দেখছি ঠিক পূর্বের মতই তাকিয়ে আছে সরমা কিরীটীর মুখের দিকে নিস্পলক দৃষ্টিতে, নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে।
ভেবেছিলাম বিমলবাবুর নৃশংস হত্যার তদন্তের ব্যাপারে অন্ততঃ আপনার অকপট সাহায্যই পাব!
ধীরে ধীরে সরমা এতক্ষণে কথা বলল আবার, আমি যা জানি সবই বলেছি।
কিরীটী মৃদু হাসল। তারপর পূর্ববৎ শান্তকণ্ঠে বলল, ঠিক আছে। আচ্ছা সরমা দেবী, দুষ্মন্তবাবুর মত পাত্রকে বাদ দিয়ে বিমলবাবু হঠাৎ প্রৌঢ় রাঘব সরকারের সঙ্গে শকুন্তলা দেবীর বিবাহ দেবেন স্থির করলেন কেন বলুন তো? কিছু অনুমান করতে পারেন?
না, অনুমান করতে পারি না কিন্তু কার কাছে শুনলেন এ-কথা?
শকুন্তলা দেবীর মুখে। কিরীটী বলে।
সে বলেছে আপনাকে এ কথা?
হ্যাঁ।
তা হলে সে নিশ্চয় একথা বলেছে, কেন তিনি ঐ কাজ করতে মনস্থ করেছিলেন!
না, সে-কথা তিনি স্পষ্ট করে কিছুই বলেন নি। কেবল বলেছেন, বিমলবাবু তাই স্থির করেছিলেন–
তা তো ঠিকই, তার ভাইঝি—ভাইঝির বিবাহ তিনি কার সঙ্গে দেবেন বা না-দেবেন সেটা সম্পূর্ণ তার ইচ্ছা–
কিন্তু আমি জিজ্ঞাসা করছিলাম, কেন তার অমন ইচ্ছাটা হল সে-সম্পর্কে কিছু আপনি জানেন কিনা?
ব্যাপারটা অনেকদিন আগে থাকতেই স্থির হয়েছিল শুনেছি—
কতদিন আগে?
বলতে পারব না।
আচ্ছা আপনার মত আছে এ বিবাহে?
আমার মতামতের কতটুকু মূল্য থাকতে পারে বলুন? কেউ তো নই আমি এদের!
তবু তো শুনেছি, আপনি শকুন্তলা দেবীকে একপ্রকার কন্যার মতই পালন করেছেন।
তা করেছি।
তবে?
কিন্তু তাই যদি বলেন তো পাত্র হিসাবে রাঘব সরকার নিন্দনীয়ই বা কি?
সে-কথা আমি বলি নি।, আমি বলছিলাম ওরা যখন পরস্পর পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট—
ক্ষমা করবেন, আমি এর বেশী কিছু জানি না।
ওঃ। আচ্ছা সরমা দেবী, এই রঞ্জন বোসকে আপনার কেমন মনে হয়?
নামটা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই যেন একটু চমক লক্ষ্য করলাম সরমার চোখেমুখে। কিন্তু সেও ক্ষণিকের জন্য।
পরমুহূর্তে সে যেমন শান্ত ছিল শান্ত হয়ে গেল।
আমার কথার জবাবটা এখনো পাই নি সরমা দেবী!
ওর সম্পর্কে বিশেষ কিছুই জানি না।
তবু যে কয়দিন ওকে দেখেছেন—
ও কারো সঙ্গেই বড় একটা কথা বলে না বা মেলামেশা করে না—
আপনিও কি সেই দলে?
অন্য রকম আমার বেলায় হবার কোন কারণ নেই।
ওকে আপনি পূর্বে কখনো দেখেছেন?
না–না।
আচ্ছা সরমা দেবী, আপনি এবারে যেতে পারেন।
চেয়ার থেকে উঠে ঘর ছেড়ে বের হয়ে গেল সরমা।
সরমা ঘর ছেড়ে চলে যাবার সঙ্গে সঙ্গে যেন একটা অদ্ভুত স্তব্ধতা ঘরের মধ্যে থমথম করতে থাকে।
কয়েকটা মুহূর্ত কেউ কোন কথা বলে না।
অবশেষে কিরীটীই সে স্তব্ধতা ভঙ্গ করে একসময় উঠে দাঁড়িয়ে বললে, এবারে আমি বিদায় নেব শিবেনবাবু!
হ্যাঁ চলুন, আমরাও উঠব।
কেবল একটা কথা শিবেনবাবু—
কি?
ঐ ঘরটা অর্থাৎ যে ঘরে বিমলবাবু নিহত হয়েছেন, তালা দিয়ে রাখবার ব্যবস্থা করবেন। কথাটা বলে আর দাঁড়ায় না কিরীটী, আমার দিকে তাকিয়ে বলে, চল্ সুব্রত।
দুজনে ঘর থেকে বের হয়ে গেলাম।
সিঁড়ি দিয়ে নেমে একতলায় আসতেই দেখা গেল সিঁড়ির ঠিক সামনেই রেলিং ধরে পাথরের মত দাঁড়িয়ে আছে শকুন্তলা।
শকুন্তলাকে সামনে দেখে কিরীটী দাঁড়াল, কিছু বলবেন মিস চৌধুরী?
মিঃ রায়! শকুন্তলা কিরীটীর মুখের দিকে চোখ তুলে তাকাল।
বলুন?
আপনি—মানে সত্যিই আপনার স্থির বিশ্বাস—
কি?
কাকা–কাকাকে সত্যিই কেউ হত্যা করেছে?
মনে হল কথাটা বলতে গিয়ে শকুন্তলার গলাটা যেন কেঁপে উঠল।
হ্যাঁ, সত্যি তাঁকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়েছে।
তবু কিন্তু শকুন্তলা পথ ছাড়ে না।
কিরীটী পুনরায় প্রশ্ন করে, আর কিছু বলবেন?
আপনি—আপনি কাউকে সন্দেহ করেছেন?
কিরীটী মুহূর্তকাল মনে হল যেন কি ভাবল, তারপর মৃদুকণ্ঠে বললে, আপনার ঐ প্রশ্নের জবাবে বর্তমানে কেবল এইটুকুই বলতে পারি মিস চৌধুরী, কোন অজ্ঞাত বা অপরিচিত ব্যক্তির হাতে তিনি নিহত হন নি!
তবে? যেন একটা অস্ফুট আর্তনাদ বের হয়ে এল শকুন্তলার কণ্ঠ চিড়ে।
যে তাকে হত্যা করেছে, সে তার অত্যন্ত পরিচিত কেউ। তাই—
তাই?
তাই শেষ মুহূর্তে ব্যাপারটা তার কাছে যেমন আকস্মিক তেমনি অভাবিতই ছিল হয়তো!
কি বলতে চান আপনি?
হত্যাকারী যখন তাকে হত্যা করবার জন্য সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল তিনি কল্পনাও করতে পারেন নি পরমুহূর্তেই ব্যাপারটা কি ঘটতে চলেছে! ইট ওয়াজ সো সাডেন! কিন্তু মিস চৌধুরী–
কি?
আপনি বোধ হয় একটু সতর্ক থাকলে ব্যাপারটা ঘটত না!
কি বললেন?
বলছিলাম ইউ অ্যাপ্রিহেণ্ডেড ইট—আপনি পূর্বেই ঐ ধরনের একটা কিছু যে ঘটবে বা ঘটতে পারে অনুমান করেছিলেন–
না বিশ্বাস করুন মিঃ রায়, আমি—
হ্যাঁ, আপনি সেটা অনুমান করতে পেরেছিলেন বলেই কাল আমার কাছে ছুটে গিয়েছিলেন!
না না—আমি—
কিন্তু কেন যে কাল সব কথা বললেন না শেষ পর্যন্ত তা আপনিই জানেন। বললে হয়ত আজকের এই দুর্ঘটনাটা না ঘটতেও পারত।
আপনি—আপনি বিশ্বাস করুন মিঃ রায়, যা আপনি বলছেন তার বিন্দুবিসর্গও আমি—
মিস চৌধুরী, বিয়ের ব্যাপারে চিন্তিত হয়ে যে কাল আপনি আমার কাছে ছুটে যান নি সে বিষয়ে আমি স্থিরনিশ্চিন্ত। কিন্তু কেন জানেন, মাত্র একটি কারণে—
একটি কারণে!
হ্যাঁ, একটি কারণে। আপনার আঙুলের ঐ আংটিটিই—
আংটি!
হ্যাঁ, আংটিটিই কাল আমাকে বলে দিয়েছিল আমার কাছে ছুটে যাবার যে কারণ আপনি দেখিয়েছেন তা মিথ্যা!
