কিন্তু সেটা কি এখন আবার সম্ভব হবে? বিকাশ প্রশ্ন করে।
কেন হবে না? বর্তমানে এই রাজবাড়ির হত্যা-রহস্যের তদন্ত-ব্যাপারকে কেন্দ্র করে আবার নতুন করে সেই শুরু হতে জবানবন্দি শুরু করে ধীরে ধীরে আমাদের ফিরে যেতে হবে বর্তমান রহস্যের মূলে—সেই ভুলে যাওয়া পুরনো কাহিনীতে এবং সেটাই আমার বর্তমানের উদ্দেশ্য।
কিরীটী আবার একটু থেমে বলে, পৃথিবীতে যত প্রকার অন্যায় ও পাপানুষ্ঠান দেখা যায়, সেগুলোর মূলে অনুসন্ধান করলে দেখা যায় সবই প্রায় মানুষের কোন-না-কোন বিকৃত কল্পনার দ্বারা গড়ে ওঠে। মানুষের কল্পনা থেকেই যেমন জন্ম নেয় শ্রেষ্ঠ কাব্য কবিতা ও সাহিত্য, তেমনি কল্পনা থেকেই আবার জন্ম নেয় যত প্রকার ভয়ঙ্কর পাপ ও অন্যায়। কেউ পাপ করে অর্থের লোভে, কেউ প্রতিহিংসায়, কেউ বা অবার বিকৃত আনন্দানুভূতির জন্য। শেষোক্ত ধরনকেই আমরা বলি অ্যাবনরমা্যাল। রায়পুরের হত্যারহস্যকে বিশ্লেষণ করলে দেখতে পাই তার মূলে ১নং হচ্ছে অর্থের লোভ, ২নং খুনের নেশা। এবং যে বা যারা খুন করেছে, সেই খুনীর পক্ষে সেই নেশা এমন ভয়ঙ্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, খুনী এখন তার নিজের যুক্তির বাইরে। ৩নং এ পৃথিবীতে অনেক সময় দেখা গেছে, আমরা আমাদের কোনো বিশেষ কাজের দ্বারা কারও ভাল করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত তার মন্দ বা খারাপটাই করি। এবং সেটা যে সময় সময় মানুষের জীবনে কত বড় বিয়োগান্ত ব্যাপার হয়ে দেখা দেয়, তা ভাবলেও হতবুদ্ধি হয়ে যেতে হয়। তাছাড়া এক্ষেত্রে কি হয়েছে জানিস, ঐ যে কথায় বলে না, খাচ্ছিল তাঁতী তাঁত বুনে,কাল হল তার হেলে গরু কিনে—এও হয়েছে কতকটা তাই!
সব্রত অবাক বিস্ময়েই কিরীটীর আজকের কথাগুলো শুনছিল। এ কথা অবিশ্যি ও ভাল ভাবেই জানে, মাঝে মাঝে কিরীটী এমন ধরা-ছোঁয়ার বাইরেই চলে যায়। সেই সময় সামান্য একটু বিশদভাবে বুঝিয়ে বললেই হয়ত সব বোঝা যায়, কিন্তু নিজেকে কেমন যেন একটা রহস্যের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন করে অস্পষ্ট করে তুলতে সে যেন একটা অপূর্ব আনন্দ উপভোগ করে। এবং সে ক্রমে এমন অস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে শেষটায় মনে হয়, সে বুঝিবা যা খুশি আবোলতাবোল বকে যাচ্ছে। সুব্রত দু-একবার ইতিপূর্বে কিরীটীকে সেকথা বলেছেও, কিরীটী তার স্বভাবসুলভ মৃদু হাস্যের সঙ্গে বলেছে, যখন কোনো রহস্য নিয়ে কারবার করছ, তখন নিজেও রহস্যময় হয়ে ওঠা চাই এবং তা যদি হতে পার, তাহলেই সেই রহস্যটাকে উপভোগ করতে পারবে। কখনও ভুলে যেও না যে তুমি একজন রহস্যভেদী। তুমি বুদ্ধিমান, বুদ্ধির খেলায় অবতীর্ণ হয়েছ—সাধারণের চাইতে তুমি অনেক ওপরে। এ শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, এ বুদ্ধির প্রতিযোগিতা।
২.০২ নৃসিংহগ্রাম
পরের দিন প্রত্যুষেই সুব্রত সাইকেলে নৃসিংহগ্রামের দিকে রওনা হয়ে গেল। কিরীটী আর একটা দিন সুব্রতর ওখানে একা একা থাকবে না এবং সেটা ভালও দেখায় না, অনেকেরই হয়ত সন্দেহের উদ্রেক করবে, তাই বিকাশের ওখানে গিয়েই উঠল। ঠিক হল সুব্রত নৃসিংহগ্রাম থেকে ফিরে এলে অবস্থা বিবেচনা করে যা হোক তখন একটা ব্যবস্থা করলেই হবেখন। রায়পুর থেকে নৃসিংহগ্রাম প্রায় আটত্রিশ-ঊনচল্লিশ মাইলের কিছু বেশী হবে। যানবাহনের মধ্যে এক গরুরগাড়ি, প্রায় দু-তিন দিনেরও বেশী পথ, তাছাড়া রায়পুর থেকে ট্রেনে চেপে দুটো স্টেশন পরে ছোট একটা স্টেশনে নেমে মাইল চোদ্দ-পনের ঘোড়ায় চেপেও যাওয়া যায়। শেষোক্ত উপায়েই বেশীর ভাগ সকলেনৃসিংহগ্রামে যাতায়াত করে। বিশেষ করে রায়পুরের রাজবাড়ির লোকেরা। গরুর গাড়ি যাতায়াতের জন্য যে পথটা আছে, সেটা একটা অপরিসর কাঁচা রাস্তা, মাইল পনের-ষোল গেলেই ঘন শালবন। প্রায় পাঁচ-ছ মাইল লম্বা শালবন পেরুলেই দুর্ভেদ্য জঙ্গল; জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে সরু একটা রাস্তা চলে গেছে। রাজাবাহাদুর যখন নৃসিংহগ্রামে যান, মোটরে চেপে ঐ রাস্তা দিয়েই যান। জঙ্গলের মধ্য দিয়ে যে পাঁচ-ছ মাইল রাস্তা, ঐ রাস্তাটা যেমন বিপদসংকুল তেমনি দুর্গম।
জঙ্গল পার হলে, মাইল পনের-ষোল গিয়ে এদের—মানে রায়পুর স্টেটের একটা ছোটখাটো শালকাঠের কারখানা আছে। সেখানে শালবন থেকে গাছ কেটে এনে কাঠ চেরাই ইত্যাদি হয়। তারপর সেখান থেকে গরুরগাড়িতে চাপিয়ে দূরবর্তী রেল স্টেশনে চালান দেওয়া হয়। কাঠের কারখানা থেকে নৃসিংহগ্রামটির দূরত্ব প্রায় মাইলখানেক হবে। স্টেটের যতগুলো মহাল আছে, তার মধ্যে নৃসিংহগ্রামই হচ্ছে শ্রেষ্ঠ।
জায়গাটি দৈর্ঘ্যেও প্রস্থে মাইল দুয়েকের বেশী হবে না। চারপাশে ছোট ছোট পাহাড়। ছোট একটি পাহাড়ী নদী আছে, তার উৎস ওরই একটি পাহাড়ের বুক থেকে নেমে আসা ঝর্ণা থেকে।
আর আছে পাহাড়ের উপরে ছোট একটি গুহার মধ্যে পাথরের তৈরী একটি নৃসিংহদেবের মূর্তি। সেইজন্যই জায়গাটির নাম নৃসিংহগ্রাম হয়েছে। স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্যে ধারণা যে নৃসিংহদেবের মূর্তিটি নাকি অত্যন্ত জাগ্রত। প্রতি শনিবার সেখানে সকলে পুজো দিয়ে আসে। তাছাড়া চৈত্র-পূর্ণিমাতে খুব ধুমধাম করে একবার পুজা হয়। সে-সময় সেখানে ছোটোখাটো একটা মেলাও বসে। স্থানীয় অধিবাসীরা বেশীর ভাগই সাঁওতাল ও বাউরী। দু-চার ঘর পাহাড়ীও আছে। বেশীর ভাগ লোকই স্টেটের শালকাঠের কারখানায় কাজ করে জীবিকানির্বাহ করে। সামান্য চাষ-আবাদও আছে। স্থানটি অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর। সেইজন্যেই হয়ত সুদূর অতীতে কোনো একসময় রাজাদের কোনো পূর্বপুরুষ এখানে স্থানীয়ভাবে বসবাস করবার ইচ্ছায় প্রকাণ্ড একটি প্রাসাদ তৈরী করেছিলেন। বহুদূর থেকে প্রাসাদের চূড়া দেখা যায়। প্রাসাদটি মুসলমানের আমলের স্থাপত্যশিল্পের নিদর্শন দেয়। শ্ৰীকণ্ঠ মল্লিকের পিতাও বৎসরের মধ্যে অন্তত তিন-চার মাস নৃসিংহগ্রামের প্রাসাদে এসে কাটিয়ে যেতেন। শ্রীকণ্ঠ মল্লিকের সময় হতেই সে নিয়মের ব্যতিক্রম শুরু হয়। তারপর শ্রীকণ্ঠ মল্লিকের ও সুধীনের পিতার মৃত্যুর পর আর বিশেষ কেউ একটা নৃসিংহগ্রামের প্রাসাদে এসে দু-একদিনের বেশী কাটায়নি। প্রাসাদের এক অংশে এখন কাছারীবাড়ি করা হয়েছে।
