কল্যাণবাবু, তাহলে আপনি পরেই আসবেন, আমি আসি। নমস্কার।
বিকাশ নমস্কার জানিয়ে ঘর হতে নিষ্ক্রান্ত হয়ে গেল।
ডাঃ সোম আগেই বিদায় নিয়ে গিয়েছিলেন।
বসুন কল্যাণবাবু। রাজাবাহাদুর অদূরে একটা চেয়ার নির্দেশ করলেন সুব্রতকে। একটু চুপ করে থেকে রাজাবাহাদুর সুবিনয় মল্লিক বললেন, সংসারে আপনার কে কে আছেন মিঃ রায়?
সুব্রত মৃদু হেসে বললে, সেদিক দিয়ে আমি একেবারে ঝাড়া-হাত-পা। একমেবাদ্বিতীয়। আপনার কয়েকদিনের কাজে আমি বিশেষ সন্তুষ্ট হয়েছি কল্যাণবাবু। আপনি শুধু কর্মঠ ও পরিশ্রমীই নন-বুদ্ধিমানও, পরীক্ষায় আপনি উত্তীর্ণ হয়েছেন। আপনাকে আমি এখন পরিপূর্ণ বিশ্বাস করি। তাই বলছি, আপনারা হয়ত জানেন না, এ সব কিছুর মূলে আছে একটা প্রকাণ্ড ষড়যন্ত্র এবং আমার বিরুদ্ধেই সে ষড়যন্ত্র চলেছে। দেখলেন তো আজ আমার জীবনের ওপরে attempt পর্যন্ত হয়ে গেল! একটু থেমে আবার বললেন, অবিশ্যি এতটা আমি ভাবি নি। কিন্তু এবারে আমায় সাবধান হতে হবে। আততায়ীর জিঘাংসা কখন যে এর পর কোন্ পথ ধরে নেমে আসবে তাও বুঝতে পারছি না। তবে যদি বলেন প্রস্তুত থাকবার কথা, তা আমি থাকব। আমার হয়েছে কি জানেন, শাঁখের করাত, আগে পিছে দুদিকেই কাটে। অর্থের মত এত বড় অভিশাপ বুঝি আর নেই। রাজাবাহাদুর একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়লেন।
সুব্রত বিস্মিত খুব কম হয়নি। ঠিক এতখানি সে মুহূর্ত-আগেও চিন্তা করতে পারত কিনা সন্দেহ। উচ্ছ্বাসের মুখে কাউকে বাধা দেওয়া উচিত নয় সুব্রত তা জানে, তাই কোন কথা না বলে চুপ করেই রইল।
রাজাবাহাদুর সুবিনয় মল্লিক আবার বলতে লাগলেন, জানি না আপনি আমাদের রাজবাড়ির সেই ভয়াবহ হত্যা-মামলার সম্পর্কে জানেন কিনা। আমার ছোট ভাই সুহাসের হত্যার ব্যাপার খবরের কাগজে হয়ত পড়ে থাকবেন, তবু সব আসল ব্যাপার জানেন না। রাজাবাহাদুরের কণ্ঠস্বর অশ্রুরুদ্ধ হয়ে আসে।
এত বড় লজ্জা! এত বড় অপমান! এ কলঙ্ক এ জীবনেও বুঝি যাবে না। বুঝতে পারেন কি, ভাইয়ের হত্যাব্যাপারের ষড়যন্ত্রের অভিযোগে কাঠগড়ায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে ভাই! উকিলের সওয়ালের জবাব দিচ্ছি। অনুমান করতে পারেন কি, দিনের পর দিন সে কি দুঃসহ মর্মপীড়া! পৃথিবীর সবাই আমার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসছে। আমার বিমাতা পর্যন্ত ঘৃণায় আমার কাছ হতে দূরে সরে গেছেন। উত্তেজনায় রাজাবাহাদুর উঠে দাঁড়ালেন, আমি ভুলতে পারি না—আমি ভুলতে পারি না সেসব কথা। এই বুকের মাঝে দাগ কেটে বসে আছে।
কিন্তু সে যে মিথ্যা—সেও তো প্রমাণিত হয়ে গেছে রাজাবাহাদুর। শান্ত কণ্ঠে সুব্রত বলে।
রাজাবাহাদুর জবাবে মৃদু হাসলেন, প্রমাণ! হ্যাঁ, তা হয়েছে বইকি। কিন্তু বাইরের অপরিচিত আর দশজন লোকের কাছে তার মূল্য কতটুকু! আমার নিদোষিতাটা আইনের চোখে প্রমাণিত হয়নি আজও। আদালত বলেছে প্লেগের বীজ প্রয়োগে তাকে হত্যা করা হয়েছে এবং সেই ষড়যন্ত্রের মধ্যে আমিও একজন নাকি ছিলাম। ছিঃ ছিঃ! কি লজ্জা, কি ঘৃণা! সব চাইতে মজার ব্যাপার কি জানেন কল্যাণবাবু? এ সম্পত্তির ওপরে আমার এতটুকুও লোভ নেই, এর সর্বপ্রকার দাবিদাওয়া আমি হাসিমুখে ত্যাগ করতে রাজি আছি—এখনই, এই মুহূর্তে।
যে জিনিস চুকেবুকে গেছে, তাকে মনে করে কেন আবার দুঃখ পান! সুব্রতর কণ্ঠে অপূর্ব একটা সহানুভূতির সুর জেগে ওঠে।
কল্যাণবাবু, আপনাকে আমি একটা কথা বলব—
বলুন?
আমি কিছুদিনের জন্য বিশ্রাম চাই। আমার অবর্তমানে একমাত্র লাহিড়ীর প্রতি আমি বিশ্বাস রাখতে পারতাম। তার আকস্মিক মৃত্যু আমার পক্ষে যে কতবড় চরম আঘাত, তা কেউ জানে না, বুঝবেও না। তার হত্যার সঙ্গে সঙ্গে যেন আমার যাবতীয় মনের বল একেবারে নিঃশেষ হয়ে গেছে। আজ তার অবর্তমানে আপনিই আমার একমাত্র ভরসা। সামান্য কয়েকদিনের পরিচয়েই বুঝেছি আপনাকে সত্যিই বিশ্বাস করা যায়। আর একটা কথা, আজ আমি বেশ বুঝতে পারছি, ঘরে বাইরে সর্বত্রই আমার শত্রু। ফলে আর কাউকেই যেন এখানে আজ আমি বিশ্বাস করতে পারছি না।
বেশ তো, আপনি না হয় কিছুদিন গিয়ে কলকাতা থেকে ঘুরে আসুন। এদিককার যা দেখাশোনার প্রয়োজন আমিই করব। কিছু ভাববেন না। তা কবে আপনি যেতে চান?
ভাবছি পাঁচ-সাতদিনের মধ্যেই যাব।
বেশ। তাহলে আমি নৃসিংহগ্রামটা একবার ঘুরে আসি, আমি এলেই আপনি যাবেন। রাত্রি অনেক হল, অসুস্থ শরীর আপনার—এবারে বিশ্রাম নিন।
রাজাবাহাদুরের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সুব্রত সেরাত্রের মত উঠে দাঁড়াল।
***
রাত্রি বোধ করি সাড়ে এগারোটা কি পৌনে বারোটা হবে।
সুব্রত অন্যমনস্ক ভাবে রাজাবাহাদুরের ব্যাপারটা ভাবতে ভাবতেই পথ চলছিল। একান্ত অপ্রত্যাশিত ভাবে রাজাবাহাদুর সুবিনয় মল্লিক সহসা যেন নিজেকে উদঘাটিত করে দিয়েছেন।
আজকে যা ঘটল তাতে করে সুব্রতর অন্তত একটা কথা মনে হচ্ছিল, আততায়ী যেই হোক না কেন, রাজবাড়ির মধ্যে গতিবিধি তার আছে এবং রাজবাড়ির সমস্ত গলিখুঁজি তার চেনা। যার ফলে সে খুব সহজেই রাজাবাহাদুরকে আহত করে পালিয়ে যেতে পেরেছে। কিন্তু পালাল সে কোন্ পথে? ছাদ দিয়ে তো পালাবার কোন পথ নেই, আর তাতেই মনে হয়। গেছে সে রাজাবাহাদুরের শয়নকক্ষের ভিতর দিয়েই। প্রবেশও হয়ত ঐ পথ দিয়েই করেছিল সবার অলক্ষ্যে অতি গোপনে কোনো এক সময়ে। তারপর নিশানাথ! তাকে কি সত্যিই বন্দী করে রাখা হয়েছে?না নিশানাথের বিকৃত-মস্তিষ্কের উন্মাদ কল্পনা মাত্র? কিন্তু নিশানাথের স্বগত উক্তিগুলি! সামঞ্জস্যহীন বিকৃত উক্তি বলে তো একেবারে মনে হয় না। কথাগুলো যতই এলোমেলো হোক না কেন, মনে হয় না একেবারে অর্থহীন!
