এখানকার নায়েব বা ম্যানেজার শিবনারায়ণ চৌধুরী নিজের ইচ্ছায় যতটা করেন সেই মতই সব হয়। শিবনারায়ণের কোনো কাজের সমালোচনা রাজাবাহাদুর স্বয়ংও কোনোদিন করেন না।
সুব্রত কতকটা ইচ্ছা করেই ট্রেনে না গিয়ে সাইকেলে চেপে রওনা হয়েছিল। আটত্রিশ-ঊনচল্লিশ মাইল পথ এমন বিশেষ কিছুই নয়। তাছাড়া যেতে যেতে চারপাশ ভাল করে দেখতে দেখতেও যাওয়া যাবে। আসবার সময় রাজবাড়ি থেকে বন্দুক দিতে চেয়েছিল, কিন্তু সুব্রত মৃদু হেসে প্রত্যাখ্যান করে এসেছে। সঙ্গে এনেছে একটা সাত সেলের হান্টিং টর্চ, একটি বড় দোলা ছুরি, একটা দড়ির মই ও সামান্য টুকিটাকি নিত্যপ্রয়োজনীয় কয়েকটা জিনিসপত্র। প্রথম দিকে বেশ একটু বেগের সঙ্গেই সাইকেল চালিয়ে সুব্রত বেলা প্রায় গোটা দশেকের মধ্যেই জঙ্গলের মাঝামাঝি পৌঁছে গেল।
বেশ ঘন জঙ্গল। দিনের বেলাতেও বড় বড় পত্রবহুল বৃক্ষ সূর্যের আলোকে প্রবেশাধিকার দেয় না। আগে নাকি এই বনে বাঘও দেখা যেত, এখনও যে একেবারে নেই তা নয়, কচিৎ কখনও দু-একটা দেখা যায়। হাতী আছে, আর আছে বন্য বরাহ ও হরিণ।
বনের মধ্য দিয়ে যে পথটি চলে গেছে, অতিকষ্টে সে পথ দিয়ে একটা টুরার মোটর গাড়ি যেতে পারে। পথটিকে পায়ে-চলা-পথ বলাই উচিত।
জঙ্গলের মধ্যেই একটা বড় গাছের তলায় বসে সুব্রত সঙ্গে টিফিন-ক্যারিয়ারে ভর্তি করে যে লুচি-তরকারী এনেছিল তার সদ্ব্যবহার করলে।
আহারাদির পর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে সুব্রত আবার রওনা হল। জঙ্গল পেরিয়ে শালবনে পৌঁছতে পৌঁছতে বেলা প্রায় তিনটে হয়ে গেল। সূর্য অনেকটা হেলে পড়েছে। শালবনের আঁকাবাঁকা পথ ধরে সুব্রত সাইকেল চালিয়ে চলে। চৈত্রের ঝরা পাতায় চারদিক ঢেকে গেছে; মধ্যাহ্নের মন্থর বাতাসে ঝরা পাতাগুলি উড়ে উড়ে মর্মরধ্বনি তোলে, উদাস-করুণ চৈত্ররাগিনী যেন।
স্তব্ধ মধ্যাহ্নেভেসে আসে মাঝে মাঝে ঘড়িয়ালের উদাস মন্থর ডাক।
হেথা হোথা বুনো কবুতরের মৃদু গুঞ্জন। শালবনের চতুর্দিকে ইতস্তত কুটজ কুসুমের মন-ভোলানো শোভা। ফিকে বেগুনি ও ধুলোটে সাদা রংয়ের অজস্র ফুল ধরেছে তাতে গুচ্ছে গুচ্ছে।
বাতাস তীব্র একটা কটু গন্ধ ভাসিয়ে আনে। রঙিন মধুলোভী প্রজাপতি উড়ে উড়ে বেড়ায় ফুলে ফুলে। সুব্রতর কেমন যেন নেশা লাগে। সাইকেল চালিয়ে এগিয়ে চলে সে।
সূর্য যখন একেবারে পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে, চারিদিকে ঘনিয়ে এসেছে সন্ধ্যার বিষণ্ণ বিধুর ছায়া, সুব্রত এসে নৃসিংহগ্রামে প্রবেশ করল। কোথায় একটা কুকুরের ডাক শোনা যায়।
শিবনারায়ণকে আগেই সংবাদ দেওয়া ছিল, প্রাসাদের সামনে প্রশস্ত চত্বরে এসে সুব্রত পা-গাড়ি হতে নামল।
অস্পষ্ট আলো-আঁধারিতে কে একজন দীর্ঘ অস্পষ্ট ছায়ার মত দাঁড়িয়েছিল। সুব্রত তাকেই প্রশ্ন করল, নায়েব চৌধুরী মশাই কোথায় বলতে পারেন?
ছায়ামূর্তি গম্ভীর স্বরে প্রশ্ন করলে, আমারই নাম শিবনারায়ণ চৌধুরী, মহাশয়ের নামটি কি জানতে পারি কি? কোথা হতে আগমন হচ্ছে?
কল্যাণ রায়, রায়পুর থেকে আসছি।
ও, আপনিই কল্যাণ রায়! আসুন, নমস্কার। শিবনারায়ণের কণ্ঠস্বর আনন্দে উচ্ছলিত হয়ে ওঠে। তারপরই চিৎকার করেন, ওরে দুঃখীরাম, সুখন-আলো জ্বালিসনি এখনও! আসুন কল্যাণবাবু, ভেতরে আসুন, আপনারই জন্য অপেক্ষা করছিলাম। পা-গাড়ি ওখানেই থাক, ওরাই তুলে রাখবেখন।
২.০৩ শিবনারায়ণ
ক্লান্তপদে বারান্দা অতিক্রম করে সুব্রত মস্তবড় একটি হলঘরে প্রবেশ করে নায়েব শিবনারায়ণের পেছনে পেছনে।
সিলিং থেকে একটি বেলোয়ারী চোদ্দ বাতির ঝাড়লণ্ঠন ঝুলছে, তারই মধ্যে গোটা দুই বাতি জ্বলছে। এবং দুই বাতির আলোতেই ঘরে আলোর কমতি নেই। ঘরের প্রায় অর্ধেকটা জুড়ে খাট পাতা,তার উপরে ধবধবে পরিষ্কার ফরাস পাতা। একধারে খানকয়েক চেয়ার ও আরাম-কেদারাও আছে। দুপাশে দুটি বড় বড় কাঠের আলমারি ও র্যাক। র্যাকে মোটা খেরো-বাঁধানো সব খাতা সাজানো। সুব্রত ফরাসের ওপরে বসে পড়ল। অত্যন্ত ক্লান্তিবোধ করছিল সে।
আগাগোড়া সাইকেলে এলেন বুঝি? শিবনারায়ণ প্রশ্ন করলেন।
সুব্রত এতক্ষণে ভাল করে ঘরের আলোয় শিবনারায়ণের মুখের দিকে পূর্ণ দৃষ্টি তুলে তাকাল। লম্বা, অত্যন্ত বলিষ্ঠ চেহারা, বয়সের অনুপাতে শরীর এখনও এত মজবুত যে মনে হয়, শরীর যেন বয়সকে প্রতারণা করে ঠেকিয়ে রেখেছে, কোনোমতেই কাছে ঘেঁষতে দেবে না।
বাঁ চোখের স্থিরদৃষ্টি দেখেই বোঝা যায়, অক্ষিগোলকটি পাথরের তৈরী, কৃত্রিম।
খুব পরিশ্রান্ত হয়েছেন নিশ্চয়ই কল্যাণবাবু, চা আনতে বলি? না হাত-মুখ ধুয়েই একেবারে চা-পান করবেন?
আগে তো এখন এক কাপ হোক, তারপর হাত-মুখ ধুয়ে না হয় আবার হবে।
বেশ। হাসতে হাসতে শিবনারায়ণ তখুনি ভৃত্যকে চা আনতে আদেশ করলেন। তারপর আবার এক সময় সুব্রতর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, মাছ-মাংস চলে তো?
তা চলে। সুব্রত হাসতে হাসতে জবাব দেয়।
ফাউলের ব্যবস্থা করেছি। আমি ব্রহ্মচারী মানুষ, দুবেলা হবিষ্যান্ন করি, তবে অতিথি-অভ্যাগতদের কখনও বঞ্চিত করি না।
জায়গাটা আমি বিশেষ করে বেড়াতেই এসেছি চৌধুরী মশাই।
তা বেড়াবার মতই জায়গা বটে, চারিদিকের দৃশ্য খুবই মনোরম। আমি তো একুশটা বছর এখানেই কাটালাম কল্যাণবাবু। জায়গাটা সত্যি বড় ভালো লাগে। একটু পরেই চাঁদ উঠবে। প্রাসাদের ছাদের ওপরে দাঁড়ালে আশপাশের পাহাড়গুলো চমৎকার দেখায়।
