আগন্তুক। মহাশয়! আপনি আমার কথায় বিশ্বাস করুন, আর না করুন, আমি কিন্তু প্রকৃত কথা কহিতেছি। আমার অনুপস্থিতিতে এই কাৰ্য্য হইয়াছে। আমার বাড়ীতে আমার সেই একমাত্র কন্যা ব্যতীত আর কেহই ছিল না; সুতরাং সুযোগ পাইয়া দুবৃত্ত এই কাৰ্য্য করিয়াছে। তাহার ভয়ে পাড়ার লোক আমাকে পর্যন্ত সংবাদ দিতে সমর্থ হয় নাই। অঙ্গ আমি বাড়ীতে আসিয়া যেমন এই সকল ব্যাপার জানিতে পারিলাম, অমনি আপনার নিকট আগমন করিয়াছি। এখন আপনি রক্ষা না করিলে, আমার আর উপায় নাই।
দারোগা। তোমার বাড়ী যে গ্রামে, সেই গ্রাম হইতে ওসমানের বাড়ী কতদুর?
আগন্তুক। খুব নিকটে, পার্শ্ববর্তী গ্রামে।
দারোগা। তোমার জমিদার কে।
আগন্তুক। সেই হতভাগাই আমার জমিদার।
দারোগা। জমিদারীর খাজানা তোমার কিছু বাকী আছে।
আগন্তুক। বাকী আছে। মিথ্যা কথা কহিব না, আমি আজ তিন বৎসর খাজানা দিতে পারি নাই।
দারোগা। ফি বৎসর তোমাকে কত টাকা করিয়া খাজান দিতে হয়?
আগন্তুক। সালিয়ানা আমাকে পনর টাকা করিয়া খাজানা দিতে হয়। পঁয়তাল্লিশ টাকা খাজানা আমার বাকী পড়িয়াছে।
দারোগা। সেই খাজানার নিমিত্ত তাঁহারা তাগাদা করে না?
আগন্তুক। তাগাদা কমে বৈ কি, কিন্তু দিয়া উঠিতে পারি না।
দারোগা। যখন তোমার কন্যাকে ওসমান ধরিয়া লইয়া গিয়াছিল, সেই সময় তাহার সতে আর কোন লোক ছিল?
আগন্তুক। তাহার সহিত আরও চারি পাঁচজন লোক ছিল।
দারোগা। ওসমানের পিতা গোয় খ সেই সঙ্গে ছিলেন?
আগন্তুক। না মহাশয়। তিনি ছিলেন না।
দারোগা। তুমি জান না; তিনি না থাকিলে, কখনও এইরূপ কাৰ্য্য হইতে পারে না। গ্রামের যে সকল ব্যক্তি এই ঘটনা দেখিয়াছে, তাহাদিগকে তুমি ভাল করিয়া জিজ্ঞাসা করিয়াছ কি?
আগন্তুক। জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম। কিন্তু কেই সে কথা কহে না। আরও ভাবিয়া দেখুন না কেন, পুল বদি কোন যুবতী রমণীর সতীত্ব নষ্ট করিবার চেষ্টা করে, পিতা কি কখনও তাহার সহায়তা করিয়া থাকেন?
দারোগা। ওসমান শেষে উহার সতীত্ব নষ্ট করিতে পারে; কিন্তু প্রথমতঃ সেই কাৰ্যের নিমিত্ত যে তাহাকে ধরিয়া লইয়া গিয়াছে, তাহা তোমাকে কে বলিল? অপর কোন কারণে সে কি তোমার কন্যাকে ধরিয়া লইয়া যাইতে পারে না?
আগন্তুক। আর তা কোন কারণ দেখিতে পাইতেছি না, বা শুনিতেও পাইতেছি না।
দারোগা। ওমানের পিতা গোফুর খাঁ এখন কোথায় আছেন, বলিতে পার?
আগন্তুক। তিনি এখন বাড়ীতেই আছেন।
দারোগা। কানপুর হইতে তিনি কবে আসিয়াছেন।
আগন্তুক। পাঁচ ছয় দিবস হইবে।
দারোগা। তাহা হইলে যে দিবস ওসমান তোমার কন্যাকে ধরিয়া লইয়া গিয়াছে, সেই দিবস গোয় কান পুর হইতে বাড়ীতে আসিয়াছেন।
আগন্তুক। হাঁ মহাশয়! হয় সেই দিবসই আসিয়াছেন, না হয়, তাহার পরদিন আগমন করিয়াছেন।
দারোগা। তাহা হইলে ঠিক হইয়াছে। তোমার কন্যার ধর্ম নষ্ট করিবার নিমিত্ত ওসমান তোমার দুহিতাকে ধরিয়া লইয়া যায় নাই। গত তিন বৎসর পর্যন্ত তোমার নিকট হইতে খাজনা আদায় না হওয়ায়, সেই খাজনা আদায় করিবার মানসে ওমানের পিতা গোফুর খাঁ আপন পুত্র ওসমান ও তার কয়েকজন বিশ্বস্ত কর্ম্মচারীকে সঙ্গে করিয়া তোমার বাড়ীতে আগমন করেন। তুমি বাড়ীতে ছিলে না; সুতরাং তাঁহারা তোমাকে বাড়ীতে দেখিতে পান নাই। কিন্তু তুমি যে এতই বাড়ীতে নাই, ইহা না ভাবিয়া, খাজানা দিবার জয়ে তুমি লুকায়িত পাই, এই ভাবিয়া তোমাকে ভয় দেখাইয়া খাজনা আদায় করিয়া লইবার মানসে তোমার একমাত্র কন্যাকে ধরিয়া লইয়া যাইবার নিমিত্ত গোফুর খাঁ তাঁহার পুত্রকে আদেশ প্রদান করিয়াছিলেন। পিতার আদেশ পাইয়া ওসমান কয়েকজন লোকের সাহায্যে তোমার কন্যাকে ধরিয়া লইয়া গিয়াছে। খাঁ সাহেবও তাহাদের সঙ্গে সঙ্গে গমন করিয়াছেন। কেমন, ইহাই প্রকৃত কথা কি না?
আগন্তুক। না মহাশয়। ইহা এত কথা নহে। ওসমানের পিতা সেই স্থানে উপস্থিত ছিলেন না, বা তিনি আদেশ প্রদান করেন নাই। আমার বাকী থানায় নিমিত্তও এটনা ঘটে নাই।
দারোগা। যা ব্যাটা, তবে তোর মোক গ্রহণ করিব। তুই বাড়ীতে হিলি নি, এত কথা যে কি, তাহার তুই কি জানি? আমরা ইতিপূর্বে সকল কথা জানিতে পারিয়াছি, কেবল কোন ব্যক্তি আমার নিকট আসিয়া নালিশ করে নাই বলিয়া, আমি এ পর্যন্ত অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হই নাই। আমি যেরূপ কহিলাম, সেইপের সাক্ষী সকল সংগ্রহ করিয়া রাখ গিয়া। আমি একজন মাদারকে সঙ্গে দিতেছি, যাহা তুই বুঝতে না পাবি, তিনি তাহা হতাকে বুঝাইয়া দিবেন। তাঁহারা আমি গিন্ধ আসন্ধানে প্রবৃত্ত হইব।
আগন্তুক। দোহাই ধৰ্মবতায়! যাহাতে আমি আমার কাটীকে পাই, আপনাকে সেই উপায় করতে হবে।
দারোগা। তাহাই হইবে। এখন তুই আমার জমা দারের সহিত গমন করিয়া সাক্ষী-সাবুদের সংগ্রহ করিয়া দে। তুই লেখা-পড়া জানিস্ কি? আগন্তুক। আমরা চাষার ছেলে, লেখাপড়া শিখি নাই।
দারোগা। নিজের নাম লিখিতে পারি?
আগন্তুক। না মহাশয়! আমি আমার নাম পর্যন্ত লিখিতে পারি না।
দারোগা। তোর নাম কি?
আগন্তুক। আমার নাম শেখ হেদায়েৎ।
দারোগা। আচ্ছা হেদায়েৎ, তুমি আমার জমাদারের সহিত তোমার গ্রামে গমন কর। আহারান্তে আমি নিজে গিয়া এই অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হইব। সাক্ষীগণ যেন উপস্থিত থাকে।
