি, তাহা আর বলিতে পারি না।
আগন্তুক। আপনার একথার অর্থ আমি বেশ বুঝিয়া উঠিতে পারিলাম না।
আমি। চাকরী যাওয়ার পর, আমি কিছুদিবস বসিয়াছিলাম বটে; কিন্তু সম্প্রতি একটী চাকরীর যোগাড় হইয়াছে। এই নিমিত্তই আমি বলিতেছি, এখন আর আমি বেকার অবস্থায় বসিয়া নাই। কেন মহাশয়! আপনি আমাকে এ সকল কথা জিজ্ঞাসা করিতেছেন?
আগন্তুক। জিজ্ঞাসা করিবার সবিশেষ কারণ আছে বলিয়াই, জিজ্ঞাসা করিতেছি। আপনাকে একটা চাকরীতে নিযুক্ত করি বার মানসেই আমি আপনার নিকট আগমন করিয়াছিলাম।
আমি। আমাকে একটী চাকরী প্রদান করিবার মানসেই আপনি আমার নিকট আগমন করিয়াছেন, একথার অর্থ আমি সবিশেষরূপে বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছি না।
আগন্তুক। ইহার অর্থ এমন সবিশেষ কিছু নহে যে, আপনি বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছেন না। আমি যে মহাজনের অধীনে কৰ্ম্ম করি, তিনি একজন প্রসিদ্ধ ধনী। তিনি জাতিতে মাড়োয়ারী ব্রাহ্মণ; কিন্তু কেবল বঙ্গদেশ ব্যতীত এমন কোন স্থান নাই যে, সেই সকল স্থানে তাহার ফারম বা কারবার নাই। মাদ্রাজ হইতে হিমালয়, বোম্বাই, এবং গুজরাট হইতে বেনারস প্রভৃতি স্থানের মধ্যে যে যে স্থানে প্রধান প্রধান নগর আছে, সেই সেই স্থানেই তাঁহার একটী একটী শাখা ফারম আছে। আমার বোধ হয়, বঙ্গদেশ ব্যতীত এক ভারতবর্ষের মধ্যে অল্প-বিস্তর তিনশত স্থানে তাহার কারবার হইয়া থাকে। এখন তাঁহার নিতান্ত ইচ্ছা যে, তিনি বঙ্গদেশের মধ্যেও আপনার কারবার বিস্তৃত ভাবে স্থাপন করেন, এই নিমিত্তই আমি কলিকাতায় আসিয়াছি। কলিকাতার মধ্যে একটী প্রধান ফারম স্থাপন করিয়া, ক্রমে বঙ্গদেশের প্রধান প্রধান সমস্ত নগরীতে তাহার এক একটী শাখা ফারম স্থাপন করিয়া আমি আমার স্থানে অর্থাৎ মান্দ্রাজ সহরে গমন করিব। কলিকাতার ফারমের অধীনে অনেকগুলি শাখা ফারম থাকিবে; সুতরাং কলিকাতার নিমিত্ত একজন অতি উপযুক্ত লোকের প্রয়োজন। আমি আমার একজন বন্ধুর পত্রে অবগত হইতে পারিয়াছি যে, যেরূপ কাৰ্য্যের নিমিত্ত আমি উপযুক্ত লোকের অনুসন্ধান করিতেছি, আপনি সেই কাৰ্য্যের ঠিক উপযুক্ত লোক।
তাহার এই কথা শুনিয়া আমি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, আমার সম্বন্ধে আপনাকে কে বলিয়াছে, তাহা আমি জানিতে পারি কি?
উত্তরে তিনি আমাদিগের দেশস্থ এক ব্যক্তির নাম করিলেন। দেখিলাম, তাঁহার সহিত আমার সবিশেষরূপ আলাপ-পরিচয় না থাকিলেও, তিনি যে একবারে আমার নিকট অপরিচিত, তাহা নহে। সুতরাং আমি মনে ভাবিয়াছিলাম, তাহা হইলে হয় ত প্রকৃতই তিনি আমার কথা বলিয়া থাকিবেন।
তাহার পর তিনি কহিলেন, মহাশয়! এখন আমি আপনার নিকট কি নিমিত্ত আগমন করিয়াছি, তাহা এখন বোধ হয়, বেশ বুঝিতে পারিলেন?
আমি। তাহা ত বুঝিয়াছি, কিন্তু আপনি যে প্রকার কার্যের কথা আমাকে কহিলেন, সেই সকল কাৰ্য্য আমার দ্বারা কোন প্রকারেই সম্পন্ন হওয়া সম্ভবপর নহে। সমস্ত বঙ্গদেশের প্রধান প্রধান নগরীতে এক একটী কাৰ্য্যস্থান স্থাপন করিয়া, সেই সকল কার্যের উত্তমরূপে তত্ত্বাবধান করিতে হইলে, আমাদিগের সদৃশ বুদ্ধিজীবি লোকের দ্বারা সে কাৰ্য্য হইবার সম্ভাবনা নিতান্ত অল্প। আপনি যদি আমার পরামর্শ শ্রবণ করেন, তাহা হইলে আমা-অপেক্ষা অধিক বুদ্ধিমান ও কার্যক্ষম অপর কোন ব্যক্তির অনুসন্ধান করুন।
আগন্তুক। সে অনুসন্ধান করিবার আমার আর কিছুমাত্র প্রয়োজন নাই। যদি আমার বিশ্বাস না হইত, বা অপরের নিকট হইতে আমি উত্তমরূপে অবগত হইতে না পারিতাম যে, আপনার দ্বারা আমাদিগের প্রস্তাবিত কাৰ্য্য সকল সম্পন্ন হইবার সম্ভাবনা নাই, তাহা হইলে বোধ হয়, আমি কখনই আপনার নিকট আসিয়া উপস্থিত হইতাম না। সেই কাৰ্য্য আপনার দ্বারা নির্বাহ হইবে না, একথা আপনি ত বলিবেনই। কারণ, যে ব্যক্তির কোন কাৰ্যে উত্তমরূপে পারদর্শিতা থাকে, তিনি কখনই আপনার গুণ আপন মুখে স্বীকার করেন না; অধিকাংশ সময়ে বরং তিনি তাহার বিপরীতই বলিয়া থাকেন। সে যাহা হউক, সেই কাৰ্য্য আপনার দ্বারা সুচারুরূপে নিৰ্বাহ হইতে পারুক আর না পারুক, তাহা আমরা বুঝিতে পারিব। আপনি কোন সময় হইতে আমাদিগের কাৰ্যে নিযুক্ত হইবেন, তাহা এখন আমাকে স্পষ্ট করিয়া বলিয়া দিন।
আমি। আমি যদি আপনাদিগের কার্য সম্পন্ন করিয়া উঠিতে পারি, তাহা হইলেও কি আপনি সেই কাৰ্য্যে আমাকে নিযুক্ত করিতে চাহেন?
