রাত্রির স্তব্ধ অন্ধকার যেন গম গম করে ওঠে নিশানাথের কণ্ঠস্বরে।
চলুন মিঃ রায়, বিকাশবাবুর ডাকে সুব্রত নিজেকে যেন সামলে নিয়ে আবার পা বাড়াল।
ঘোড়ানো সিঁড়ি বেয়ে দুজনে এসে উপরের দালানে দাঁড়াতেই সামনে রাজাবাহাদুরের খাসভৃত্য শঙ্কুকে দেখা গেল, আসুন বাবু,রাজাবাহাদুর এই ঘরেই আছেন।
ওরা বুঝলে শম্ভ ওদের জন্যই বোধ হয় অপেক্ষা করছিল। সামনের ঘরটাই রাজাবাহাদুরের বসবার ঘর। শম্ভুর আহ্বানে দুজনে দরজার পদা তুলে ঘরে গিয়ে প্রবেশ করে।
ঘরটার মধ্যে একটা যেন মৃত্যুর মতই স্তব্ধতা।
একটা বড় আরামকেদারায় সুবিনয় মল্লিক চোখ বুজে আড় হয়ে শুয়ে আছেন। ঘুমিয়ে পড়েছেন মনে হয়। তাঁর কোলের উপর দুটি হাত জড়ো করা। বুকে ও পিঠে একটা পট্টি বাঁধা।
ওদের পায়ের শব্দে রাজাবাহাদুর চোখ মেলে তাকালেন।
কে?
আমরা।
কল্যাণবাবু, বিকাশবাবু—আসুন!
ব্যাপারটা কি রাজাবাহাদুর?
বলছি, বসুন।
দুজনে রাজাবাহাদুরের সামনাসামনি দুটো চেয়ার অধিকার করে বসল।
একটুখানি থেমে রাজাবাহাদুর বললেন, এই দেখুন। এবারে আপনাদের আততায়ীর আক্রোশটা আমার উপরেই এসে পড়েছিল। কিন্তু অল্পের জন্য বেঁচে গেছি।
ব্যাপার তো কিছুই বুঝতে পারছি না রাজাবাহাদুর! বিকাশ প্রশ্ন করে।
আপনারা জানেন হয়ত, আমার শোবার ঘরের সংলগ্ন সামনে একটা ছোট খোলা ছাদ আছে। সন্ধ্যার দিকে অনেক সময় আমি সেই ছাদে একা একা ঘুরে বেড়াই। আজও বেড়াচ্ছিলাম, রাত্রি তখন বোধ করি আটটার বেশী হবে না, হঠাৎ একটা পায়ের শব্দ, চোখ মেলে চেয়ে দেখবার আগেই পিছন থেকে কে যেন আমায় ছোরা মারলে। কিন্তু অন্ধকারেই হোক বা আমার নড়াচড়ার জন্যই হোক, লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে ছোরাটা বাঁদিককার কাঁধের উপরে গিয়ে বিঁধে যায়। সঙ্গে সঙ্গে আমিও বিদ্যুৎবেগে সরে যাই। আততায়ী ততক্ষণে একলাফে সিঁড়িতে গিয়ে পড়েছে—আমার নাগালের বাইরে। লোকটার পিছু পিছু ছুটে গেলাম বটে, কিন্তু ধরতে পারলাম না।
তখুনি চাকরবাকরদের ডাকলেন না কেন? প্রশ্ন করে সুব্রত।
সেটা আমার ভুল হয়ে গেছে। আমি নিজেই ছুটতে ছুটতে সিঁড়ি পর্যন্ত আসি, কিন্তু পরমুহূর্তে লোকটা কোথায় যে উধাও হয়ে গেল, তার আর কোন পাত্তাই পেলাম না। তারপরে অবিশ্যি চাকরদের ডেকে খোঁজ করলাম অনেকক্ষণ ধরে, কিন্তু সবই বৃথা। আততায়ী পালিয়েছে তখন।
কিন্তু সত্যি যদি কেউ এসে থাকে, তাকে পালাতে হলে পালাতে হবে সেই নীচ দিয়েই, আর তো অন্য কোন পথ নেই শুনেছি। বিকাশবাবু বললেন।
ছোট্টু সিংও কি কাউকে পালাতে দেখেনি? প্রশ্ন করে সুব্রত।
না, ছোষ্ট্র সিং তো সেই সন্ধ্যা থেকে নিচেই ছিল।
আশ্চর্য! সুব্রত মৃদুস্বরে বললে।
আপনার বাড়ির চাকরদের প্রতি আপনার খুব বিশ্বাস, না রাজাবাহাদুর? প্রশ্ন করলেন এবারে বিকাশবাবু।
হ্যাঁ, ওদের কাউকেই সন্দেহ করতে পারি না দারোগাবাবু। একাদিক্রমে বহির্মহলে যারা অন্তত আট-দশ বছর চাকরি করে, তারাই পরে আমাদের অন্দরে স্থান পায়, এ বাড়ির এই নিয়ম বরাবর চলে আসছে বহুকাল থেকে।
তার মানে সন্দেহের বাইরে? সুব্রত বলে।
হ্যাঁ।
আঘাতটা কি খুব গুরুতর হয়েছে? সুব্রত প্রশ্ন করে।
বোধ হয় না। ডাক্তারকেও ডাকতে পাঠিয়েছি, এখনও এসে পৌঁছায়নি, কোথায় নাকি বাইরে বেড়াতে গেছে। নিজেই শম্ভুকে দিয়ে ফার্স্ট এড় নিয়েছি।
ঠিক এই সময় একপ্রকার হন্তদন্ত হয়েই ডাক্তার সোম এসে ঘরে প্রবেশ করলেন। তাঁর হাতে ডাক্তারীর কালো ব্যাগটা, ব্যাপার কি রাজাবাহাদুর? হঠাৎ এত জরুরী তলব? বাড়িতে ছিলাম না, এসেই শুনলাম, এখুনি ওষুধপত্র নিয়ে আসতে হবে!
এস ডাক্তার, মরতে মরতে বেঁচে গেছি। রাজাবাহাদুর কাঁধের ব্যাণ্ডেজটা খুলতে লাগলেন।
অপেক্ষা করুন, আপনাকে ব্যস্ত হতে হবে না, আমি হাতটা ধুয়ে আসি। যা করবার আমিই করবো। ডাক্তার মৃদুস্বরে বললেন।
পাশের অ্যাটাচড় বাথরুমে ঢুকে হাত ধুয়ে এসে ডাঃ সোম ব্যাণ্ডেজ খুলতে লাগলেন। স্ক্যাপুলার ঠিক মাঝামাঝি একটা দেড়ইঞ্চি পরিমাণ ক্ষতচিহুঁ। খুব বেশী রক্তক্ষয় হয়েছে বলে মনে হয় না। গোটা-দুই স্টীচ দিয়ে চটপট ডাক্তার ব্যাণ্ডেজটা বেঁধে দিল। টিটেনাস ইনজেকসনও। দিতে ভুল হল না। রাজাবাহাদুর ডাঃ সোমকে সমগ্র ব্যাপারটা তখন খুলে বললেন।
কিন্তু ব্যাপারটা যে ক্রমেই ঘোরালো হয়ে উঠছে রাজাবাহাদুর! ডাঃ সোম বলতে লাগলেন, একেবারে রাজঅন্তঃপুরের মধ্যে এরকম খুনজখম হতে শুরু করল? কার উপরে কখন বিপদ নেমে আসে—কেউ বলতে পারে না!
রাজাবাহাদুরও যেন বেশ চিন্তিত হয়ে উঠেছেন। মুখের ওপরে তাঁর নেমে এসেছে যেন একটা চিন্তার কালো ছায়া।
রাজাবাহাদুর, আপনার যদি আপত্তি না থাকে, আমি একবার আপনার শয়নকক্ষ ও তার আশপাশটা ঘুরে দেখতে চাই। বিকাশ বললে।
স্বচ্ছন্দে। যান না, ঘুরে আসুন। মৃদু ক্লান্ত স্বরে রাজাবাহাদুর বললেন।
আসুন কল্যাণবাবু, বিকাশ ডাকলে।
আমাকেও যেতে হবে?
আসুন না। একজোড়া চোখের চাইতে দুজোড়া চোখ অনেক বেশীই দেখতে পায়, আসুন!
যান কল্যাণবাবু। ঘুরে দেখে আসুন। রাজাবাহাদুর বললেন।
আগে আগে বিকাশ, পশ্চাতে সুব্রত ঘর হতে নিষ্ক্রান্ত হয়ে গেল।
সামনেই একটা টানা বারান্দা,পর পর তিনটে ঘর, একটি রাজাবাহাদুরের বসবার ঘর, তার পরই তাঁর লাইব্রেরী-ঘর ও সর্বশেষটি তার শয়নঘর। প্রত্যেকটি ঘরই বেশ প্রশস্ত। এক ঘর থেকে অন্য ঘরে দুঘরের মধ্যবর্তী দরজাপথে ও বারান্দা দিয়ে যাতায়াত করা যায়।
