আমি। তোমরা যে কামরার ভিতর ছিলে, তাহার ভিতর অপর আর কোন লোক ছিল?
২য় পরিচারিকা। আমরা দুইজন পরিচারিকা ও আমাদিগের কর্তৃঠাকুরাণী ভিন্ন অপর আর কেহই সেই কামরার ভিতর ছিল না।
আমি। যে সময় তোমরা জাহাজ হইতে অবতরণ কর, সেই সময় তোমাদিগের সেই কামরার সম্মুখে আর কোন ব্যক্তি বসিয়াছিল?
২য় পরিচারিকা। না, অপর কোন ব্যক্তিকে সেই স্থানে বসিতে দেখি নাই। তবে দুই একজন লোক সেই স্থান দিয়া যাতায়াত করিতেছিল, তাহা আমি দেখিয়াছি।
আমি। সেই লোক কে? ২য় পরিচারিকা। তাহা আমি জানি না।
আমি। উঁহারা জাহাজের খালাসি প্রভৃতি, কি আবোহী? ২য় পরিচারিকা। দুই একজন খালাসিকেও দেখিয়াছি, এবং অপর আরোহীগণের মধ্যেও দুই একজন সেই স্থান দিয়া যাতায়াত করিয়াছে।
আমি। তুমি তাহাদিগকে দেখিলে চিনিতে পারিবে? ২য় পরিচারিকা। না।
আমি। কেন?
২য় পরিচারিকা। তাহাদিগকে কেবল একবার দেখিয়াছি মাত্র, তাহাও সবিশেষ লক্ষ্য করিয়া দেখি নাই।
আমি। যে কামরায় তোমরা ছিলে, তাহার পার্শ্ববর্তী কামরায় আর কোন আরোহী ছিল কি?
২য় পরিচারিকা। ছিল, আমাদিগের কামরার ঠিক পার্শ্বের কামরায় কয়েকটী স্ত্রীলোক ছিল দেখিয়াছি।
আমি। সেই স্ত্রীলোকদিগকে দেখিয়া কি মনে হয়? উঁহারা কি কোন গৃহস্থের পরিবার?
২য় পরিচারিকা। উঁহাদিগকে দেখিয়া কোন ভদ্র-বংশীয় স্ত্রীলোক বলিয়াই বোধ হয়।
আমি। উঁহাদিগের সহিত অপর আর কোন পুরুষ মানুষ ছিল কি?
২য় পরিচারিকা। সেই কামরার ভিতর কোন পুরুষ মানুষকে দেখি নাই; কিন্তু কয়েকজন পুরুষ মানুষ আসিয়া মধ্যে মধ্যে উহা দিগের খোজ-তল্লাস লইয়া গিয়াছে, তাহা আমি দেখিয়াছি।
আমি। তুমি জান, উঁহারা কাহারা?
২য় পরিচারিকা। না, তাহা আমরা জানি না।
আমি। উঁহারা কোথায় নামিয়া গিয়াছে?
২য় পরিচারিকা। তাহা বলিতে পারি না। কারণ, যখন আমরা জাহাজ হইতে উলুবেড়িয়ায় অবতরণ করি, সেই সময় তাঁহারা জাহাজেই ছিলেন। পরে কোথায় নামিয়াছেন, তাহা আমি জানি না।
আমি। তাহাদিগকে দেখিলে তুমি চিনিতে পারিবে?
২য় পরিচারিকা। তাহা আমি এখন ঠিক বলিতে পারিতেছি না। দেখিলে বুঝিতে পারি, চিনিতে পারি কি না।
আমি। তোমাদিগের সহিত পরিচারক ও দ্বারবান্ প্রভৃতি যাহারা ছিল, তাঁহারা তোমাদিগের কামরার ভিতর কখনও কোন কাৰ্য্যের নিমিত্ত প্রবেশ করিয়াছিল কি?
২য় পরিচারিকা। অপর কেহই আমাদিগের কামরায় প্রবেশ করে নাই। এমন কি, বাবু নিজেও সেই কামরার ভিতর প্রবেশ করেন নাই।
আমি। তুমি জাহাজ হইতে অবতরণ করিবার পূৰ্ব্বে, তোমা দিগের সমভিব্যাহারী কোন্ কোন্ ব্যক্তি জাহাজ হইতে অবতরণ করিয়াছিল?
২য় পরিচারিকা। তাহা আমি সবিশেষ লক্ষ্য করিয়া দেখি নাই।
আমি। তুমি নামিবার পর কে নামিয়াছিল, তাহা বলিতে পার?
২য় পরিচারিকা। তাহাও আমি বলিতে পারি না। সেই গোলযোগের ভিতর কে অগ্রে নামিল, কে পশ্চাৎ নামিল, তাহা আমি লক্ষ্য করিয়া দেখি নাই।
পরিচারিকাদ্বয়ের নিকট হইতে এই কয়টী কথা জিজ্ঞাসা করিয়া লইবার পর, আমি সেই বাবুটীকে কহিলাম, আপনি আপনার স্ত্রীকে একবার জিজ্ঞাসা করিয়া আসুন, আপনার পরিচারিকাদ্বয় যাহা কহিল, তাহা প্রকৃত কি না। যদি প্রকৃত হয়, তাহা হইলে সেই পরিচারিকাদ্বয়ের মধ্যে কেহ বালকটীকে লইয়া কোনও সময় জাহাজের বাহিরে আসিয়াছিল কি না? যদি আসিয়া থাকে, তাহা হইলে জিজ্ঞাসা করিবেন, কোন্ চাকরাণী বাহিরে আসিয়াছিল, এবং কেনই বা আসিয়াছিল।
আমার কথা শুনিয়া বাবুটী অন্তঃপুরের ভিতর প্রবেশ করিলেন, ও কিয়ৎক্ষণ পরে বাহিরে আসিয়া কহিলেন, চাকরাণীদ্বয় যাহা বলিয়াছে, তাহা প্রকৃত। উঁহারা যে পর্যন্ত জাহাজে ছিল, সেই পর্যন্ত কেহই কামরার বাহিরে যায় নাই।
এই সকল কথা অবগত হইয়া আমি সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিলাম। যাইবার সময় বাবুকে বলিয়া গেলাম, অনুসন্ধান করিয়া আমি যাহা যাহা অবগত হইতে পারিব, পরে তাহার সমস্ত ব্যাপার আপনাকে বলিব।
পঞ্চম পরিচ্ছেদ।
সেই স্থান হইতে বহির্গত হইয়া গমন করিবার পর দুইটা বিষয় আমার মনে উদিত হইল।
১ম। বালকটীকে পরিত্যাগ করিয়া তাহার পিতামাতা গমন করিলে পর, যদি সেই বালক জাহাজের কোন দুশ্চরিত্র খালাসি বা আরোহীগণের মধ্যে কোন অসচ্চরিত্র লোকের নয়নগোচর হইয়া থাকে, তাহা হইলে অর্থলোভে তাহাকে বিনষ্ট করিয়া অনায়াসেই তাহার দেহ সে গঙ্গার্গর্ভে নিক্ষেপ করিতে পারে। যদি আমার এই অনুমান সত্য হয়, তাহা হইলে বালকের অনু সন্ধান ত দূরের কথা, অলঙ্কার গুলিরও অনুসন্ধান হওয়া নিতান্ত সহজ হইবে না।
২য়। উলুবেড়িয়া ও কলিকাতার মধ্যবর্তী কোন স্থানে কোন আবোহী যদি সেই বালকটীকে লইয়া জাহাজ হইতে অবতরণ করিয়া চলিয়া গিয়া থাকে, তাহা হইলে বালক ও তাহার অলঙ্কারের কিছু না কিছু সন্ধান হইবার সম্পূর্ণ সম্ভাবনা আছে। এরূপ অবস্থায় সেই পন্থাই অবলম্বন করিয়া অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হওয়া এক্ষণে আমার কর্তব্য।
মনে মনে এইরূপ অনুমান করিয়া, আমি চাদপালঘাটে গিয়া উপস্থিত হইলাম। সেই স্থানে একখানি ডিঙ্গি ভাড়া করিয়া প্রথমে মেটিয়াব্রুজে এবং পরিশেষে বজবজে গিয়া সেই বালক সম্বন্ধে সবিশেষরূপ অনুসন্ধান করিলাম। কিন্তু সেই দুই স্থানে সেই বালকের কোনরূপ অনুসন্ধান না পাইয়া, রাজগঞ্জ ও অপরাপর কয়েকস্থানে গমন করিলাম। সেই সকল স্থানেও বালকের কোন রূপ অনুসন্ধান না পাইয়া, তিন চারিদিবস পরে নিতান্ত ক্ষুণ্ণ মনে কলিকাতায় প্রত্যাবর্তন করিলাম। আমার উর্দ্ধতন কর্ম্মচারী ও বালকের পিতামাতা প্রভৃতি সকলেই জানিতে পারিলেন যে, আমার দ্বারা সেই বালকের অনুসন্ধান হইবার আর কোনরূপ সম্ভাবনা নাই। তথাপি আমি যে সেই বালকের অনুসন্ধান একবারে পরিত্যাগ করিলাম, তাহাও নহে।
