ছোট্টু সিংয়ের ঘরটা ঐ দরজা থেকে কত দূর?
তা প্রায় হাত-দশ-বারো দূরে তো হবেই! সুব্রত মৃদুকণ্ঠে বলে।
কিন্তু আপনার বন্ধুর চিঠি পড়ে তো মনে হয়, তিনি ঐ দারোয়ান ছোট্টু সিংকে যেন একটু সন্দেহ করছেন!
কেন, কিসে আপনি তা বুঝলেন?
প্রথম কথা ধরুন, সতীনাথের কাছে যে চিঠি নিয়ে গিয়েছিল, আমরা জানতে পেরেছি। তার মাথায় ছিল পাগড়ী বাঁধা। দ্বিতীয়, মহেশ সামন্ত যে জুতোর শব্দ পেয়েছিল, তার ধারণা সেই জুতোর তলায় কোনো নাল-বাঁধানো থাকলে যেমন শব্দ হয় শব্দটা তেমনি এবং আপনার বন্ধুও চিঠির মধ্যে ঐ কথা লিখেছেন। এখন খোঁজ নিতে হবে সত্যিই ছোট্টু সিংয়ের কজোড়া পেটেন্ট দারোয়ানী লোহার নাল-বসানো নাগরাই জুতো আছে?
তাতে কি?
আমার কেন যেন মনে হচ্ছে—ঐ ছোট্টু সিংয়ের উপরেই আপনার বন্ধুর সন্দেহটা বেশী পড়েছে।
চিন্তিত হবেন না বিকাশবাবু। তাই যদি হয় তো,যথাসময়ে পাকড়াও তাকে করা যাবে, এখন থেকে কেবল শুধু তার সকলপ্রকার গতিবিধির ওপরে আমাদের সদা সজাগ দৃষ্টি রাখলেই চলবে। এবং তাতে করে সত্যিই যদি তাকে গ্রেপ্তার করা আমাদের প্রয়োজন হয়, তবে বেগ পেতে হবে না।
মুখে সুব্রত বিকাশকে যাই বলুক না কেন, দিন-দুয়েক আগে ছোট্টু সিংয়ের সঙ্গে দু-চারটে কথাবার্তা বলে মনে মনে সে যে বেশ একটু চিন্তিত হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো ভুলই নেই। কিন্তু বিকাশ পুলিশের লোক, তাকে সে কথা বললে এখুনি হয়ত সে বিশেষ রকম তৎপর হয়ে উঠবে, ফলে তার প্ল্যান হয়ত সব ভেস্তে যাবে। তাই সে ছোট্ট সিংয়ের ব্যাপারটা কতকটা যেন ইচ্ছে করেই এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করল। সুব্রত যে একটু আগে বিকাশকে বলছিল ছোষ্ট্র সিংকে সে জেরা করেছে, আসল ব্যাপারটা হচ্ছে এই
দিন দুয়েক আগে ছোট্টু সিংকে সুব্রত কয়েকটা প্রশ্ন সত্যিই করেছিল। স্টেট সংক্রান্ত কাজের নির্দেশ নিয়ে ছোট্টু সিং সেদিন বিকেলের দিকে রাজাবাহাদুরের কাছ থেকে সুব্রতর কাছে এসেছিল, কাজ হয়ে যাবার পর দু-চারটে অপ্রাসঙ্গিক কথাবাতার ফাঁকে আচমকা সুব্রত প্রসঙ্গটা উত্থাপন করেছিল। ছোষ্ট্র সিং এ বাড়িতে মাত্র বছর পাঁচেক হল কাজ করছে, বয়েস চল্লিশের বেশী নয়। বেরিলীতে বাড়ি। রাজাবাহাদুর সুবিনয় মল্লিকের ও সীতনাথের অত্যন্ত বিশ্বাসের পাত্র। অন্দরমহলের পাহারাদারীর ভার ছোট্টু সিংয়ের ওপরই ন্যস্ত। লোকটা লম্বাচওড়া এবং গায়ে শক্তি রাখে প্রচুর। পরিধানে সর্বদাই প্রায়-ঈষৎ গোলাপী আভাযুক্ত আট-হাতি একখানা ধুতি। গায়ে সাদা মেজাই, মাথায় প্রকাণ্ড সাদা পাগড়ী। পায়ে লোহার নাল-বসানো হিন্দুস্থানী নাগরা জুতো। হাতে পাঁচহাত প্রমাণ একখানা স্টিলের পাত দিয়ে মোড়া তেল-চকচকে লাঠি। দাঁড়িগোঁফ একেবারে নিখুঁতভাবে কামানো। উপরের পাটির সামনের দুটো দাঁত সোনা দিয়ে বাঁধানো। কথায় কথায় ছোট্টু সিং বললে, কি বলব বাবু, আগাগোড়া ব্যাপারটা যে টেরই পেলাম না, না হলে–
কেন, তুমি তো ভেতরেই থাকতে!
থাকতাম তো বাবু, কিন্তু সেদিন সিদ্ধির নেশাটা বোধ হয় একটু বেশীই হয়ে গিয়েছিল। বিছানার ওপরে সাঁঝ থেকেই কেমন ঝিম্ মেরে শুয়েছিলাম, অনেক হাল্লা চেঁচামেচি হতে তবে টের পেলাম।
বল কি! অত গোলমাল তুমি শুনতে পাওনি?
নেশা বড় বদ জিনিস বাবু, একেবারে অজ্ঞান করে দেয়। হুঁশ কি ছাই ছিল! কিন্তু একথা রাজাবাবু জানেন না, জানলে এখুনি আমার চাকরি চলে যাবে।
তাহলে তুমি সেরাত্রে দরজাটাও বন্ধ করেই রেখেছিলে, কি বল?
হ্যাঁ বাবু। দরোয়াজা তো সেই রাত্রি বারোটায় বন্ধ হয় সাধারণত। তার আগে দরোয়াজা বন্ধ করার হুকুম নেই, তবে সেদিন রাজাবাবুর হুকুমেই রাত্রি দশটায় দরজা বন্ধ করা হয়েছিল। তাছাড়া ভারী বজ্জাত ও লহাড়ী বাবু, বলব কি বাবু, শালা মরেছে তাতে আমার এতটুকুও দুঃখ হয়নি, ওর জ্বালায় রাত্রে কতবার যে আমাকে দরোয়াজা খুলে দিতে হয়েছে, যখন-তখন ও অন্দরে রাজাবাবুর সঙ্গে দেখা করতে যেত।
রাত্রেও বুঝি তিনি প্রায়ই রাজবাড়ির মধ্যে যেতেন?
হ্যাঁ বাবু, প্রায়ই। যত সলা-পরামর্শ রাজাবাবুর তা হত ঐ লহাড়ীবাবুর সঙ্গেই।
শুনেছি লাহিড়ীবাবু নাকি প্রায়ই রাত্রে রাজাবাবুর সঙ্গে দাবা খেলতে আসতেন?
হ্যাঁ বাবু। রাজাবাবু খুব ভালো দাবা খেলতে পারেন।
এর পর সুব্রত ছোট্টু সিংকে বিদায় দিয়েছিল সেদিনকার মত।
সুব্রতর মনে মনে খুবই ইচ্ছা ছিল সমগ্র রাজবাটীর অন্দরমহলটাও একবার ঘুরে দেখে। কিন্তু সুবিধা করে উঠতে পারেনি আজ পর্যন্ত। এমন কোনো একটা ছল-ছুতো ও ভেবে ভেবে আজও বের করতে পারেনি, যাতে করে ওর ইচ্ছেটা ও পূরণ করতে পারে।
কিন্তু নৃসিংহগ্রামে যাবার আগে রাজবাড়ির ভিতর-মহলটা ও একটিবার দেখতে চায় এবং নিজের চোখে দেখবার যখন কোনো সুবিধাই নেই, বিকাশের উপরেই ওকে নির্ভর করতে হবে। সেই কথাটাই আজ ও বিকাশের কাছে উত্থাপন করবে, আগে হতেই ভেবে ঠিক করে এসেছিল।
ভৃত্য দুগ্লাস সরবৎ ও কিছু ফল ডিশে করে সাজিয়ে নিয়ে এল। দুজনে কথাবার্তা বলতে বলতে সরবৎ পান করছে, এমন সময় রাজবাড়ির একজন কর্মচারী সাইকেল হাঁকিয়ে সেখানে এসে উপস্থিত হয়ে বিকাশের হাতে একখানা খাম দিল, রাজাবাহাদুর পাঠিয়েছেন।
কি ব্যাপার সতীশ? বিকাশ ব্যগ্রভাবে প্রশ্নটা করতে করতেই খাম ছিঁড়ে চিঠিটা পড়তে শুরু করে দিল। চিঠিটা পড়তে পড়তে বিকাশের মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল। সুব্রত উদ্বিগ্ন কণ্ঠে প্রশ্ন করলে, কিসের চিঠি?
