বাড়ির বারান্দার সামনে এসে সুব্রত চমকে ওঠে, অন্ধকার বারান্দার ওপরে ইজিচেয়ারে কে যেন অস্পষ্ট ছায়ার মত শুয়ে, তার মুখে প্রজ্বলিত সিগারের লাল অগ্রভাগটি যেন কোনো জন্তুর চোখের মত জ্বলছে অন্ধকারের বুকে।
সুব্রত আশ্চর্য হয়ে যায়। কে? তার বারান্দায় ইজিচেয়ারটার ওপর শুয়ে? এগিয়ে এসে সুব্রত বলতে যাচ্ছিল, কে!
কিন্তু তার আগেই প্রশ্ন, কেকল্যাণ নাকি?
কে, কিরীটী! সুব্রত আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে ওঠে, কখন এলি?
দিনতিনেক আগে, কিরীটী জবাব দেয়।
তিনদিন হল এসেছিস, তবে এ কদিন কোথায় ছিলি?
হারাধনের ওখানে আত্মগোপন করে।
সুব্রত পাশের একটা মোড়ার ওপরে উপবেশন করল, হঠাৎ যে!
হ্যাঁ, চলে এলাম। কারণ বুঝতে পারছি, আর খুব বেশী দেরি নেই, একটা কিছু আবার ঘটতে চলেছে।
আমরও তাই মনে হয়, তাছাড়া আজ ব্যাপার অনেক দূর এগিয়েছে। সুব্রত সংক্ষেপে আজ সন্ধ্যায় রাজাবাহাদুর-ঘটিত সমস্ত ব্যাপারটা খুলে বলে গেল।
কিরীটীকে সব শোনার পরও এতটুকুও বিচলিত মনে হল না। ওর ভাব দেখে সুব্রতর মনে হল,সব কিছু শুনে যেন ও এতটুকুও আশ্চর্য হয়নি। আলস্যে একটা আড়ামোড়া ভাঙতে ভাঙতে কিরীটী বলে, থাক ওসব কথা এখন সুব্রত, রাত অনেক হল—তোর শ্রীমান থাকোহরিকে দুজনের মত রান্নার জন্যে বলে দিয়েছিলাম, খোঁজ নে তো রান্না হল কিনা! বড্ড ক্ষিদে পেয়েছে।
সুব্রত উঠে গেল খোঁজ নেওয়ার জন্য। থাকোহরি জানালে, রান্না তৈরী বাবু।
তবে আর দেরি করিস নে, আমাদের খেতে দে, সুব্রত বললে।
আহারাদির পর ক্যাম্পখাটটার ওপর শয্যা বিছিয়ে কিরীটী টান টান হয়ে শুয়ে একটা টী
তোর ব্যাপারটা কি মনে হয় কিরীটী? এতক্ষণে সুব্রত প্রশ্ন করল।
কোন ব্যাপারটা?
কেন, আজকের রাজাবাহাদুরের ব্যাপারটা!
জিওমেট্রির অ্যাকসগুলোও তুই ভুলে গেছিস—things which are equal to the same thing, are equal to one another!
মানে?
মানে সেই শুরু হতে আজকের ঘটনাটি পর্যন্ত, যদি মনে মনে বিচার করবার চেষ্টা করিস তো মানে দেখবি সব একসূত্রে গাঁথা। রায়পুরের ছোট কুমার সুহাস,যাদের বা যার পরিকল্পনা মাফিক নিহত হয়েছে, সতীনাথ লাহিড়ীও তাদের প্ল্যান অনুযায়ী মৃত্যুবাণ খেয়েছে, কিন্তু তোদের রাজাবাহাদুরের ব্যাপারটা একেবারে অন্যরকম। কিন্তু একটা জিনিস আমার মনে খটকা লাগছে, হ্যাঁ রে, হঠাৎ কিরীটী কথার মোড় ফিরিয়ে অন্য বিষয়ে চলে এল, বললে, রাজাবাহাদুরের শোবার ঘর ও নিশানাথ যে ঘরে থাকে, সে দুটো ঘরই কি একই তলায়? বাড়িটা তো সবসমেত তিনতলা লিখেছিলি! দোতলায় রাজাবাহাদুর থাকেন—নিশানাথও কি ঐ দোতলারই কোনো ঘরে থাকেন, না তিনতলায় থাকেন?
তা তো ঠিক জানি না, তবে যতদূর অনুমানে মনে হয় নিশানাথের ঘর দোতলায় বা তিনতলায় নয়, দোতলা ও তিনতলার মাঝামাঝি কোথাও।
কিরীটী সুব্রতের কথায় হেসে ফেললে, মাঝামাঝি মানে? শূন্যে ঝুলছে নাকি?
তাই বলেই তো মনে হয়। বলে সুব্রত নিশানাথের কথাগুলো সুবিনয় মল্লিকের লাইব্রেরী ঘরে দাঁড়িয়েও কেমন স্পষ্টভাবে শুনতে পেয়েছিল তা বললে। সুব্রতর শেষের কথাগুলো শুনে কিরীটী যেন হঠাৎ উঠে বসে চেয়ারটার ওপরে, বলে, তাই নাকি? কথাগুলো স্পষ্ট শোনা গেল? তাহলে তো আর মনে কোনো খটকাই নেই, রাজাবাহাদুরের আহত হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। এ দেখছি এখন তাহলে বোধহয় খুনীর আসল প্ল্যানটা ঠিক অন্যরকম ছিল। তা হ্যাঁ রে,নৃসিংহগ্রামে যাওয়া ঠিক তো? কিরীটী আবার অন্য কথায় ফিরে এল।
হ্যাঁ, পরশুই যাচ্ছি। আজও সে সম্পর্কে কথা হয়েছে।
হ্যাঁ, এবারে আর দেরি না করে নৃসিংহগ্রামটা চটপট সাতে করে আয়। দুএকটা সূত্র হয়তো সেখানে কুড়িয়ে পেতে পারিস!
তোর কি মনে হয়, নৃসিংহগ্রামের মধ্যে সত্যিই কোনো সূত্র জট পাকিয়ে আছে?
ভুলে যাচ্ছিস কেন, এই বিরাট হত্যাকাণ্ডের বীজ তো ওইখানেই ছিল সর্বপ্রথমে। ভেবে দেখ, শ্ৰীকণ্ঠ মল্লিক ওইখানেই অদৃশ্য আততায়ীর হাতে নিহত হন। তারপর সুধীনের পিতা, তিনিও সেইখানেই নিহত হয়েছেন। দুটি ঘটনা সামান্য কয়েক মাসের ব্যবধানে মাত্র ঘটেছে। আমি এখানে তাড়াতাড়ি ছুটে এসেছি, তার কারণ আমি ভেবেছিলাম তোর বুঝি চাকরি ফুরলো, কেননা তোর আসল পরিচয় আর গোপন নেই। তুই ধরা পড়ে গেছিস।
সে কি!
কেন, এখনও তোর সে সম্পর্কে কোনো সন্দেহ আছে নাকি? বৎস,তুমি তো ধরা পড়েছই এবং তোমার ওপরে আসল হত্যাকারীর সদাসতর্ক দৃষ্টিও আছে জেনো।
কি করে বুঝলি?
তোমার মতে সকলের অজ্ঞাতে (?) যখন তুমি সতীনাথ-ভবনে সৎকার্যে ব্যস্ত ছিলে, ছাতের ওপরেযে ছায়ামূর্তির আবির্ভাব হয়েছিল, তিনিই আমাদের এই রহস্যের আসলমেঘনাদ। এবং তার দৃষ্টি সর্বক্ষণই তোর ওপরে আছে। তাছাড়া তুই বোধ হয় জানিস না—তুই যে কারণে সতীনাথ-ভবনে আবির্ভূত হয়েছিলি, ঠিক সেই একই কারণে সেই মহাত্মাও সেখানে গিয়ে আবির্ভূত হয়েছিল, একই সময়ে। তারপর মনে পড়ে, তোর ঘরে কোনো মহাত্মার আবির্ভাব ঘটেছিল এবং তোর গোপন চিঠিপত্র হাতিয়ে চলে যায় সেদিন সে? ঐ একই ব্যক্তি—সেই দিনই তোর আসল পরিচয় তার কাছে পরিস্ফুট হয়ে গেছে।
কথাগুলো নিঃশব্দে সুব্রত শুনে গেল। তারপর বললে, তাহলে?
চিন্তার কোনো কারণ নেই। মহাপুরুষটি জানে না যে, তার পশ্চাতে একা সুব্রতই নয়, আরও একজন আছে যার চোখের দৃষ্টি এড়ানো তার পক্ষে শুধু কষ্টকরই নয়, দুঃসাধ্য। যে জিনিসটা সে হয়তো পরে তার বিবেচনা ও বুদ্ধির দ্বারা সমাধান করতে সক্ষম হয়েছে, সেটা কিরীটী রায় তোকে এখানে পাঠাবার আগেই এমনটি হলে কি করতে হবে তা ভেবে রেখেছিল। এবং সেই মত সে কাজও করেছে।
