দারোগার কথা শুনিয়া গোফুর খাঁ চতুর্দিক অন্ধকার দেখিতে লাগিলেন, এবং এই অবস্থায় কি করিবেন, তাহার কিছুই স্থির করতে না পারিয়া সেই স্থানে বসিয়া পড়িলেন।
দারোগা। কি মহাশয়। আপনি চুপ করিয়া বসিয়া রহিলেন যে? এই লাস কিরূপে আপনার বাড়ীর ভিতর আসিল, সে সম্বন্ধে কোন কথা বলিতেছেন না কেন?
গোফুর। আপনার কথায় আমি যে কি উত্তর প্রদান করিব, তাহা কিছুই বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছি না। যখন ইহার কিছুই আমি অবগত নহি, তখন আমি আপনাকে আর কি বলিব?
দারোগা। কিগো দ্বারবান্ সাহেব! এ সম্বন্ধে তুমি কি বলিতে চাই?
দ্বারবান্। দোহাই ধর্মাবতার! আমি ইহার কিছুই জানি না।
দারোগা। তুমি দ্বারবান, সর্বদা তুমি দরজায় বসিয়া থাক, অথচ তুমি বলিতেছ, তুমি ইহার কিছুই জান না। এ কথা কি কেহ সহজে বিশ্বাস করিতে পারে?
দ্বারবান্। আপনি বিশ্বাস করুন, আর না করুন, আমি প্রকৃত কথাই বলিতেছি। আমি প্রকৃতই জানি না যে, এই মৃতদেহ কিরূপে বা কাহা কর্তৃক এই বাড়ীর ভিতর আসিল।
গোফুর খাঁ, ওসমান ও দ্বারা যখন কোন কথা বলিল না, তখন সেই সময় দারোগা সাহেব তাহাদিগকে আর কোন কথা জিজ্ঞাসা না করিয়া, নিজের ইচ্ছামত অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হইলেন।
লাশের সুরতহাল করিয়া পরীক্ষার্থ উহ জেলার ডাক্তার সাহেবের নিকট প্রেরণপূর্বক ঘটনাস্থলে বসিয়া দারোগা সাহেব কয়েকদিবস পর্যন্ত অনুসন্ধান করিতে লাগিলেন। এখনকার অনুসন্ধান আসামীগণকে লইয়া নহে; এখনকার অনুসন্ধান, ফরিয়াদী ও সেই স্থানের প্রজাগণের সাহায্যে এবং জমাদার সাহেবের আন্তরিক যত্নের উপর নির্ভর করিয়াই হইতে লাগিল। অর্থাৎ গোফুর খাঁ ও তাঁহার পুত্রের বিপক্ষে এই হত্যা সম্বন্ধে যে সকল প্রমাণ সংগৃহীত হইতে পারে, এখন সেই অনুসন্ধানই চলিতে লাগিল।
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ।
পাঠকগণ পূর্ব হইতেই অবগত আছেন যে, গোফুর খাঁ একজন নিতান্ত সামান্য লোক নহেন। দেশের মধ্যে তাঁহার মান-সন্ত্রম যেরূপ থাকা আবশ্যক, তাহার কিছুরই অভাব নাই। অর্থও যথেষ্ট আছে। কিন্তু এই সকল থাকা স্বত্বেও প্রজাগণ কেহই তাহার উপর সন্তুষ্ট নহে; সকলেই তাঁহার বিপক্ষ। প্রজাগণ গোর খার বিপক্ষে দণ্ডায়মান হইবার একমাত্র কারণ, তাঁহার পুত্র ওসমান। ওসমানের অত্যাচারে সকলেই সবিশেষরূপ জ্বালাতন হইয়া পড়িয়াছে। যখন ওমামের অত্যাচার তাঁহারা সময় সময় সহ করিয়া উঠিতে সমর্থ হয় নাই, তখন তাঁহারা তাহার পিতা গোফুর খাঁর নিকট পর্যন্ত গমন করিয়া, ওসমানের অআচারের সমস্ত কথা তাহার নিকট বিবৃত করিয়াছে। তথাপি গোফুর তাহাদিগের কথায় কোনরূপ কর্ণপাত করেন নাই, বা তাহার প্রতিবিধানের কোনরূপ চেষ্টাও করেন নাই। এই সকল কারণে প্ৰজামাত্রেই পিতা-পুত্রের উপর অস। সুতরাং আজ তাঁহারা যে সুযোগ পাইয়াছে, সেই সুযোগ পরিত্যাগ করিবে কেন? তাহার উপর দারোগা সাহেব সহায়।
প্রজাগণ এক বাক্যে গোফুর খাঁ ও তাহার পুত্র ওসমানের বিপক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করিতে লাগিল। অনুসন্ধান সমাপ্ত হইলে, দারোগা সাহেব দেখিলেন, নিম্নলিখিত বিষয় সম্বন্ধে উপস্থিত মোকদ্দমায় উত্তমরূপে প্রমাণ হইয়াছে।
১ম। সেখ হেদায়েতের যে গ্রামে বাড়ী, সেই গ্রামের প্রজাগণের দ্বারা প্রমাণিত হইল যে, গোফুর খাঁ ও ওসমান বকেয়া খাজানা আদায় করিতে সেই গ্রামে গমন করেন। হেদা য়েতের নিকট কয়েক বৎসরের খাজানা বাকী পড়ায়, এবং হেদায়েৎ সেই সময় সেই স্থানে উপস্থিত না থাকায়, ওসমান গোফুর খাঁর আদেশমত কয়েকজন পাইকের সাহায্যে, হেদা যেতের একমাত্র যুবতী কন্যাকে বলপূর্বক তাহার বাড়ী হইতে সৰ্ব্বসমক্ষে ধরিয়া আনে, এবং তাহার নিকট হইতে খাজানা আদায় করিবার মানসে গোফুর খাঁর আদেশমত সৰ্ব্ব সমক্ষে তাহাকে সবিশেষরূপে অবমানিত করে। কিন্তু তাহার নিকট হইতে খাজনা আদায় না হওয়ায়, গোয় খ ও ওসমান অপরাপর লোকের সাহায্যে তাহাকে সেই স্থান হইতে বলপূর্বক ধরিয়া আপন গৃহাভিমুখে লইয়া যান।
২য়। অপরাপর গ্রামের কতকগুলি প্ৰজার দ্বারা প্রমাণিত হইল যে, হেদায়েতের কন্যাকে হেদায়েতের গ্রাম হইতে ধৃত অবস্থায় গোফুর খাঁর গ্রামে গোফুর খাঁ ও তাহার পুত্র কর্তৃক লইয়া যাইতে অনেকেই দেখিয়াছে।
৩য়। গোফুর খাঁর গ্রামের প্রত্যক্ষদর্শী প্রজাবর্গের দ্বারা প্রমাণিত হইল যে, হেদায়েতের কন্যাকে গোয় খা ও ওসমান তাঁহাদিগের বাড়ীর ভিতর লইয়া গিয়াছে।
৪র্থ। গোফুর খাঁর কয়েকজন ভৃত্য ও তাহার সেই পূর্ব বর্ণিত দ্বারবানের দ্বারা প্রমাণিত হইল যে, গোফুর খাঁর আদেশমত ওসমান হেদায়েতের সেই কন্যাকে আপনাদের গৃহের ভিতর আবদ্ধ করিয়া রাখিয়াছে, এবং যে পর্যন্ত সে জীবিত ছিল, তাহার মধ্যে ক্ষুধায় ও তৃষ্ণায় সে নিতান্ত অস্থির হইলেও, তাহাকে একমুষ্টি অন্ন বা এক গণ্ডুষ জল প্রদান করিতে বারণ করিয়াছিল। এমন কি, সাক্ষিগণের মধ্যে কেহ দয়াপরবশ হইয়া উহাকে এক গণ্ডষ পানীয় প্রদান করিতে উদ্যত হইলে, গোফুর ও তাঁহার পুত্র ওসমান খ। তাহাকেও উহা প্রদান করিতে দেন নাই।
এতদ্ব্যতীত আরও প্রমাণিত হইল যে, যে দিবস পুলিস কর্তৃক লাস বাহির হইয়া পড়ে, তাহার দুই কি তিন দিবস পূর্বে একজন ভৃত্য কোনরূপ উপায় অবলম্বন করিয়া, ওসমান খার নিকট হইতে সেই গৃহের চাবি অপহরণ করে, এবং ওসমান ও গোফুর খাঁর অসাক্ষাতে সেই গৃহের চাবি খুলিয়া দেখিতে পায় যে, ক্ষুধায় ও তৃষ্ণায় সেই স্ত্রীলোকটীর অবস্থা এরূপ হইয়া পড়িয়াছে যে, তাহার আর বাঁচিবার কিছুমাত্র আশা নাই। এই ব্যাপার দেখিয়া সেই সামান্য ভৃত্যেরও অন্তরে দয়ার উদ্রেক হইল, এবং দ্বারধানের সহিত পরামর্শ করিয়া, সে ইহা স্থির করিল যে, তাহার অদৃষ্টে যাহাই হউক, সে আজ সেই হতভাগিনীকে কিছু আহারীয় ও পানীয় প্রদান করিবে। মনে মনে এইরূপ ভাবিয়া সে কিছু আহারীয় ও পানীয় আনয়ন করিবার নিমিত্ত গমন করে। কিন্তু উহা সংগ্রহ করিয়া পুনরায় সেই স্থানে আসিয়া দেখিতে পায় যে, ওসমান খাঁ সেই স্থানে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে। ভূতের অভি সন্ধির কথা জানিতে পারিয়া, ওসমান তাহার উপর সবিশেষ রূপ অসন্তুষ্ট হন, এবং তাহার হস্ত হইতে আহাৰীয় ও পানীয় কাড়িয়া লইয়া দূরে নিক্ষেপ করেন। তৎপরে, সেই স্ত্রীলোকটী আহারীয় ও পানীয় প্রার্থনা করিয়াছে, এই ভাবিয়া ওসমান সেই গৃহের ভিতর প্রবেশ করেন, ও সেই মহা অপরাধের জন্য সেই সময় সেই স্থানে যে সকল ভৃত্যাদি উপস্থিত ছিল, তাহাদিগের সম্মুখে সেই মৃত্যুশয্যা-শায়িত স্ত্রীলোকটীকে পদাঘাত করেন। সেই সময় সেই স্ত্রীলোকটীর অবস্থা এরূপ হইয়া পড়িয়াছিল যে, তাহার কথা কহিবার বা রোদন করিবার কিছুমাত্র ক্ষমতা ছিল না; সুতরাং সেই পদাঘাত সে বিনা-বাক্যব্যয়ে অনায়াসেই সহ করে। পরিশেষে ওসমান সেইরূপ অবস্থাতেই সেই স্ত্রীলোকটীকে সেই গৃহের ভিতর রাখিয়া, পুনরায় সেই গৃহের দরজা তালাবদ্ধ করিয়া দৈন, এবং চাবি লইয়া সেই স্থান হইতে প্রস্থান করেন। ভৃত্য গোয় খার নিকট গমন করিয়া তাহার নিকট এই সমস্ত ঘটনা বর্ণন করে। গোর খ ইহার প্রতিবিধানের পরিবর্তে, সেই ভৃত্যের উপরই বরং অসন্তুষ্ট হন, এবং তাহাদিগের বিনা-অনুমতিতে সেই স্ত্রী লোকটীকে আহারীয় ও পানীয় দিতে উদ্যত হইয়াছিল বলিয়া, তাহাকে কটুক্তি করিয়া গালি প্রদান করেন, ও চাকরী হইতে তাহাকে বিতাড়িত করেন।
