শয়নঘরের পরেই ছোট একটি সিঁড়ি। সিঁড়ি বেয়ে উঠলেই সামনে খোলা ছাত। ছাতটিও বেশ প্রশস্ত।
ছাতের ওপরে উঠলে দেখা যায় বাড়ির পশ্চাৎ দিকটা। চমৎকার একটা ফুলের বাগান, বাগানের সীমানায় উঁচু প্রাচীর, প্রায় দুমানুষ সমান। বাইরে থেকে কারও আসা একেবারেই সম্ভব নয়। এবং ছাতে আসবারও ভিতর-বাড়ি দিয়ে ছাড়া দ্বিতীয় পথ নেই।
ঐ ছাতের ওপরে দাঁড়ালেই পিছনদিকে তিনতলার ছাত দেখা যায়।
ছাতটি ভাল করে দেখে, দুজনে আবার রাজাবাহাদুরের শয়নকক্ষে এসে প্রবেশ করল। শয়নকক্ষের সামনের দিককার জানালাপথে অন্দর ও বাহিরের সংযোগস্থল প্রশস্ত আঙিনাটি চোখে পড়ে। জানালাগুলোর কোনটাতেই শিক দেওয়া নয়, খোলা।
এই জানালাপথেই সেদিন রাজাবাহাদুর বিষজর্জরিত সতীনাথকে দেখতে পান। সুব্রত ঘুরে ঘুরে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে শয়নকক্ষটি বেশ ভাল করে দেখতে লাগল।
ঘরে আসবাবপত্রের তেমন কোন বাহুল্য নেই।
একটি দামী শয্যা-বিছানো পালংক, ঘরের এক কোণে একটি মাঝারি গোছের আয়রন সে। একটি আয়না-বসানো আলমারী, ছোট ছোট দুটি বইভর্তি ঘূর্ণায়মান বুক-শেলফ।
দেওয়ালের গায়ে একটি দোনলা বন্দুক ঝোলানো, একটি পাঁচ সেলের টর্চবাতি ও দেওয়ালের কোণে একটি ছাতা।
বিকাশ পাশের লাইব্রেরী-ঘরে গিয়ে ঢুকল।
একটু পরে সুব্রতও সেই ঘরে এসে প্রবেশ করে।
১.১৬ দুঃখের হোমানল
এই ঘরটি অন্য দুটি ঘরের চাইতে আকারে একটু বড়ই বলে মনে হয়। এবং অন্য দুটি ঘরের চাইতে এই ঘরের যেন একটু বিশেষ রকম সাজানোগোছানো ও ফিটফাট।
মেঝেতে দামী পুরু কার্পেট বিছানো আগাগোড়া, চারটি দেওয়ালই ঢাকা পড়ে গেছে আলমারীতে। প্রত্যেকটি আলমারীতে একেবারে ঠাসা বই।
মধ্যখানে ছোট একটি গোলটেবিল, তার চতুস্পর্শে সোফা, কাউচ ও চেয়ার পাতা।
ওরা দুজনেই ঘুরে ঘুরে চারদিক দেখছিল, হঠাৎ কার গলা শোনা গেল, অত্যন্ত স্পষ্ট,
যেন কে ঠিক ওদের সামনেই দাঁড়িয়ে কথা বলছে—অথচ তাকে ওরা দেখতে পাচ্ছে না। আশ্চর্য!
তুমি ভাব আমি কিছু বুঝি না বৌদি! তোমাদের ধারণা আমি একেবারে পাগল হয়ে গেছি! পাগল আমি হইনি, হয়েছ তোমার। হয়েছিল দাদা।
ওরা দুজনেই চমকে পরস্পর পরস্পরের মুখের দিকে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকাল।
ব্যাপারটা দুজনের কেউই যেন ভাল করে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। পরিষ্কার কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে, অথচ কাউকে দেখতে পাচ্ছেনা ওরা, এ আবার কিহেঁয়ালি! রহস্যের খাসমহলই বটে এই রায়পুরের রাজপ্রাসাদ।
একটু শুনেই তারা বুঝতে পারে সস্পষ্ট এ নিশনাথেরই গলা। মনে হচ্ছে বুঝি দেওয়াল ফুটো হয়ে কথাগুলো ওদের কানে আসছে।
তার তো যাওয়ার সময় হয়নি, নিশানাথের গলা আবার শোনা গেল, কিন্তু তবু তাকে যেতে হল। প্রয়োজনের তাগিদে। তবু তোমাদের কারও খেয়াল হয়নি। কিন্তু আমি জানতাম এ আগুন এত সহজে নিভবে না। আগুন খাণ্ডবদাহনের মত একে একে সব গ্রাস করবে।
ঠাকুরপো! একটু শান্ত হও। একটু ঘুমোবার চেষ্টা কর। মেয়েলী মৃদু শোনা গেল।
ঘুমোব! ঘুম আমার আসে না বৌদি। ঘুমোলেই যত দুঃস্বপ্ন আমার দুচোখের পাতার ওপরে এসে যেন তাণ্ডব নৃত্য জুড়ে দেয়। সংসারে অর্থই যত অনর্থের মূল। এর চাইতে বড় শত্রু বুঝি মানুষের আর নেই। তাই তো এই অর্থের বিষাক্ত হাওয়া থেকে পালিয়ে বেঁচেছিলাম। ভাবছ হয়ত পাগল মানুষ, পাগলামির ঝোঁকেই এসব কথা বলছে, কিন্তু তাই যদি হয় তো পাগল সবাই, কে পাগল নয়! তুমি পাগল, আমি পাগল, বিনু পাগল, সবাই পাগল। আর পাগল না হলে কেউ অন্য একজনকে পাগল সাজিয়ে এমনি করে বন্দী করে রাখতে পারে?
সুব্রত পাথরের মতই যেন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে কথাগুলো শুনছে। আশ্চর্য! কোথা থেকে আসছে এই কথাবাতার আওয়াজ? পাশের ঘর নয়, সামনে বা পিছনে ঘর নেই, উপরে ও নিচে ঘর আছে কেবল।
তবে কি এই ঘরের উপরে বা নীচে এমন কোন ঘর আছে যেখান থেকে ঐ কথাবাতার আওয়াজ আসছে! কিন্তু তাই যদি হয়, এত স্পষ্ট শোনা যায় কি করে? এ কি রহস্য! এ কি বিস্ময়! চকিতে সুব্রতর মনের মধ্যে একটা সম্ভাবনা উঁকি দিয়ে যায়।
রহস্যে-ঘেরা এ রাজবাড়ির এও হয়ত একটি রহস্য।
সুব্রত তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ঘরের চতুর্দিকে চোখ বোলাতে থাকে।
কি দেখছেন চারিদিকে অমন করে চেয়ে মিঃ রায়? বিকাশ মৃদু কৌতুকমিশ্রিত কণ্ঠে প্রশ্ন করে।
সুব্রত মৃদু হেসে জবাব দেয়, দেখছি রায়পুরের রাজবাড়ির ঐ রহস্যময় দেওয়ালগুলো, ওরাও কথা বলে কিনা। তাছাড়া ছদ্মবেশের অনেক লেঠা, এবং হাতে সময়ও অল্প। তদন্তের। ব্যাপারে এমনি তাড়াহুড়ো চলে না।
এবারে চলুন, ও ঘরে যাওয়া যাক। রাজাবাহাদুর আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন।
হ্যাঁ চলুন।
ও ঘর হতে নিষ্ক্রান্ত হয়ে ওরা রাজাবাহাদুরের বসবার ঘরে এসে প্রবেশ করতেই রাজাবাহাদুর প্রশ্ন করলেন, দেখা হল দারোগাবাবু?
হ্যাঁ।
কিছু বুঝতে পারলেন?
না। রাত্রি প্রায় এগারোটা বাজে। আজকের মত আমি বিদায় নেব রাজাবাহাদুর। কাল পারি তো সকালের দিকে একবার আসব।
বেশ তো। একবার কেন, যতবার খুশি আসুন না। সব সময়ই আমার ঘরের দরজা আপনার জন্য খোলা থাকবে। কোন সংকোচই করবেন না। তারপর সহসা সুব্রতর দিকে তাকিয়ে বললেন, কল্যাণবাবু, আপনি যাবেন না। একটু অপেক্ষা করুন, আপনার সঙ্গে আমার গোটাকতক জরুরী কথা আছে।
