হোসেন। তবে আমি দুই লক্ষ টাকা দিতে স্বীকার করিব?
গোফুর। পুল-স্নেহ যে কি, তাহা তুমি যে না জান, তাহা নহে। আমার পুত্রের জীবনের নিকট দুই লক্ষ টাকা অতি অল্প।
হোসেন। এত টাকা এখন আমি সংগ্রহ করি কি প্রকারে? এ পর্যন্ত যোগাড় করিয়া অনেক কষ্টে প্রায় দুই লক্ষ টাকা সংগ্রহ করিয়াছিলাম, মোকদ্দমায় এ পর্যন্ত প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকা ব্যয় হইয়া গিয়াছে, অবশিষ্ট এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা আমার নিকট আছে। ভাবিয়াছিলাম বে, এই মোকদ্দমায় আপনাদিগের যতই অর্থদণ্ড হউক না কেন, সেই টাকা হইতে তাহা প্রদান করিয়া আপনাদিগকে বাড়ীতে লইয়া যাইব। কিন্তু যাহা ভাবিয়াছিলাম তাহা হইল না।
গোফুর। দুইটা জীবনের জন্য যখন তিনি দুই লক্ষ টাকা চাহিতেছেন, তখন একটা জীবনের জন্য যে টাকা তোমার নিকট আছে, তাহা তাহাকে প্রদান কর, তাহাতে যদি তিনি সম্মত না হন, তাহা হইলে অবশিষ্ট টাকা পরে সংগ্রহ করিয়া তাহাকে প্রদান করিও।
হোসেন। এই সময় এত টাকা উহার হস্তে প্রদান করিব, আর উনি যদি কিছু না বলিয়া, কেবলমাত্র টাকাগুলি হস্তগত করেন, তাহা হইলে উপায়?
গোফুর। উপায় কিছুই নাই। আমার পুত্রের জীবনের সঙ্গে মা হয়, সেই টাকাও নষ্ট হইবে। দারোগা যেরূপ চরিত্রের লোকই হউক না কেন, আমাদিগের এরূপ অবস্থায় প্রতারিত করিয়া, এইরূপ ভাবে আমাদিগের জীবনের সহিত এত অর্থ গ্রহণ করিতে পারে, এরূপ বিশ্বাসঘাতক বোধ হয়, আজও জন্মগ্রহণ করে নাই। বিশেষতঃ যে দারোগার কথা তুমি বলিতেছ, সেই দারোগা আমার সহিত কখনও অবিশ্বাসের কাৰ্য করেন নাই।
হোসেন। আচ্ছা, তাহার কথায় বিশ্বাস করিয়া দেখি, ইহাতে আমাদিগের অদৃষ্টে যাহাই কেন হউক না।
এই বলিয়া হোসেন সেই স্থান হইতে উঠিয়া পুনরায় দারোগা সাহেবের নিকট গমন করিলেন। প্রহরী হাজতের দরজা পুনরায় বন্ধ করিয়া দিল।
পঞ্চম পরিচ্ছেদ।
হোসেন দারোগা সাহেবের নিকট প্রত্যাবর্তন করিলে, তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, গোফুর খাঁর সহিত আপনার সাক্ষাৎ হইয়াছিল কি?
হোসেন। হাঁ মহাশয়। সাক্ষাৎ হইয়াছিল।
দারোগা। তিনি কি বলিলেন?
হোসেন। তিনি আপনার প্রস্তাবে সাত আছেন, কিন্তু অত টাকা এখন দিয়া উঠিতে পারিবেন না।
দারোগা। কত টাকা এখন তিনি প্রদান করিতে সমর্থ হইবেন?
হোসেন। এখন এক লক্ষ টাকা তিনি প্রদান করিতে সমর্থ আছেন।
দারোগা। এত অল্প টাকায় ত আমি এই কাৰ্য শেষ করিতে পারিব না।
হোসেন। দুই লক্ষ টাকা এখন আমাদিগের হস্তে নাই। এখন আমি এক লক্ষ টাকা প্রদান করিতেছি, আসামীদ্বয় মুক্তিলাভ করিবার একমাস পরে বক্রী এক লক্ষ টাকা যেরূপে পারি, সেইরূপে সংগ্রহ করিয়া আপনাকে নিশ্চয়ই প্রদান করিব। তাহার কোন অস্থা হইবে না।
দারোগা। এখন কি এক লক্ষ টাকার অধিক আর কিছুই দিতে পারিবেন না?
হোসেন। নিতান্ত আবশ্যক হয়, আরও কিছু দিতে পারি। আপনার নিকট আমি কোন কথা গোপন করিতেছি না, আমার নিকট এখন এক লক্ষ পঁচিশ হাজার টাকা আছে, ইহার মধ্যে আপাততঃ আবশ্যক উপযোগী যে কয় হাজার টাকার প্রয়োজন, তাহা রাখিয়া অবশিষ্ট সমস্তই আমি আপনাকে প্রদান করিতে প্রস্তুত আছি। কাৰ্য শেষ হইয়া গেলে, অবশিষ্ট টাকাগুলি আপনাকে আমি প্রদান করিয়া যাইব।
দারোগা। আবশ্যক খরচ-পত্রের নিমিত্ত আপাততঃ আপনি পাঁচ হাজার টাকা আপনার নিকট রাখিয়া দিন। অবশিষ্ট এক লক্ষ কুড়ি হাজার টাকা আমাকে প্রদান করুন। আমি আপনার মনিবদ্বয়ের জীবন রক্ষা করিতেছি। অবশিষ্ট টাকা আমাকে সময় মত দিয়া যাইবেন।
হোসেন। সে বিষয়ে আপনি নিশ্চিন্ত থাকিবেন। আপনি কি উপায়ে উঁহাদিগের জীবন রক্ষা করিতে সমর্থ হইবেন, তাহা আমরা এখন জানিতে পারিব কি?
দারোগা। জানিতে পারিবেন বৈ কি। আমি উহা দিগের জীবন রক্ষা করিব বটে; কিন্তু কিছুদিবস উঁহাদিগকে সবিশেষ কষ্ট সহ্ করিতে হইবে।
হোসেন। কিরূপ কষ্ট সহ করিতে হইবে, তাহা আমাকে বলিয়া. দিন।
দারোগা। কেবলমাত্র আপনাকে বলিলে চলিবে না। গোফুর ও ওসমামকে আমি এই স্থানে আনাইতে পাঠাইতেছি; তাঁহারা আসিলে তাহাদিগকে আমি আমার মনের কথা বলিব, তাহাতে যদি উঁহারা সম্মত হন, তাহা হইলে আমি এই কার্যে হস্তক্ষেপ করিব, এবং আমাকে যে অর্থ প্রদান করিতে চাহিতেছেন, তাহা গ্রহণ করিব। নতুবা সেই অর্থে আমি হস্তক্ষেপ করিব না।
হোসেনকে এই কথা বলিয়া দারোগা সাহেব একজন প্রহরীকে ডাকিলেন ও তাহাকে কহিলেন, হাজতের ভিতর যে দুইজন আসামী আছে, তাহাদিগকে আমার নিকট লইয়া আইস।
দারোগা সাহেবের কথা শুনিয়া প্রহরী সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিল, এবং অবিলম্বেই গোফুর খাঁ ও তাহার পুত্রকে আনিয়া তাঁহার সম্মুখে উপস্থিত হইল। দারোগা সাহেব তাহা দিগকে সেই স্থানে বসিতে বলিলে, অশ্রুপূর্ণ-লোচনে উভয়েই সেই স্থানে উপবেশন করিলেন।
দারোগা। এখন আর রোদন করিবার সময় নাই। আমি আপনাদিগকে যে সকল কথা বলিতেছি, তাহা সবিশেষ মনোযোগের সহিত শ্রবণ করুন। পরে সবিশেষ বিবেচনা করিয়া তাহার উত্তর প্রদান করুন। আমি আপনাদিগের জীবন রক্ষা করিতে চাহি। ইহাতে আপনাদিগের অভিমত কি?
গোফুর। ইহাতে আমাদিগের আর অভিমত কি হইতে পারে? যখন মৃত্যু নিশ্চয় হইবেই, তখন বাঁচিতে পারিলে আর কে না বাঁচিতে চাহে! আপীলে কিছু হইবে কি?
