এই বলিয়া হোসেন, সেই দিবস দারোগা সাহেবের নিকট হইতে বিদায় গ্রহণ করিলেন।
হোসেন চলিয়া গেলে, দয়োগা সাহেব মনে মনে স্থির করিলেন, যাহা কিছু পাইয়াছি, তাহা গ্রহণ করিয়াছি। আরও যদি কিছু পাই, তাহাও লইব। অধিকন্তু হোসেনের সাহায্যে সেই স্ত্রীলোকটীকেও পুনরায় আনাইয়া লইব। কিন্তু আসল কাৰ্য কোনরূপেই ছাড়িব না; যাহাতে গোফুর এবং ওসমানকে ফঁসি কাষ্ঠে ঝুলাইতে পারি, বিধিমতে তাহার চেষ্টা করিব।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।
হেদায়েতের কন্যাকে হত্যার অপরাধে, গোফুর খাঁ এবং তাহার পুত্র ওসমান খাঁ মাজিস্ট্রেটের নিকট প্রেরিত হইলেন। দারোগা সাহেবও প্রাণপণে সেই মোকদ্দমার আয়োজন করিতে লাগিলেন। পিতা পুত্র উভয়েই হাজতে রহিলেন। পুলিসের নিকট যে সকল সাক্ষী সাক্ষ্য প্রদান করিয়াছিল, যাহাতে তাঁহারা মাজিস্ট্রেটের নিকট অন্যরূপ সাক্ষ্য প্রদান করে, তাহার নিমিত্ত হোসেন অনেক অর্থ ব্যয় করিয়া, অনেক চেষ্টা করিলেন; কিন্তু কিছুতেই কৃতকার্য হইতে পারিলেন না। বরং পুলিসের নিকট তাঁহারা যেরূপ বলিয়াছিল, মাজিষ্ট্রেটের নিকট তাহা অপেক্ষা আরও অনেক অধিক কথা কহিল।
সমস্ত সাক্ষীর এজাহার হইয়া যাইবার পর, মাজিষ্ট্রেট সাহেব দেখিলেন যে, আসামীদ্বয়ের বিরুদ্ধে হত্যাকরা অপরাধ উত্তমরূপে প্রমাণিত হইয়াছে। সুতরাং চুড়ান্ত বিচারের নিমিত্ত তিনি এই মোকদ্দমা দায়রায় প্রেরণ করিলেন।
এই মোকদ্দমার বিচারের নিমিত্ত যখন দায়রায় দিন স্থির হইল, সেই সময় বিচারক মফঃস্বল পরিভ্রমণ উপলক্ষে, জেলা হইতে সুদূর মফঃস্থলে অবস্থান করিতেছিলেন। যখন যে গ্রামে বিচারক উপস্থিত হইতেছিলেন, সেই সময় সেই গ্রামেই আপন কাছারি করিয়া মোকদ্দমার বিচারও করিয়া আসিতেছিলেন।
যে দিবস গফুর খাঁ এবং তাঁহার পুত্র ওসমানের এই হত্যাপরাধ-বিচার আরম্ভ হইল, সে দিবস একটা নিতান্ত ক্ষুদ্র পলিগ্রামের ভিতর জজসাহেবের তাম্বু পড়িয়াছিল। সুতরাং সেই স্থানেই এই মোকদ্দমার বিচার আরম্ভ হইল।
এলাহাবাদ হাইকোর্ট হইতে উকীল কৌন্সলি আনাইয়া এই মোকদ্দমায় দোষ-ক্ষালনের যতদূর উপায় হইতে পারে, হোসেন প্রাণপণে তাহার চেষ্টা করিলেন; কিন্তু কিছুতেই আপনার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করিতে সমর্থ হইলেন না। সরকারী উকীল মোকর্দমার অবস্থা জজসাহেবকে উত্তমরূপে সর্বপ্রথম বুঝাইয়া দিবার পর হইতেই, জজসাহেবের মনে কেমন এক বিশ্বাস হইয়া গেল যে, আসামী পক্ষীয় উকীল কৌশলি অনেক চেষ্টা করিলেও, তাহার মন হইতে সেই বিশ্বাস অপনোদন করিতে পারিলেন না। তিন দিবস পৰ্য্যন্ত এই মোকদ্দমার সাক্ষিগণের এজাহার গৃহীত হইল। তাহাদিগের উপর যথেষ্ট জেরা হইল। উভয় পক্ষীয় উকীল কৌন্সলিগণ স্বপক্ষে সাধ্যমত বক্তৃতাদি করিতে ক্রটি করিলেন না; কিন্তু কিছুতেই আসামীদ্বয়ের পক্ষে কোনরূপ উদ্ধারের উপায় লক্ষিত হইল না।
জজসাহেব এই মোকদ্দমার রায় প্রদান করিবার কালীন কহিলেন, আসামীগণ! তিন দিবস পর্যন্ত বিশেষ যত্ন ও মনো–যোগের সহিত, এই মোকদ্দমার সমস্ত ব্যাপার আমি উত্তম রূপে শ্রবণ করিয়াছি, এবং তোমাদিগের পক্ষীয়, সুশিক্ষিত উকীল কৌন্সলিগন সবিশেষ যত্নের সহিত তোমাদিগের পক্ষসমর্থন করিয়া, তোমাদিগের স্বপক্ষে যাহা কিছু বলিবার আছে, তাহা অপেক্ষাও অনেক কথা বলিয়াছেন; কিন্তু উভয় পক্ষের সমস্ত ব্যাপার শ্রবণ করিয়া এবং সাক্ষিগণের সাক্ষ্য দিবার কালীন, তাহাদিগের ভাব-ভঙ্গি দেখিয়া আমার স্পষ্টই প্রতীতি জন্মিয়াছে যে, তোমাদিগের বিপক্ষে তাঁহারা বিন্দুমাত্রও মিথ্যা কথা কহে নাই। অবশ্য, অনেক সাক্ষ্যের অনেক স্থান অপর সাক্ষিগণের সাক্ষ্যের সহিত এক মিল হয় নাই। কিন্তু তাহা বলিয়া তাঁহারা যে, একবারে মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান করিতেছে, এ কথা আমি কখনই স্বীকার করিতে পারিব না। তোমাদিগের বাড়ীর ভিতর তালা বন্ধ গৃহের মধ্যে হেদায়েতের কন্যার মৃতদেহ যে পাওয়া গিয়াছে, সে সম্বন্ধে কোন আপত্তি উত্থাপিত হয় নাই। বিশেষতঃ তোমাদিগের বিরুদ্ধে যে সকল ব্যক্তি সাক্ষ্য প্রদান করিয়াছে, তাঁহারা সকলেই তোমাদিগের জমিদারীর প্রজা। প্রজাগণ তাহা দিগের জমিদারের বিপক্ষে কখনই মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান করিতে সম্মত হয় না। আর নিতান্ত সত্যের অনুরোধে যদি কোন প্রজাকে তাহার জমিদারের বিপক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করিতে হয়, তাহা হইলেও সেই প্রজা যতদূর সম্ভব, তাহার জমিদারকে বাঁচাইয়া যাইতে চেষ্টা করে, ইহাই এদেশীয় নিয়ম। তোমাদের প্রজাগণ তোমাদিগের বিপক্ষে যে সকল সাক্ষ্য প্রদান করিতেছে, আমার বিশ্বাস, তাঁহারা তাহা অপেক্ষাও অনেক অধিক কথা অবগত আছে। কোনরূপে যদি আপনাদের জমিদারের উপকার করিতে পারে, এই ভাবিয়া সকল কথা তাঁহারা বলে নাই। সেই সকল সাক্ষী ওসমানের অত্যাচারে অত্যাচারিত হইয়া, তোমাদিগকে বিপদাপন্ন করিবার মানসে মিথ্যা কথা কহিতেছে, এ কথা সময় সময় মোদিগের কৌন্সলি উখাপিত করিলেও, তাঁহারা সেই সকল কথা একবারে অস্বীকার করে। অথচ তোমরাও তাহার সত্যাসত্য প্রমাণ করতে সমর্থ হও নাই, বা তাহার চেষ্টাও কর নাই। এইরূপ নানা কারণে আমি সাক্ষিগণের সাক্ষ্য কোনরূপেই একবারে অবিশ্বাস করিতে পারি না।
