আর সতীনাথ লাহিড়ী? সুব্রত প্রশ্ন করে।
না, সতীনাথ সুবিনয় মল্লিকের নিযুক্তলোক। তার পরেই কিরীটী বলে, আমিই নৃসিংহগ্রামে যেতাম ছদ্মবেশে, কিন্তু শিবনারায়ণ আমাকে চিনে ফেলতে পারে, তাই সেখানে তোকেই যেতে হবে।
বলিস কি! শিবনারায়ণকে তুই চিনিস নাকি? সুব্রতর কণ্ঠে বিস্ময়।
চিনি। সে এক অতীত কাহিনী। সময়মত সে আর একদিন বলব। ঠিক পরিচয় না থাকলেও সে আমার নাম শুনেছে এবং আমিও তাকে ভাল করেই চিনি তার কার্যকলাপের মধ্য দিয়ে। মহাত্মাদের পরিচয় কি কখনও গোপন থাকে রে? তার যে স্বরূপেই প্রকাশ। শিবনারায়ণের এক ছোট ভাই ছিল। নাম তার নরনারায়ণ। শিনারায়ণের চাইতে সে প্রায় দশ-এগারো বৎসরের ছোট। পরিচয়টা আমার তার সঙ্গেই,মানে নরনারায়ণের সঙ্গেই বেশী ছিল। তিনিও একজন স্বনামধন্য ব্যক্তি ছিলেন কিনা।
তার মানে?
তার মানে অতীতে একবার তাঁর সঙ্গে আমায় মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়েছিল।
তাই নাকি! তা সে মহাত্মাটি এখন কোথায়? সুব্রত হাসতে হাসতে প্রশ্ন করে। বর্তমানে তিনি বছর ছয়-সাত হল গত হয়েছেন। কোনো একটি খুনের দায়ে নরনারায়ণ ধরা পড়েছিল। কোর্টে যখন বিচার চলছে, এমন সময় জেল ভেঙে প্রাচীর টপকিয়ে পালাতে গিয়ে প্রহরারত সেন্ট্রির বন্দুকের গুলি খেয়ে প্রাণ হারায়। সাধারণত প্রহরীদের হাতের নিশানা অব্যর্থ হয় না, কিন্তু কি জানি নরনারায়ণের বেলায় it was a susccess,বোধ হয় ঐ ভাবে তার মৃত্যু ছিল বলেই।
এসব কথা তো কই এতদিন তুই আমায় জানাসনি?
মনে ছিল না তাই। পুরাতন ডাইরীর পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে কয়েক দিন আগে সব জানতে পারলাম। তবে হ্যাঁ, কথাটা তাহলে তোকে খুলেই বলি স্পষ্ট করে। সেখানে গিয়ে একটা কথা কিন্তু সর্বদা মনে রাখিস, গোখরো সাপের চাইতেও সাংঘাতিক ঐ শিবনারায়ণ চৌধুরী লোকটা। খুব হিসাব করে পা ফেলবি। সামান্য এতটুকু ভুল হয়েছে কি, আর রক্ষা নেই—সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু-ছোবল দেবে সে।
২.০১ সূত্র সন্ধান
দ্বিতীয় পর্ব
২.০১ সূত্র সন্ধান
যে-দিনের কথা বলছিলাম।
সেই দিনই দ্বিপ্রহরের দিকেও আবার সুব্রত ও কিরীটীর মধ্যে সকালের আলোচনারই জের চলছিল। কিরীটী বলছিল, তোদের হারাধন–জগন্নাথের দাদু মনে হল লোকটা অনেক কিছু জানে, কিন্তু শোকেতাপে জর্জরিত হয়ে সে একেবারে নিজেকে এখন গুটিয়ে ফেলেছে। মাথায় হয়ত তার এখন সামান্য বিকৃতিও ঘটেছে, কিন্তু সেটা কিছুই নয়। এককালে লোকটা এদিকটায় নামকরা একজন আইনজীবী ছিল। তুই জানিস না এবং তোকে বলাও হয়নি, হারাধনের সঙ্গে ইতিমধ্যেই আমার বেশ পরিচয়ও হয়েছে। এখানে আসবার পর দিন-দুই গোপনে হারাধনের ওখানেই ছিলাম, সে কথা তো আগেই বলেছি। যাক, প্রথমটায় সে ধরা দিতে চায় না, কিন্তু যে মুহূর্তে তার দুর্বলতায় আঘাত করেছি, সে নিজেকে একেবারে সম্পূর্ণভাবে আমার কাছে মেলে ধরেছে। তার সব চাইতে বড় দুর্বলতাটা টের পেতে আমার খুব বেশী সময় লাগেনি, মাত্র ঘণ্টা চার পাঁচ লেগেছিল। কিরীটী বলতে থাকে, শ্ৰীকণ্ঠ মল্লিকের পিতা ও হারাধন মল্লিকের পিতা ছিলেন সহোদর ভাই। কিন্তু হারাধনের পিতা পিতার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন। হারাধন সে কথাটা আজও ভুলতে পারেনি। একটা অদৃশ্য ক্ষতের মত এখনও তার মনের মধ্যে সেটা মাঝে মাঝে রক্তক্ষরণ করে আর বুকের ভিতরটা টনটন করে ওঠে। কথাপ্রসঙ্গে বুঝতে পেরে তার সেই ব্যথার জায়গাতেই আঘাত দিয়েছিলাম, সঙ্গে সঙ্গে সে যা বলবার বলতে শুরু করে। টাকাপয়সার প্রয়োজন বা অভাব আজ তার নেই বটে, কিন্তু একদা যে অর্থ সহসা কোন অজ্ঞাত কারণে হাত পিছলিয়ে নাগালের বাইরে চলে গিয়েছিল তার শোকটা আজও মন থেকে মুছে যায়নি। হারাধনের যতটা নয়, তার চাইতেও ঢের বেশী আর একজন অসম্ভব জেনেও, সেই অর্থের আশা আজ পর্যন্ত ত্যাগ করে উঠতে পারল না।
কার কথা বলছিস?
কিরীটী অল্প একটু থেমে, সুব্রতর প্রশ্নের কোন জবাব না দিয়ে বলতে লাগল, তারপর শ্ৰীকণ্ঠ মল্লিকের সেই উইল, যার আভাস সুধীনের মা সুহাসিনীর কাছ থেকে সর্বপ্রথম আমরা জানতে পারি, ভেবেছিলাম এবং সুহাসিনীও বলেছিলেন, যার অস্তিত্ব নাকি একমাত্র তাঁর শ্বশুর, এঁদের স্টেটের নায়েবজী শ্রীনিবাস মজুমদার ছাড়া আর দ্বিতীয় ব্যক্তি জানতেন না, কথাটা ভুল। আরও একজন জানতেন—ঐ হারাধন, সেই উইলের কথা জানতেন। কারণ সে উইল যখন লেখা হয়, আইনজ্ঞ হিসাবে ও অন্যতম সাক্ষী হিসাবে শ্ৰীকণ্ঠ মল্লিক মশাই হারাধনের সাহায্য নিয়েছিলেন। অথচ এ কথা স্বয়ং শ্রীনিবাস মজুমদার মশায়ও জানতেন না, যদিচ তিনি উক্ত উইলের অন্যতম সাক্ষী ছিলেন।
সে উইলে কি লেখা ছিল জানতে পেরেছিস কিছু?
হ্যাঁ, সামান্য। হারাধন বিশদভাবে খুলে আমাকে সব কিছু বলেননি বটে, তবু যতটুকু জেনেছি সেও আমার অনুমান মাত্র। হারাধনকে বিশেষভাবে অনুরোধ করায় কেবলমাত্র বলেছিলেন, যা চুকেবুকে গেছে অনেকদিন এবং যার অস্তিত্বই এ জগতে কোনদিন প্রকাশ
প্রকাশ পেল না, আজ আবার সেই ভুলে যাওয়া পুরনো কাহিনীর জের টেনে এনে নতুন করে অমঙ্গলের বীজ বপন করতে চাই না রায় মশাই। সে উইল কোন দিন আত্মপ্রকাশ করে, এ বিধাতারই বোধ হয় অভিপ্রায় ছিল না, নচেৎ সব হয়েও এমনি করে ভণ্ডুলই বা সেটা হয়ে গেল কেন? তাছাড়া নিয়তি যেখানে বাদ সেধেছে, মানুষের পুরুষকার সেখানে ব্যর্থ হবেই, ইত্যাদি। এরপর আমিও দ্বিতীয় অনুরোধ তাকে করিনি। কেননা শুধুমাত্র সুহাসিনীর কথা আদালত মেনে নিতে চাইত না, বিশেষ করে তিনি যখন আবার আসামীর মা। সেক্ষেত্রে হারাধনের সাক্ষীর একটা মূল্য আছে। বর্তমান রহস্য উদঘাটনের ব্যাপারে সেই মূল্যটুকুই আমাদের কাছে যথেষ্ট। তার বেশী হারাধনের কাছে আমি আশাও রাখি না। এইসব কারণেই তোকে বলেছিলাম চিঠিতে হারাধনের প্রতি নজর রাখতে।
