কিন্তু কিছুক্ষণ দুষ্মন্ত রায়ের দিকে চেয়ে থাকলে মনে হবে ঠিক উল্টোটিই।
দুষ্মন্ত রায়ের চেহারার মধ্যে কোন একটা সহজগ্রাহ্য রূপ বা সৌন্দর্যের আকর্ষণ নেই সত্যি, কিন্তু এমন একটা বিশেষ অথচ চাপা আকর্ষণ আছে যা একবার নজরে পড়লে নজর ফিরিয়ে নেওয়া কষ্টসাধ্য। যেহেতু একবার সেই বিশেষত্ব কারো চোখে পড়লে সেটা মনের মধ্যে দাগ কেটে বসবেই—এবং সে রূপের বর্ণনাও দেওয়া যেমন দুঃসাধ্য, বোঝানোও বুঝি তেমনি কষ্টকর।
লোকটি লম্বা, কিন্তু দেহে ঠিক পরিমিত পেশী ও মেদ থাকার দরুন লম্বা মনে হয় না। দেহের রঙ কালো—যাকে বলে রীতিমত কালো। কিন্তু সেই কালো রঙের মধ্যেও যেন অদ্ভুত একটা দ্যুতি আছে। গাল দুটো ভাঙা। নাকটা খাড়া। প্রশস্ত ললাট। রেশমের মত একমাথা অযত্নবিন্যস্ত তৈলহীন লালচে চুল। দাড়িগোঁফ নিখুঁতভাবে কামানো।
পরিধানে ধুতি ও গেরুয়া রঙের খদ্দরের পাঞ্জাবি।
আপনার নাম দুষ্মন্ত রায়? শিবেন সোমই প্রশ্ন শুরু করলেন।
হ্যাঁ। মৃদুকণ্ঠে জবাব এল। এবং কণ্ঠস্বরে একটা আত্মপ্রত্যয় বা আত্মদৃঢ়তা যেন স্পষ্ট। সেই হেতুই বোধ হয় আবার দুষ্মন্ত রায়ের মুখের দিকে তাকালাম।
বসুন। শিবেন সোম বললেন।
দুষ্মন্ত রায় একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসলেন।
কি করেন আপনি?
বিমলবাবুর কাছে ডক্টরেটের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলাম।
এ বাড়ির সকলের সঙ্গেই আপনার বিশেষ ঘনিষ্ঠতা আছে দুষ্মন্তবাবু, তাই না? প্রশ্নটা করল কিরীটীই এবারে।
এ বাড়ির সকলকেই আমি চিনি। জবাব দিলেন দুষ্মন্ত রায়।
দুষ্মন্তবাবু! আবার কিরীটী প্রশ্ন করে।
বলুন?
কথাটা কি সত্যি যে, শকুন্তলা দেবীকে আপনি বিশেষ দৃষ্টিতে দেখেন এবং তিনিও আপনাকে দেখেন?
ঠিকই শুনেছেন। পরস্পর আমরা পরস্পরকে ভালোবাসি।
আপনার অধ্যাপক নিশ্চয়ই ব্যাপারটা জানতেন! কিরীটী আবার প্রশ্ন করে।
বলেছিলাম তাকে।
কি বলেছিলেন?
কুন্তলাকে আমি বিয়ে করতে চাই—
আপনার সে কথার কি জবাব দিয়েছিলেন তিনি? সম্মত হয়েছিলেন কি?
রাজী হন নি। প্রথমদিকে তার নীরব সম্মতিই ছিল, কিন্তু পরে কথাটা তুলতে কেন জানি না–
রাজী হন নি?
না। তবে রাজী তিনি না হলেও আমাদের কি এসে যাচ্ছে সে সাবালিকা, তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তিনি দাঁড়াতে পারেন না আইনত!
তাকে এ কথা বলেছিলেন নাকি?
না, প্রয়োজন বোধ করি নি।
আচ্ছা আপনি কি জানতেন, আপনার অধ্যাপকের ইচ্ছা ছিল শকুন্তলা দেবীকে তিনি রাঘব সরকারের সঙ্গে বিয়ে দেবেন?
শুনেছিলাম কথাটা। শকুন্তলাই আমাকে বলেছিল। কিন্তু তাতেই বা কি এসে গেল!
আচ্ছা শকুন্তলা দেবী কি আপনার সঙ্গে একমত?
না।
মানে–তার মত–
না, তার মত ছিল না। কাকা যতদিন বেঁচে আছেন তাঁর বিরুদ্ধে শকুন্তলার পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয় এই কথাই সে বলেছিল।
তা হলে বলুন আপনার পরিকল্পনাটা ভেঙে গিয়েছিল?
না, ভেঙে যাবে কেন? এইটুকুই শুধু বুঝেছিলাম, কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে—মানে বিমলবাবুর মৃত্যু পর্যন্ত
কিন্তু দুষ্মন্তবাবু, আপনার অধ্যাপক হঠাৎ রাঘব সরকারের সঙ্গেই বা শকুন্তলা দেবীর বিয়ে দেবার জন্য স্থিরপ্রতিজ্ঞ হয়েছিলেন কেন? কিছু শুনেছিলেন সে-সম্পর্কে কখনো কারো
কাছে?
না।
শকুন্তলা দেবীও আপনাকে কিছু বলেন নি?
না।
আচ্ছা রাঘব সরকারের সঙ্গে আপনার পরিচয় আছে নিশ্চয়ই?
না।
কিন্তু এ বাড়িতে তো আপনাদের দুজনেরই যাতায়াত ছিল, সেক্ষেত্রে তো পরস্পর আপনাদের দেখা-সাক্ষাৎ হওয়াটা–
দেখা হবে না কেন—বহুবার হয়েছে!
তবে?
কেন যেন লোকটাকে আমার ভাল লাগে না—
লোকটাকে আপনার ভাল লাগত না?
না।
কিন্তু একটু আগে তার সঙ্গে, সামান্যক্ষণের জন্য হলেও, আলাপ করে তো আমাদের ভালই লাগল। তবে আপনার
তবে আমার কেন ভাল লাগে না লোকটাকে, এই তো আপনার প্রশ্ন? দেখুন কাউকে কারো ভালো লাগালাগির ব্যাপারটা একান্তই ব্যক্তিগত নয় কি? এবং তার জন্য কি সর্বক্ষেত্রেই কোন কারণ থাকে বা থাকতেই হবে-এমন কোন কথা আছে?
দুষ্মন্ত রায়ের কথা বলার ভঙ্গির মধ্যে এমন একটা বিশেষত্ব ছিল যে পুনরায় তার মুখের দিকে আপনা হতেই যেন দৃষ্টি আমার আকর্ষণ করে।
মনে হল মুখের কোথাও হাসি না থাকলেও, তার দুই চোখের দৃষ্টিতে একটা চাপা হাসির বিদ্যুৎ যেন খেলছে। এবং বলাই বাহুল্য, ব্যাপারটা যে কিরীটীর প্রখর দৃষ্টিকে এড়িয়ে যায় নি—তার পরবর্তী কথাতেই সেটা আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়।
কথাটা সত্যিই আপনি মিথ্যা বলেন নি দুষ্মন্তবাবু! নইলে দেখুন না, ভাগ্যে মনের অগোচরে পাপ নেইনচেৎ পাশাপাশি দিনের পর দিন আমাদের কত বন্ধু, সুহৃদ ও পরিচিত জনের পক্ষেই বাস করাটা অসম্ভব হয়ে উঠত, তাই নয় কি?
চেয়ে ছিলাম তখন আমি একদৃষ্টে দুষ্মন্ত রায়েরই মুখের দিকে।
মনে হল কিরীটীর ঐ কথায় মুহূর্তের জন্য যেন দুষ্মন্তর দুই চোখের তারায় বিদ্যুৎ ঝিলিক দিয়ে গেল, অথচ সমস্ত মুখখানা মনে হল ভাবলেশহীন, একান্ত নিস্পৃহ।
দুষ্মন্তবাবু! আবার প্রশ্ন করে কিরীটী, আজ নিশ্চয়ই এখানে আপনিও নিমন্ত্রিতদের মধ্যেই একজন ছিলেন?
হ্যাঁ।
দেরিতে এসেছেন একটু শুনলাম?
হ্যাঁ, একটা কাজে আটকা পড়েছিলাম—
তা হলে আর আপনাকে কি জিজ্ঞাসা করব আজকের ব্যাপারে! কথাটা বলেই একটু যেন থেমে আবার প্রশ্ন করে, আচ্ছা দুষ্মন্তবাবু, আজকের এই দুর্ঘটনাটা আপনার ঠিক কি বলে মনে হয়? মানে বলছিলাম, আপনার অধ্যাপকের হত্যার ব্যাপারটা
