হোসেন। গরিব-দুঃখীকে আপনারা যেরূপ ভাবে অর্থ দান করিতে কহিবেন, তাহা আমরা করিব। তদ্ব্যতীত আপনাদিগের জীবন-রক্ষা করিবার নিমিত্ত প্রাণপণে চেষ্টা করিতে ক্রটি করিব না। বিশেষ–
গোফুর। বিশেষ কি?
হোসেন। এরূপ ভাবে অর্থ আমি যে নিজের ইচ্ছামত ব্যয় করিতেছি, তাহা নহে। আপনার বাড়ীর স্ত্রীলোকগণ সকলেই আপনাদিগের জীবনের নিমিত্ত তাহাদিগের সঞ্চিত সমস্ত অর্থ ও তাঁহাদিগের সমস্ত অলঙ্কার-পত্র পর্যন্ত আমার হস্তে প্রদান করিতে উদ্যত হইয়াছেন, এবং বলিতেছেন, যদি কোনরূপে আমি আপনা দিগের জীবন রক্ষা করিতে সমর্থ না হই, তাহা হইলে তাঁহারা সকলেই বিষপান করিয়া আপনাপন জীবন নষ্ট করিবেন। আমি যদিচ এখন তাঁহাদিগের নিকট হইতে কোন অর্থ গ্রহণ করি নাই, তথাপি যদি আমি এইরূপ ব্যয় করিয়া আপনাদিগের জীবন রক্ষার কোনরূপ উপায় না করি, তাহা হইলে কি সর্বনাশ ঘটিবে, একবার মনে করিয়া দেখুন দেখি? : গোফুর। বাড়ীর স্ত্রীলোকগণ যখন আমাদিগের জীবনের নিমিত্ত এত উৎসুক, তাঁহাদিগের নিমিত্ত কিরূপ বন্দোবস্ত করিতে ইচ্ছা করিয়াছেন?
হোসেন। সে সম্বন্ধে আমি এ পর্যন্ত কিছুই মনে ভাবি নাই। কারণ, আমার বিশ্বাস, এ সম্বন্ধে আমার কোনরূপ বন্দোবস্ত করিবার প্রয়োজন হইবে না!
গোফুর। কোনরূপ বন্দোবস্ত করিবার প্রয়োজন হইবে না কেন?
হোসেন। যখন আমার বিশ্বাস যে, যেরূপে পারি, আপনা দিগের জীবন রক্ষা করিব, তখন আমার সেই সকল দিকে এখন দৃষ্টি করিবার কোনরূপ প্রয়োজন নাই। যেরূপ ভাবে এ পর্যন্ত চলিয়া আসিতেছে, এখন সেইরূপ ভাবেই চলুক। পরিশেষে আপনারা নিষ্কৃতি লাভ করিয়া যখন বাড়ীতে প্রত্যাবর্তন করিবেন, সেই সময় আপনার যেরূপ অভিরুচি হয়, সেইরূপ করিবেন।
গোফুর। সে বহুদূরের কথা।
হোসেন। আমি দিব্য চক্ষে দেখিতে পাইতেছি, উহা দূরের কথা নহে।
গোফুর। সে পরের কথা। আমাদিগকে বাঁচাইতে পারিবে, এরূপ লুব্ধ আশ্বাসের উপর একবারে নির্ভর করিয়া থাকিও না। আমাদিগকে খালাস করিবার যতদূর চেষ্টা করিতে হয়, কর; অথচ অপরাপর বন্দোবস্তের দিকেও সবিশেষরূপ দৃষ্টি রাখিও। কারণ, যদি আমাদিগের জীবন রক্ষাই না হয়, তাহা হইলে আমি বাঁচিয়া থাকিতে থাকিতে আমার ইচ্ছামত বিষয়-আদির বন্দোবস্ত করার আবশ্যক। জমিদারী সম্বন্ধে কিরূপ বন্দোবস্ত করিতে ইচ্ছা করিতেছ?
হোসেন। এখনও কোনরূপ বন্দোবস্ত করিবার চেষ্টা করি নাই। যেরূপ আদেশ করিবেন, সেইরূপ ভাবেই বন্দোস্ত করিব।
গোফুর। মোকদ্দমা খরচের নিমিত্ত যে টাকা সংগ্রহ করিয়া আনিয়াছ, সেই টাকার নিমিত্ত জমিদারীর কোন অংশ নষ্ট করিতে হইয়াছে কি?
হোসেন। টাকার নিমিত্ত জমিদারীর কোন অংশ আমি নষ্ট করি নাই, বা উহা বন্ধক দিতেও হয় নাই। সরকারী তহবিলের যে যে স্থানে যে যে টাকা মজুত ছিল, তাহাই সংগ্রহ করিয়া আনিয়াছি মাত্র। যদি কিছু দেনা হইয়া থাকে, তাহা হইলে তাহার নিমিত্ত বিষয়-আদি কিছুই বন্ধক দিতে হইবে না। সমস্ত জমিদারী এ পর্যন্ত যেরূপ ভাবে ছিল, এখনও সেইরূপ ভাবেই আছে।
হোসেন ও গোফুর খাঁর সহিত এইরূপ কথাবার্তা হইতেছে, এমন সময়ে একজন প্রহরী আসিয়া আসামীদ্বয়কে হাজতের ভিতর বদ্ধ করিয়া দিল। সুতরাং উভয়ের কথাবার্তা সেই সময়ের নিমিত্ত শেষ হইয়া গেল। আসামীদ্বয় সবিশেষ দুঃখিত অন্তঃকরণে হাজতের ভিতর প্রবেশ করিলেন।
সম্পূর্ণ।
ঘর-পোড়া লোক – ৩য় বা শেষ অংশ
ঘর-পোড়া লোক (শেষ অংশ) (দারোগার হয় ৭৬ম সংখ্যা)
(অর্থাৎ পুলিসের অসৎ বুদ্ধির চরম দৃষ্টান্ত।)
প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায় প্রণীত।
সিকদারবাগান বান্ধব পুস্তকালয় ও সাধারণ পাঠাগার হইতে শ্রী বাণীনাথ নন্দী কর্তৃক প্রকাশিত।
Al Rights Reserved.
সপ্তম বর্ষ। সন ১৩০৫ সাল। শ্রাবণ
Printed By Shashi Bhusan Chandra, at the GREAT TOWN PRESS, 68, Nimtola Street, Calcutta.
ঘর-পোড়া লোক।
(শেষ অংশ)
প্রথম পরিচ্ছেদ।
আসামীদ্বয় থানায় উপস্থিত হইলে পর, সেই সময় থানায় যে কর্ম্মচারী উপস্থিত ছিলেন, তিনি আসামীদ্বয়কে হাজত গৃহে বন্ধ করিয়া রাখিলেন।
থানায় হাজত-গৃহ কিরূপ, তাহা পাঠকগণ অবগত আছেন কি? থানার ভিতর থানার কর্ম্মচারীগণ যে স্থানে বসিয়া সৰ্ব্বদা কাষ-কৰ্ম্ম বা লেখা-পড়া করিয়া থাকেন, তাহার দুই পার্শ্বে বা তাহার সন্নিকটে ছোট ছোট দুইটী গৃহ প্রায়ই দেখিতে পাওয়া যায়; উহাই থানার হাজত-গৃহ। উহার একটা পুরুষ-কয়েদী এবং অপরটা স্ত্রী-কয়েদীর নিমিত্ত প্রায়ই ব্যবহৃত হইয়া থাকে। সেই সকল গৃহে কেবল একটামাত্র দরজা ভিন্ন অপর জানালা দরজা প্রায়ই থাকে না। চোর বলুন, মাতাল বলুন, হত্যাকারী বলুন, বা যে কোন অপরাধের আসামী বলুন, সমস্ত দিনরাত্রির মধ্যে যাহারা ধৃত হইয়া থানায় আইসে, তাহাদিগের সকলকেই একত্র সেই গৃহের ভিতর থাকিতে হয়। বিছানার নিমিত্ত উহার মধ্যে একখানি কম্বল থাকে মাত্র।
গোফুর খাঁ ও ওসমান সেইরূপ একটী হাজত-গৃহের ভিতর আবদ্ধ হইলেন। সেই সময় হোসেন আঁহাদিগের সহিত কথাবার্তা কহিবার ইচ্ছা প্রকাশ করিলে, তাহার সমভিব্যাহারী সেই প্রহরী কহিল, যে পর্যন্ত আসামী থানার ভিতর থাকিবে, সেই পৰ্য্যন্ত আসামী সম্বন্ধে কোন কথা বলা আমাদিগের ক্ষমতার অতীত। এখন যদি আপনি আসামীদ্বয়কে কিছু বলিতে চাহেন, বা উঁহারা আপনাকে কিছু বলিতে চাহেন, তাহা হইলে এখন এই থানায় কে কর্ম্মচারী উপস্থিত আছেন, ভাহার আদেশ লইবার প্রয়োজন। কারণ, যে পর্যন্ত আসামী দ্বয় থানার ভিতর থাকিবেন, সেই পৰ্যন্ত সেই আসামীদ্বয়ের সহিত আমাদিগের কোনরূপ সংস্রক নাই। এখন সেই আসামীদ্বয় সম্বন্ধে যাহা কিছু জবাবদিহি, তাহা এই থানার উপস্থিত কর্ম্মচারীকে করিতে হইবে।
