কিরীটীকে যেন আজ বলার নেশায় পেয়েছে, সে আবার বলে চলে, সতীনাথ লাহিড়ীর মৃত্যু—এটাও খুব আশ্চর্যের কিছু নয়। কারণ সুহাসের মৃত্যু ঘটানোর ব্যাপারে সতীনাথ ছিল খুনীর দক্ষিণ হস্ত এবং সমস্ত ব্যাপারটাই সুপরিকল্পিত চমৎকার একটা ষড়যন্ত্র। কোথাও তার এতটুকু গলদও খুনী বা চক্রান্তকারীরা রাখতে চায়নি। অবিশ্যি তোকে আগেও বলেছি, এখনও বলছি, সুহাসের নৃশংস হত্যার ব্যাপারের আসল মেঘনাদ বা পরিকল্পনাকারী, সেবার যেমন প্রমাণের অভাবে ধরা-ছোঁয়ার বাইরেই থেকে গিয়েছিল, এবারও প্রমাণ যোগালেও তেমনিই হয়ত থেকে যাবে। কারণ সে কেবল যুগিয়েছে পরিকল্পনাটুকু। অর্থাৎ কেমন করে কি উপায়ে সুহাসকে এ পৃথিবী থেকে সকলের সন্দেহ বাঁচিয়ে সরিয়ে ফেলতে পারা যাবে! চতুর-চূড়ামণি সে। কিন্তু এত করেও সে ফাঁকি দিতে পারে নি দুজনের চোখকে—আমার ও আর একজনের। অথচ দুভাগ্য এমন, সেই দ্বিতীয়জন পারলেও আমি পারব না তাঁকে ফাঁসাতে এই তদন্তের ব্যাপারে, সেইটাই আমার সব চাইতে বড় দুঃখ থেকে যাবে হয়ত চিরদিন।
তবে সেই দ্বিতীয় ব্যক্তির সাহায্য নিলেই তো হয়! সুব্রত উৎসুক কণ্ঠে বলে।
তা আজ আর সম্ভব নয়। সেইখানেই তো সব চাইতে বড় মুশকিল।
সম্ভব ময় কেন?
এমন সময়ে ঘরের বাইরে বিকাশের কণ্ঠস্বর শোনা গেল, কল্যাণবাবু আছেন নাকি?
কে, বিকাশবাবু নাকি! আসুন, আসুন!
বিকাশ এসে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করল।
দিনের আলো একটু একটু করে নিভে আসছিল, দিনশেষের ঘনায়মান ম্লান স্বল্পালোকে ঘরখানিও আবছা হয়ে আসছে।
থাকোহরি, একটা বাতি দিয়ে যা! সুব্রত চিৎকার করে বলে।
যাই বাবু, পাশের ঘর থেকে থাকোহরির কণ্ঠস্বর শোনা গেল।
বসুন বিকাশবাবু, সুব্রত আহ্বান জানালে।
বিকাশবাবু ঘরের আবছা অন্ধকারে কিরীটীর দিকে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছিল।
আমার বন্ধু কিরীটী রায়, আর ইনি এখানকার থানা-ইনচার্জ বিকাশ সান্যাল। সুব্রত পরিচয় করিয়ে দেয়।
কে, কিরীটীবাবু? নমস্কার নমস্কার। কবে এলেন? আজই বোধহয়! আনন্দ ও শ্রদ্ধা যেন বিকাশের কণ্ঠে মূর্ত হয়ে ওঠে একসঙ্গে।
কিরীটী মৃদুস্বরে জবাব দেয়, হ্যাঁ,নমস্কার মিঃ সান্যাল।
থাকোহরি একটা লণ্ঠন নিয়ে এসে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করল। ঘরের অন্ধকার দূরীভূত হল।
কিরীটীবাবু, আপনার কথা আমি অনেক শুনেছি, সাক্ষাৎ-আলাপের সৌভাগ্য আজও পর্যন্ত আমার হয়নি যদিও।
কিরীটী প্রতুত্তরে মৃদু হাসল মাত্র।
যা হোক, আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে ওদের কথাবার্তা আবার জমে ওঠে।
কিরীটী অবার একসময় বলতে থাকে, সুব্রত, তুই এখানে আসবার পর আমাকে আরও দু-একবার একাই জাস্টিস্ মৈত্রের বাড়ি যেতে হয়। এবং এ-কথা হয়ত তোর নিশ্চয়ই মনে আছে, মামলার সময় একদিন মামলার জেরায় প্রকাশ পায়, সুহাস সেদিন ৩১ শে ডিসেম্বর রায়পুরে রওনা হয়, সেদিন নাকি সুধীন সুহাসকে একটা অ্যানটিটিটেনাস ইজেকশন দিয়েছিল। জবানবন্দিতে সুধীন বলেছিল, আগের দিন নাকি কলেজে ক্রিকেট খেলতে গিয়ে ব্যাটের আঘাত লেগে সুহাসের ডান পায়ে হাঁটুর কাছে অনেকটা কেটে যায়। তাছাড়া একবার সুহাস টিটেনাস রোগে ভুগেছিল। তাই সাবধানের জন্যও, টিটেনাস রোগের প্রতিষেধক হিসাবে, সুধীন সুহাসকে একটা অ্যানটিটিটেনাস ইনজেকশন দেওয়ার সময় নাকি হঠাৎ মালতী দেবী ও সুবিনয় মল্লিক এসে ঘরে প্রবেশ করেন। মালতী দেবীই প্রশ্ন করেন, ও কিসের ইজেকশন আবার নিচ্ছিস! তাতে সুহাস কোনো জবাব দেয় না। পরে মামলার সময় আদালতে ঐ কথা উঠলে, সুধীনকে জিজ্ঞাসা করায় সুধীন জবাব দেয়, হ্যাঁ, তাকে সে একটা অ্যানটিটিটেনাস ইজেকশন দিয়েছিল বটে ৩১শে ডিসেম্বর। কিন্তু পরে এমন কোনো কথাই প্রমাণ হয়নি যে সুহাস তার আগের দিন ক্রিকেট খেলতে গিয়ে আহত হয়েছে। ঐদিন সুহাসের সঙ্গে খেলার মাঠে যারা ছিল, তারাও কেউ জানে না সুহাস কোনোরকম আঘাত পেয়েছিল কিনা। এমন কি স্বয়ং মালতী দেবী পর্যন্ত সে সম্পর্কে কিছু বলতে পারেননি। বিপক্ষের উকিলের মতে, সত্যই যদি সুহাসকে প্লেগের বীজাণু ইজেক্ট করে মারা হয়ে থাকে, তাহলে সুধীনই নাকি ঐ সময় সেটা সুহাসের শরীরে অ্যানটিটিটেনাসের সঙ্গে ইনজেক্ট করেছিল।
সর্বনাশ, এ তো আমি জানতাম না। বিকাশ বলে।
কেন, ঐটাই তো সুধীনের বিপক্ষে সর্বাপেক্ষা বড় প্রমাণ। সুব্রত বললে।
এবং ঐ ব্যপারটাই ভাল করে যাচাই করবার জন্যই আমি জাস্টিস্ মৈত্রের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। সুধীন তার জবানবন্দিতে যা বলেছে, সেটাও তার বিরুদ্ধেই গেছে। সে বলেছে, সেদিনই সন্ধ্যায় সুহাসের কাছে ও জেনেছিল, সুহাস ক্রিকেট খেলতে গিয়ে নাকি আহত হয়েছে এবং তখুনি সে তাকে অ্যানটিটিটেনাস ইনজেকশন দিতে চায়। তাতে নাকি সুহাস আপত্তি করে। কিন্তু পরের দিন স্বেচ্ছায় সুধীন একটা অ্যানটিটিটেনাস সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে তাকে অনেকটা জোর করে ইজেকশন দেয়। আগের দিন সন্ধ্যায় খেলার মাঠ হতে ফেরবার পথেই নাকি সুহাস হসপিটালে গিয়েছিল গাড়ি করে। অথচ ড্রাইভার সেকথা অস্বীকার করে, সে বলে, সুহাস সোজা নাকি বাড়িতেই চলে আসে। কথায় বলে, দশচক্রে ভগবান ভূত-এর বেলাতেও হয়ত তাই হয়েছে কিন্তু আমার বিশ্বাস এবং জাস্টিস্ মৈত্রেরও বিশ্বাস, ড্রাইভার এক্ষেত্রে মিথ্যা কথা বলেছে। প্রমাণ করতে হলে অবিশ্যি আমাদের প্রমাণ করতে হবে, সত্যিই সে ৩১শে ডিসেম্বর সুহাসকে অ্যানটিটিটেনাস ছাড়া অন্য কিছু ইনজেকশন দেয়নি! আমার নিজের এখানে আসবার অন্যতম কারণও তাই। জেরা করবার সময় আদালত একজনকে কয়েকটি অতি আবশ্যকীয় প্রশ্ন করতে ভুলে গেছে, সেটা আমি এখন জিজ্ঞাসা করতে চাই। আসলে মৃত পাবলিক প্রসিকিউটার রায়বাহাদুর গগন মুখার্জীর মৃত্যুতে মামলাটা সব আদ্যপান্ত ওলটপালট হয়ে গেছে। সাজানো দাবার ছক উলটে দিয়ে আবার নতুন করে ছক সাজানো হয়েছিল। ফলে নিদোষীর হল সাজা, আর দোষী পেল মুক্তি।
