কিন্তু–
শিবেনবাবু, রাঘব সরকারের মত একজন লোকের সঙ্গে বিমলবাবুর মত একজন লোকের এতদূর ঘনিষ্ঠতা—ব্যাপারটা যেন কিছুতেই আমার মন মেনে নিতে পারছিল না! এবং সত্যি কথা বলতে কি, সহজভাবে যে ব্যাপারটা সম্ভব নয়—এবং তাই সেই গোলকধাঁধা থেকে বেরুবার জন্যই ঐভাবে ঢিলটি আমি ছুঁড়েছিলাম! যাক, এখন আমি নিশ্চিন্ত—অনেক জটিলতাই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে।
জটিলতা?
হ্যাঁ। কিন্তু রাত সাড়ে এগারোটা বেজে গিয়েছে, আপনার তদন্ত-পর্ব এবারে সত্যি সত্যিই শেষ না করলে যে রাত পুইয়ে যাবে!
.
০৯.
এবারে রঞ্জন বোসকে ডাকা হল।
বয়েস ভদ্রলোকের চব্বিশ থেকে পঁচিশের মধ্যেই বলে মনে হয়। দোহারা চেহারা, গায়ের রঙটা একটু চাপা। চোখে মুখে বেশ একটা বুদ্ধির দীপ্তি রয়েছে। দাড়িগোঁফ নিখুঁতভাবে কামানো। চোখে সোনার ফ্রেমের চশমা। হাতে সোনার রিস্টওয়াচ। পরিধানে দামী গ্রে কলারের গ্যাবার্ডিনের লংস ও সাদা সার্কস্কিনের হাওয়াই সার্ট।
ভদ্রলোক যে শৌখীন প্রথম দৃষ্টিতেই বোঝা যায়।
শুনেছেন বোধহয় রঞ্জনবাবু, কিরীটীই প্রশ্ন শুরু করে, আপনার মামার মৃত্যুটা স্বাভাবিক নয়—কেউ তাঁকে হত্যা করেছে।
শুনেছি—আপনাদের তাই ধারণা, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি না।
বিশ্বাস করেন না?
না।
কেন বলুন তো?
কেন আবার কি? মামার মত নিরীহ একজন ভদ্রলোককে কার আবার হত্যা করবার প্রয়োজন হতে পারে?
ওকথা বলবেন না রঞ্জনবাবু, প্রয়োজন যে কার কখন কিসের হয় কেউ কি বলতে পারে! কিন্তু যাক সে কথা, আপনি তাহলে কথাটা শুনেছেন?
হ্যাঁ।
কিন্তু কার মুখে শুনলেন কথাটা?
কার মুখে!
হ্যাঁ।
তা—তা ঠিক মনে নেই, তবে কানাঘুষা শুনছিলাম ভিতরে—
হুঁ। আচ্ছা রঞ্জনবাবু, মালয় থেকে হঠাৎ আপনি চলে এলেন কেন?
মালয়ের কথাটা যখন শুনেছেন, তখন নিশ্চয় এও শুনেছেন কেন সেখান থেকে চলে আসতে বাধ্য হয়েছি!
হ্যাঁ শুনেছি—তবু আপনার মুখ থেকে শুনতে চাই।
কি ঠিক শুনতে চান বলুন?
আপনার বাবার ব্যবসাটা হঠাৎ ফেল করল কি করে?
বাবার নিজের গাফিলতির জন্য!
কি গাফিলতি?
সে-সব শুনে কি করবেন?
টাকার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবনে অনেক রকম সমস্যা এসে দেখা দেয়—সেই সব আর কি!
ওঃ, আচ্ছা রঞ্জনবাবু, মালয়ে থাকতে আপনার মামা বিমলবাবুর সঙ্গে নিশ্চয়ই আপনাদের নিয়মিত চিঠিপত্র চলতো?
চলতো বৈকি। যাকে বলে–বাবার মামার সঙ্গে রেগুলার চিঠিপত্র চলতো।
তাহলে আপনাদের পরস্পরের মধ্যে যোগাযোগ ছিল?
নিশ্চয়ই।
রঞ্জনবাবু, আপনার মামাকে হত্যা করার ব্যাপারটা কি মনে হয়? কাউকে সন্দেহ করেন কি?
না মশাই, সন্দেহ করব কি, শোনা অবধি তো যাকে বলে একেবারে তাজ্জব বনে গিয়েছি!
ভাল কথা রঞ্জনবাবু, রাঘব সরকারের সঙ্গে তাণনার বোন শকুন্তলা দেবীর বিয়ের কথা কিছু শুনেছিলেন?
এখানে এসেই তো শুনেছি—
আপনার সমর্থন ছিল ব্যাপারটায়?
আদপেই না। মামাকে সে কথা বলেছিও, কিন্তু মামা অ্যাডামেন্ট-কারো কথাই শুনবেন না!
বলতে পারেন, তা আপনার মামাই বা এ ধরনের বিয়েতে কেন জিদ করছিলেন?
কে জানে মশাই কেন—তাছাড়া মামা যদি বিয়ে দিতে পারেন আর শকুন্তলা যদি বিয়ে করতে পারে তো আমার কি বলুন!
দুষ্মন্ত রায়কে শকুন্তলা দেবী মনে মনে ভালবাসেন, আপনি জানেন?
তা জানতাম।
জানতেন?
হুঁ। শকুন্তলাই তো আমাকে কথাটা বলেছিল।
তাই বুঝি! তা দুষ্মন্ত রায়কে আপনার কেমন লোক বলে মনে হয় রঞ্জনবাবু?
এমনি মন্দ লোক নয়, তবে এক নম্বরের কাওয়ার্ড! ভীতু—
ভীতু?
নয় তো কি—ভালবাসতে পারিস, আর জোর করে যাকে ভালবাসিস তাকে বিয়ে করতে পারিস না!
তা সত্যি। আচ্ছা রঞ্জনবাবু, আপনি তো আপনার মামা যে ঘরে থাকতেন তার পাশের ঘরেই থাকেন!
হ্যাঁ।
ইদানীং রাঘব সরকার রাত্রে এলে আপনার মামার ঘরে দরজা বন্ধ করে তাদের মধ্যে কি সব কথাবার্তা হতো কখনো শুনেছেন কিছু?
না মশাই। তবে—
তবে?
একটা ব্যাপার ইদানীং লক্ষ্য করে কেমন যেন আশ্চর্যই লাগছিল।
কি?
মামা যেন রাঘব সরকারের কাছে কেমন কেঁচোটি হয়ে থাকতেন।
হুঁ। আচ্ছা রাঘব সরকার লোকটিকে আপনার কি রকম মনে হয় রঞ্জনবাবু?
একটি বাস্তুঘুঘু।
বাঃ, বেশ বলেছেন! সত্যি আশ্চর্য, জন্মাবধি আপনি মালয়ে থেকেও এমন চমৎকার বাংলা দেশের প্রবচনগুলো আয়ত্ত করেছেন! সত্যিই আপনার তারিফ না করে পারছি না।
অ্যাঁ, কি বললেন? যেন একটু থতমত খেয়েই কথাটা বলেন রঞ্জনবাবু।
না, কিছু না। আচ্ছা রঞ্জনবাবু, সরমা দেবী তো এ বাড়িতে অনেক দিন আছেন, তাই?
সেই রকমই তো শুনেছি।
আচ্ছা তার সম্পর্কে আপনার কি ধারণা?
ওসব স্ক্যাণ্ডেলাস অ্যাফেয়ার নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি নাই বা করলেন মশাই—
স্ক্যাণ্ডেলাস অ্যাফেয়ার!
নয় তো কি–ওসব হচ্ছে ড়ুবে ড়ুবে জল খেয়ে একাদশী করা! ও ঢাক-ঢাক গুড-গুড করলে কি হবে—ব্যাপারটা তো আর জানতে কারো বাকী নেই!
কথাটা খুলেই বলুন না।
না মশাই, মরে গেলেও গুরুজন ব্যক্তি তোপাপ-কথা আর এ-মুখে না-ই উচ্চারণ করলাম!
হুঁ, আচ্ছা থাক থাক।
.
১০.
রঞ্জন বোসকে বিদায় দেবার পর কিরীটীর ইচ্ছাক্রমেই ডাকা হল এবারে দুষ্মন্ত রায়কে।
গত সন্ধ্যায় দুষ্মন্ত রায়ের চেহারার বর্ণনাপ্রসঙ্গে শকুন্তলা বলেছিল রাঘব সরকারের চেহারার সঙ্গে তুলনায় নাকি দুষ্মন্ত রায় আদৌ আকর্ষণীয় নয়। কথাটা যে মিথ্যে নয় প্রথম দৃষ্টিতে তাই মনে হবে সত্যিই।
