এখুনি আমাকে একবার উঠতে হবে মিঃ রায়। রাজাবাহাদুরকে কে বা কারা তাঁর নিজের শয়নকক্ষের হাতের উপরে ছুরি মেরে হত্যা করবার চেষ্টা করেছিল।
অ্যাঁ! সে কি! সুব্রত চমকে ওঠে।
দেখুন দেখি কি ঝামেলা! বিরক্তিমিশ্রিত কণ্ঠে বিকাশ বলে।
সতীশ স্তব্ধ হয়ে একপাশে আদেশের প্রতীক্ষ্ণয় দাঁড়িয়ে ছিল। এতক্ষণ একটি কথাও বলেনি, এবারে সে প্রশ্ন করলে, আমি যেতে পারি হুজুর?
হ্যাঁ যাও, রাজাবাহাদুরকে বল গিয়ে এখুনি আমি আসছি।
উনি আহত হয়েছেন নাকি?
সে সম্পর্কে তো কিছুই লেখেননি। কেবল অনুরোধ জানিয়েছেন, এখুনি একবার যেতে।
সতীশ সাইকেলে উঠেছিল, সহসা ঘুরে দাঁড়িয়ে সুব্রতর দিকে তাকিয়ে বললে, অন্ধকারে ভাল করে আপনাকে আমি চিনতে পারিনি স্যার। রাজাবাহাদুর আপনাকেও যেতে বলেছিলেন রায়বাবু, কিন্তু আপনার বাসায় গিয়ে আপনাকে আমি দেখতে পেলাম না, চাকরও বলতে পারল না, আপনি কোথায় গেছেন!
তুমি যাও সতীশ, আমিও বিকাশবাবুর সঙ্গেই আসছি।
সতীশ আর দ্বিতীয় বাক্যব্যয় না করে পা-গাড়িতে চেপে রওনা হয়ে গেল।
১.১৫ আবার আততায়ীর আবির্ভাব
বিকাশ চটপট প্রস্তুত হয়ে নিল এবং দুজনে আর বিলম্ব না করে রাজবাড়ির দিকে দ্রুত পা চালিয়ে দিল।
সুব্রত বিকাশের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে, ব্যাপারটা যেন কেমন মনে হচ্ছে বিকাশবাবু! রাজবাড়ির অন্দরে অচেনা লোক এসে স্বয়ং রাজাবাহাদুরকে ছুরিকাঘাত করবার চেষ্টা করেছে!
আমিও কিছু বুঝে উঠতে পারছি না কল্যাণবাবু।
চলুন দেখা যাক।
রাত্রি বোধ করি পৌনে নটা হবে, রাত্রির কালো আকাশটা ভরে অসংখ্য হীরার কুচির মত তারাগুলো ঝিলমিল করছে।
ছোট শহর এর মধ্যেই নিঝুম হয়ে এসেছে। রাস্তায় লোকজন বড় একটা দেখা যাচ্ছে না। মাঝে মাঝে দুএকটা কুকুরের ডাক শোনা যায় কেবল।
রাস্তার দুপাশে কেরোসিনের বাতিগুলো টিমটিম করে জ্বলে।
কারো মুখেইকোনো কথা নেই, দুজনে নিঃশব্দে পাশাপাশি এগিয়ে চলে বেশ দ্রুত পদক্ষেপেই।
সুব্রতর মনে অনেক কথাই স্রোতের আবর্তের মত পাক খেয়ে খেয়ে ফিরছিল। ব্যাপারটা সত্যিই কেমন যেন একটু গোলমেলে। কেউ রাজাবাহাদুরকে হত্যা করবার চেষ্টা করেছিল। তাও রাজবাড়িতে রাজাবাহাদুরের নিজ শয়নকক্ষের সামনের ছাতে। আজও কি তাহলে ছোট্ট সিং বেশী সিদ্ধির নেশা করেছে? আশ্চর্য, যা কিছু অঘটন ঘটছে, সবই রাজ-অন্তঃপুরের মধ্যে! এতগুলি লোকের সতর্ক দৃষ্টি এড়িয়ে আততায়ী কেমন করেই বা রাজ-অন্তঃপুরে প্রবেশ করে এবং নির্বিঘ্নে তার কাজ হাসিল করে?
রহস্য ক্রমে ঘনীভূত হচ্ছে।
সহসা একসময় বিকাশ চলতে চলতে সুব্রতকে লক্ষ্য করে বলে, আপনাকে আজ কদিন থেকেই একটা কথা বলব বলব মনে করছিলাম কল্যাণবাবু, কিন্তু রোজই ভুলে যাই, শেষ পর্যন্ত বলা হয়ে উঠছে না।
কি বলুন তো?
এর মধ্যে একদিন কিন্তু লাহিড়ীর বাড়ীটা আমি সার্চ করে এসেছি।
তাই নাকি! কবে সার্চ করলেন?
সে যেদিন খুন হয় তার পরদিনই সকালে লাহিড়ীর বাড়িটা গিয়ে সার্চ করি।
সার্চ করে কিছু পেলেন?
না। তবে আপনি শুনলে হয়তো আশ্চর্য হবেন, আমার সার্চ করবার পূর্বেই, কোনো সহৃদয় ব্যক্তি সে বাড়িতে গিয়ে কিছু সার্চ করে এসেছেন মনে হল যেন আমার!
কি রকম? সুব্রত যেন কিছুই জানে না এইভাবে প্রশ্নটা করে।
ঘরের মধ্যে তার সব বাক্স-প্যাঁটরাগুলোই তালাভাঙা অবস্থায় পড়েছিল, তাই আমার কষ্টটা ন দেবায় ন ধর্মায়ই হয়ে গেল।
বাক্স-প্যাঁটরাগুলো খুঁজে কিছুই পেলেন না?
না। কতকগুলো জামাকাপড় নগদ কিছু টাকা ও খানকয়েক পুরাতন চিঠিপত্র। এবং তাতেই আমার ধারণা যে বাড়ির চাকর-বামুন বাক্সগুলো ভাঙেনি। বাইরে থেকে কেউ সকলের অলক্ষ্যে, যখন লাহিড়ীর মৃতদেহটা নিয়ে আমরা সবাই এদিকে ব্যস্ত ছিলাম, সেই ফাঁকে তার কাজ হাসিল করে চলে গেছে।
সুব্রত কোনো জবাব দেয় না, নিঃশব্দে পথ অতিক্রম করে চলে।
কিছুক্ষণ বাদে একসময় প্রশ্ন করে, হ্যাঁ ভাল কথা, একটা জিনিস কি আপনি লক্ষ্য করেছিলেন বিকাশবাবু যে, এই পুরাতন রাজবাড়ির ছাদ দিয়ে এক অংশ হতে অন্য অংশে অনায়াসেই যাতয়াত করা যায়?
কই না তো! তাই নাকি?
হ্যাঁ।
ইতিমধ্যে ক্রমে এরা দুজনে মৃদুস্বরে কথাবার্তা বলতে বলতে প্রাসাদের সামনে এসে পৌঁছে গেছে। রাজবাটির মধ্যে এসে প্রবেশ করল দুজনে। আজ সদর ও অন্দরের মধ্যবর্তী দরজাটা খোলাই ছিল এবং স্বয়ং ছোট্টু সিং দরজার সামনে লাঠি নিয়ে প্রহরায় নিযুক্ত ছিল। ওদের আসতে দেখে সে সেলাম জানাল।
অন্দরের আঙিনায় পা দিতেই ওদের কানে এল উন্মাদ নিশানাথের কণ্ঠস্বর, সাবধান, সাবধান! That boy, that mischievous boy again started his old game!
সুব্রত থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে।
আকাশে চাঁদ নেই, কেবল তারা। তারই মৃদু আলো আঙিনার উপরে এসে যেন অপূর্ব একটা মৃদু আলোছায়ার সৃষ্টি করেছে। অতর্কিতেই সুব্রতর মনে পড়ে যায়, মাত্র কয়েকদিনের আগেকার একটা বীভৎস দৃশ্য। ঐ তো ঐখানে সতীনাথ লাহিড়ার বিষজর্জরিত মৃতদেহটা ধনুকের মত বেঁকে পড়েছিল। তার অশরীরী আত্মা হয়ত এখনও এখানে নিঃশ্বাস ফেলে বেড়াচ্ছে, কে জানে!
সহসা আবার নিশানাথের কণ্ঠস্বর শোনা গেল, আমায় তোমরা বোকা ঠাউরেছ বটে, অ্যাঁ! ভাবছ এ আগুন নিভবে? না, নিভবে না। কে? ও বৌদি! তোমার চোখে জল নেই কেন? কেন কাঁদতে পার না? কাঁদ, একটু কাঁদ বৌদি। কেমন করে এ পাপ সহ্য করে আছ আজও? দেখছ না সব পুড়ে গেল!
