ব্যাপারটা আদৌ হত্যা বলে মনে হয় না।
কেন?
আপনারা চেনেন না, কিন্তু আমার অধ্যাপককে দীর্ঘদিন ধরে আমি চিনতাম—তাকে কেউ হত্যা করবে তা যে কারণেই হোক আমার চিন্তা, বুদ্ধি, বিবেচনা বা যুক্তির বাইরে।
কিন্তু তবু তাকে হত্যা করাই যে হয়েছে আমরা জানি! দৃঢ়কণ্ঠে কিরীটী কথাটা বলে।
শুনেছি। তবু ঐ কথাই আমি বলব।
আচ্ছা দুষ্মন্তবাবু, আপনি যেতে পারেন। শিবেন সোম বললেন।
ধন্যবাদ।
দুষ্মন্ত রায় উঠে ঘর থেকে বের হয়ে যেতে উদ্যত হতেই কিরীটী তাকে কতকটা বাধা দিয়েই যেন পিছন থেকে ডেকে ওঠে, এক্সকিউজ মি, জাস্ট এ মিনিট দুষ্মন্তবাবু!
ঘুরে দাঁড়ায় দুষ্মন্ত রায় কিরীটীর দিকে তাকিয়ে।
আপনি নিশ্চয়ই জানেন দুষ্মন্তবাবু, শকুন্তলা দেবীকে মনোনীতা স্ত্রী হিসাবে রাঘব সরকার একটি আংটি দিয়েছেন এবং সে আংটিটি শকুন্তলা দেবীর আঙুলেই এখনো আছে!
না।
সে কি! জানেন না আপনি?
না।
দেখেনও নি?
না।
ওঃ। আচ্ছা আপনি যেতে পারেন।
দুষ্মন্ত রায় অতঃপর ঘর থেকে বের হয়ে গেল।
কিরীটী দুষ্মন্ত রায়ের গমনপথের দিকেই তাকিয়েছিল, দুষ্মন্ত রায়ের দেহটা দরজার ওপাশে অদৃশ্য হয়ে যাবার পর কিরীটী শিবেন সোমের দিকে ফিরে তাকাল, শিবেনবাবু!
কিছু বলছিলেন মিঃ রায়?
না, কিছু না বলছিলাম কেবল রাত অনেক হল, এবারে সরমা দেবীকে ডেকে যা জিজ্ঞাসা করবার করে আজকের পর্বটা তা হলে চুকিয়ে ফেলুন! ক্ষিদেটা তো থিতিয়েই গেল—ঘুমটাও না আজকের রাতের মত থিতিয়ে যায়!
মৃদু হেসে কথাটা বলতে বলতে কিরীটী এতক্ষণে পকেট থেকে একটা সিগার বের করে সেটায় অগ্নিসংযোগ করল।
শিবেন সোম সরমা দেবীকে ডাকবার জন্যই বোধ হয় ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন।
.
সরমা দেবীকে সঙ্গে নিয়েই মিনিট পাঁচেক পরে শিবেন সোম ঘরে এসে পুনঃপ্রবেশ করলেন।
বসুন সরমা দেবী, আপনাকে এ সময় বিরক্ত করতে হচ্ছে বলে আমরা দুঃখিত, কিন্তু উপায় নেই—
সরমা নিঃশব্দে খালি চেয়ারটার উপরে উপবেশন করল।
তাকালাম আমি মহিলাটির দিকে। এবং তার মুখের দিকে চেয়ে প্রথম দৃষ্টিতেই মনে হয়েছিল সেরাত্রে বিমলবাবুর গৃহে সরমার পরিচয় যাই হোক না কেন, সে যে এ-বাড়ির দাসী নয়—কথাটার মধ্যে এতটুকুও শকুন্তলার অত্যুক্তি ছিল না।
মাথার উপরে পরিধেয় সরু কালোপাড় ধুতির গুণ্ঠনটা আধাআধি টানা সাদা সিঁথি। অনবগুণ্ঠনটি বলা উচিত।
লম্বা দোহারা গড়ন দেহের। গাত্রবর্ণ উজ্জ্বল শ্যাম। চোখেমুখে কোন তীক্ষ্ণতা বা বুদ্ধির দীপ্তি নেই বটে তবে কোমলতা আছে। আর আছে যেন আত্মসমাহিতের একটি নিবিড়তা। সুডৌল দুটি হাতে একগাছা করে ক্ষয়ে যাওয়া সোনার রুলি আর গলায় সোনার সরু একটি বিচেহার। হাত দুটি কোলের উপরে রেখে বসেছিল সরমা নিঃশব্দে।
সরমা দেবী!
কিরীটীর ডাকে চোখ তুলে তাকাল সরমা। চোখের দৃষ্টিতে যেন একটু বিস্ময়।
দেবী বলে সম্বোধন করাতেই সে অমনি করে তাকিয়েছিল কিনা কে জানে!
এ বাড়িতে—মানে বিমলবাবুর এখানে আপনি অনেকদিন আছেন শুনলাম—
দৃষ্টি নত করল সরমা। কোন জবাব দিল না।
কত বছর হবে আন্দাজ?
অনেক দিন আছি আমি এখানে—
এতক্ষণে শান্ত মৃদু কণ্ঠে কথাগুলো উচ্চারিত হল।
আপনি এ বাড়িতে যখন অনেকদিন আছেন—এঁদের একপ্রকার পরম আত্মীয়ার মতই হয়ে গিয়েছিলেন ধরে নিতে পারি নিশ্চয়ই সরমা দেবী!
অনাত্মীয় হলেও এবং এঁদের সঙ্গে কোনপ্রকার সম্পর্কই আমার না থাকলেও, এঁরা বরাবর আমাকে স্নেহ ও ভালবাসা দিয়ে এসেছেন।
এঁরা মানে আপনি নিশ্চয়ই বলছেন অধ্যাপক বিমলবাবুর কথা ও তার ভাইঝি শকুন্তলা দেবীর কথা।
হ্যাঁ।
অবশ্যই সেটা তো স্বাভাবিক, কিন্তু আমি জিজ্ঞাসা করছিলাম—এঁদের সংসারের একজনের মত থেকে নিশ্চয়ই আপনি এঁদের পারিবারিক অনেক কথাই জানবার সুযোগ পেয়েছেন সরমা দেবী!
আপনাকে তো একটু আগেই বললাম, এঁদের পরিবারের মধ্যে থাকলেও আমি তো এঁদের কোন আপনজন নই—
এতক্ষণে বুঝতে পারি, চোখেমুখে সরমার বুদ্ধির দীপ্তি না থাকলেও ভদ্রমহিলা বুদ্ধিমতী। এবং শুধু বুদ্ধিমতীই নয়—নিরতিশয় সতর্ক।
কিরীটীও বোধ হয় উপলব্ধি করতে পেরেছিল ব্যাপারটা। তাই এবারে সোজাসুজিই প্রশ্ন করল, সরমা দেবী, এঁদের আপনি একজন আত্মীয় না হলেও নিশ্চয়ই জানেন দুষ্মন্তবাবুর সঙ্গে শকুন্তলা দেবীর একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল উভয়ের মেলামেশার ফলে?
অনুমান করেছি।
হুঁ। আচ্ছা বিমলবাবু নিশ্চয়ই সে কথা জানতেন?
অনুমান হয় জানতেন।
অনুমানের চাইতে বেশী কিছুই নয় আপনি বলতে চান কি?
যতটুকু আমি জানি তাই বলেছি। শান্ত কণ্ঠে জবাব এল।
১১-১৫. সরমা দেবীর শেষের কথায়
সরমা দেবীর শেষের কথায় মনে হল, কিরীটী মুহূর্তকাল যেন কি ভাবল। তারপর সহসা যেন দুপা এগিয়ে এল, চেয়ারে উপবিষ্টা সরমার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, আপনি মুখে স্বীকার না করলেও আমার কিন্তু ধারণা এ বাড়ির, বিশেষ করে বিমলবাবু ও তার ভাইঝির কোন কথাই আপনার অজানা নয়।
চোখ তুলে তাকাল নিঃশব্দে সরমা কিরীটীর মুখের দিকে।
হ্যাঁ, কারণ আপনার সম্পর্কে যেটুকু ইতিপূর্বে শকুন্তলা দেবীর কাছ থেকে জেনেছি, তাতে করে আমার অনুমান আপনি অনেক কিছুই জানেন।
দেখলাম নিঃশব্দে তখনো সরমা তাকিয়ে রয়েছে কিরীটীর মুখের দিকে।
হ্যাঁ, কিরীটী আবার বললে, আপনি হয়তো সব কথা বলতে ইচ্ছুক নন, অবশ্যই আপনি স্বেচ্ছায় না বললে আমি পীড়াপীড়ি করব না, কিন্তু আমি ভেবেছিলাম—
