মিঃ রায়!
কিন্তু আর নয়, এদিকে রাত প্রায় শেষ হয়ে এল। যদি সত্যিই কিছু আপনার বলবার থাকে তো কাল বিকেলের দিকে আমার বাড়িতে আসতে পারেন। আচ্ছা আসি নমস্কার—চলো সুব্রত।
কিরীটী কথাটা শেষ করেই দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
আমি তাকে অনুসরণ করলাম।
.
১২.
পরের দিন দ্বিপ্রহরে কিরীটীর বাড়িতে বসে আমি, কিরীটী ও শিবেন সোম তিনজনে মিলে বিমলবাবুর হত্যার ব্যাপার নিয়েই আলোচনা করছিলাম।
শিবেন সোম এসেছেন প্রায় ঘণ্টাখানেক হবে।
দ্বিপ্রহরের কিছু আগে হঠাৎ যেন কিছুটা হন্তদন্ত হয়েই শিবেন সোম এসে হাজির।
কিরীটী অত্যন্ত শিথিল ভঙ্গীতে বসে এক প্যাকেট তাস নিয়ে পেসেন্স খেলছিল একা একা।
আর আমি একটা রহস্য উপন্যাসের পাতায় ড়ুবেছিলাম।
হন্তদন্ত হয়ে শিবেন সোমকে ঘরে ঢুকতে দেখে দুজনেই আমরা মুখ তুলে তাকালাম। একই সঙ্গে যুগপৎ।
কি ব্যাপার, অত হাঁপাচ্ছেন কেন? কিরীটী শুধায়।
না, হাঁপাই নিসোফাটার উপর বসতে বসতে শিবেন সোম কথাটা বললেন।
নতুন কোন সংবাদ আছে বুঝতে পারছি, কিন্তু কি বলুন তো? কিরীটী আবার প্রশ্ন করে।
যে তালাটা গতকাল বিমলবাবুর শোবার ঘরের দরজায় লাগিয়ে এসেছিলাম—
শিবেন সোমের কথাটা শেষ হয় না, হাতের তাসগুলো সাফল করতে করতে একান্ত যেন নির্বিকার কণ্ঠেই কিরীটী জবাব দেয়, তালাটা খোলা—এই তো!
শুধু খোলাই নয় মিঃ রায়, তালাটা ভাঙা!
ও একই কথা হল।
আমি অবিশ্যি সঙ্গে সঙ্গে তালাটার গা থেকে ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেবার ব্যবস্থা করে এসেছি—
বেশ করেছেন। তবে পণ্ডশ্রমই করেছেন–
পণ্ডশ্রম মানে?
মানে আর কি, সকলের আঙুলের ছাপই হয়তো তাতে পাবেন ঐ বাড়ির একমাত্র খুনীটির বাদ দিয়ে–
কিন্তু–
শিবেনবাবু, একটা কথা আপনার জানা দরকার বলেই বলছি—খুনী অসাধারণ চালাক, শুধু তাই নয়, প্রতিটি স্টেপ তার সুচিন্তিত। এভরিথিং ওয়েলপ্ল্যান্ড্র–পূর্বপরিকল্পিত!
আপনি—আপনি কি তবে–
না শিবেনবাবু, হত্যাকারীর নাগাল এখনো আমি পাই নি। যতই আপনারা কিছু তথাকথিত অতিবোদ্ধা কিন্তু আসলে বঞ্চিত ও উন্নাসিকের দল আমাকে অদ্ভুত করিৎকর্মা বলে নিছক হিংসার জ্বালায় গাল পাড়ন না কেন, কিরীটী রায়ও মানুষ, দোষত্রুটি তারও আছে হয়তো অজ্ঞতা হেতু মধ্যে মধ্যে কথা বলতে গিয়ে দু-চারটে ভুল ইংরাজী শব্দেরও প্রয়োগ করতে পারে, কিন্তু তার মস্তিষ্কে সত্যিই কিছু না থাকলে যে এতদিন টিকতে না কথাটা—সত্যিই অত্যুক্তি নয়। যাক গে সেকথা, কাল থেকে একটা কথা ভাবছি–
কি বলুন তো?
আমাদের রঞ্জনবাবুর অতীত সম্পর্কে ইন-ডিটেইলস যতটা সম্ভব খবরটা আপনাদের ডিপার্টমেন্টের থু দিয়ে একটু সংগ্রহ করবার চেষ্টা করতে পারেন?
কেন পারব না! আজই বড়সাহেবকে বলে মালয়ে সংবাদ পাঠাবার চেষ্টা করছি সেখানকার পুলিস ডিপার্টমেন্টে–
হ্যাঁ, তাই করুন। আর—
আর?
রাঘব সরকার সম্পর্কেও একটু খোঁজখবর করুন।
তাও করব। কিন্তু আমি বলছিলাম, ঐ তালা ভাঙার ব্যাপারটা—
কিরীটী মৃদু হেসে বলে, তালা ভাঙার ব্যাপারটা দেখছি আপনি কিছুতেই ভুলতে পারছেন শিবেনবাবু!
না, আমি বলছিলাম হয়তো খুনীই—
কোন বিশেষ কারণে আবার তালা ভেঙে ঐ ঘরে ঢুকেছিল—এই কি?
হ্যাঁ, মানে–
অনুমানটা আপনার মিথ্যা নয় শিবেনবাবু। খুব সম্ভবত তাই। কিন্তু বিমলবাবুর হত্যারহস্যের কিনারা করতে হলে আপাততঃ আপনাকে যে অন্য দিকেও আর একটা দৃষ্টি দিতে হবে!
অন্য দিকে?
হ্যাঁ। বর্তমানে রহস্য-কাহিনীর নায়ক-নায়িকা–বলছিলাম তরুণ নায়ক ও তরুণী নায়িকা দুষ্মন্ত ও শকুন্তলার উপরে–
সে কি!
ভুলে যাচ্ছেন কেন, ওদের বয়সটাই যে বিশ্রী—তার উপরে রয়েছে একজনের প্রতি অন্যের আকর্ষণ, জানেন তো আকর্ষণেরই উল্টো দিক হচ্ছে বিকর্ষণ!
মিঃ রায়, আমি ঠিক আপনার কথাটা বুঝতে পারছি না—
সে কি মশাই! প্রথম যৌবনে কোন মেয়ের প্রেমে পড়েন নি নাকি?
কিরীটীর ঐ ধরনের আচমকা স্পষ্ট কথায় সহসা শিবেন সোমের মুখখানা লজ্জায় রাঙা হয়ে ওঠে। মুখটা উনি নীচু করেন।
কিরীটী হেসে ওঠে।
জংলী ট্রেতে করে চা নিয়ে ঘরে প্রবেশ করল।
চা-পান করতে করতেই কিরীটী বললে, ভাল কথা শিবেনবাবু, পোস্টমর্টেম হয়ে গেল?
ডাঃ রুদ্রকে বলেছি আজই যাতে পোস্টমর্টেমটা করে ফেলেন–
হ্যাঁ, ডাঃ রুদ্রের রিপোর্টটা না পাওয়া পর্যন্ত আমাদের ধারণাটা যে মিথ্যা নয় সেটা প্রমাণ করা যাবে না।
কাল-পরশুর মধ্যেই আশা করছি পেয়ে যাব। আচ্ছা মিঃ রায়—
শিবেন সোমের ডাকে তার দিকে মুখ তুলে তাকাল কিরীটী, কিছু বলছিলেন?
আমার কিন্তু ঐ রাঘব সরকার লোকটাকেই বেশী সন্দেহ হচ্ছে!
শুধু একা রাঘব সরকার কেন, সন্দেহ তো সে রাত্রে যারা যারা অকুস্থানে ঐ সময় উপস্থিত ছিলেন তাঁদের প্রত্যেকের উপরেই হওয়া উচিত।
কিন্তু–
হ্যাঁ শিবেনবাবু, ওঁরা কেউই সন্দেহের বাইরে যেতে পারছেন না। বিশেষ করে রাঘব সরকার, দুষ্মন্ত রায়, রঞ্জনবাবু, শকুন্তলা দেবী, সরমা দেবী–
কি বলছেন আপনি? সরমা দেবী, শকুন্তলা দেবী–
ভুলে যাবেন না শিবেনবাবু, নারীর মন শুধু বিচিত্রই নয়—এমন অন্ধকার বাঁকা গলিখুঁজি ওদের মনের মধ্যে থাকে যার হদিস এ জীবনেও কোনদিন আপনি পাবেন না
কিন্তু তাদের কি এমন মোটিভ থাকতে পারে বিশেষ করে সরমা দেবী ও শকুন্তলা দেবীর বিমলবাবুকে হত্যা করবার?
