কিরীটীর চিঠিটা সুব্রত আগাগোড়া খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে চার-পাঁচবার পড়ে ফেলল।
এই দীর্ঘ পাঁচদিনে অনেক কিছুই সুব্রত দেখেছে। ইতিমধ্যে ময়না-তদন্তের রিপোর্টে জানা গেছে, সতীনাথের মৃত্যু ঘটেছে তীরের ফলার সঙ্গে মাখিয়ে তীব্র কোনো বিষ-প্রয়োগের ফলে। যে তীরটা সতীনাথের বুকের মধ্যে গিয়ে বিধেছিল, সেটার গঠনও আশ্চর্য রকমের। তীরটি লম্বায় মাত্র ইঞ্চি-চারেক, সরু একটা ছাতার শিকের মত, কঠিন ইস্পাতের তৈরী। তীরের অগ্রভাগে ১/৩ ইঞ্চি পরিমাপের একটা ছুঁচলো চ্যাপটা ফলা আছে। তাতেই বোধ করি বিষ মাখানো ছিল। তীরটা বিকাশের কাছেই আছে। তীরটাকে হত্যার অন্যতম প্রমাণ হিসাবে রাখা হয়েছে। আজ পর্যন্ত সুব্রত অনেক ভেবেও ঠিক করে উঠতে পারেনি, কি উপায়ে এবং কি প্রকারে যন্ত্রের সাহায্য এই সরু ছোট্ট তীরটা নিক্ষিপ্ত হয়েছিল। তবে যেভাবেই তীরটা ছোঁড়া হোক না কেন, তীর নিক্ষেপের যন্ত্রটি যে অতীব শক্তিশালী তাতে কোনো সংশয়ই থাকতে পারে না। কারণ তীরটার অংশ মৃতদেহের বুকের মধ্যে অনেকটা ঢুকে ছিল। হত্যাপরাধে এখনও কাউকেই গ্রেপ্তার করা হয়নি বটে, তবে হত্যাপরাধকে কেন্দ্র করে রায়পুরে বেশ যেন একটা চাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে। রাজাবাহাদুর সুবিনয় মল্লিক লোকটা অত্যন্ত আমুদে ও মিশুঁকে। সতীনাথের হত্যার পর থেকে সেই যে তিনি প্রাসাদের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছেন, আজ পর্যন্ত তাঁকে আর কেউ বের হতে দেখে নি। স্টেটের অতি আবশ্যকীয় বা বিশেষ প্রয়োজনীয় কোনো কাজে রাজাবাহাদুরের পরামর্শ নিতে হলে সতীনাথের অভাবে আজকাল সুব্রতকে রাজাবাহাদুরের সঙ্গে দেখা করতে হয়। এবং সেই ধরনের কাজে ইতিমধ্যে দু-তিনবার সুব্রতর রাজাবাহাদুরের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ যা হয়েছে, সেও খুবই সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য।
সুব্রত নিজেই গায়ে পড়ে একটিবার নৃসিংহগ্রাম মহালটা দেখে আসবার প্রস্তাব রাজাবাহাদুরের কাছে উত্থাপন করেছিল। রাজাবাহাদুর সুবিনয় মল্লিক সম্মতিও দিয়েছেন। ঠিক হয়েছে, আগামী পরশু সুব্রত সেখানে যাবে। আজকাল আর সুব্রতর হারাধনদের ওখানে নিয়মিত সন্ধ্যায় যাওয়া হয়ে ওঠে না। প্রায় সুব্রত হাঁটতে হাঁটতে থানার দিকে যায়। তারপর সেখানে থানার সামনে খোলা মাঠের মধ্যে দুটো ক্যাম্বিসের ইজিচেয়ার পেতে বিকাশ ও সুব্রত দুজনের মধ্যে সতীনাথের হত্যা সম্পর্কে নানাপ্রকার আলাপ আলোচনা চলতে থাকে।
আজও সন্ধ্যার দিকে কিরীটীর চিঠিটা নিয়ে সুব্রত থানার দিকে অগ্রসর হল। ইদানীং সতীনাথের হত্যা-ব্যাপারের পর থেকে সুব্রতর যেন মনে হয়, সর্বদাই কে যেন তার পিছু পিছু ছায়ার মত তাকে অলক্ষ্যে অনুসরণ করে ফিরছে। কিন্তু কোনোরূপ চাক্ষুষ প্রমাণ আজ পর্যন্ত সে পায়নি। কতবার সে চলতে চলতে ফিরে তাকিয়েছে হঠাৎ, কিন্তু কেউ নেই। অথচ মনে হচ্ছিল একটু আগেও, যেন কারও সুস্পষ্ট পায়ের শব্দ সে শুনেছে। হয়ত এটা কিছুই নয়, তার সদাসন্দিগ্ধ মনের বিকারমাত্র। কিন্তু তথাপি মনের মধ্যে একটা সন্দেহের অস্বস্তিকর কালো ছায়া তাকে সর্বদা পীড়ন করেছে। থানার সামনেই ভোলা মাঠ, রুক্ষ। থানার একপাশে একটা অনেক কালের পাকুড় গাছ। প্রথম রাত্রে আজ চাঁদ উঠেছে, পাকুড় গাছের পাতার ওপরে সামান্য মলিন আলোর আভাস। ঝিরঝির করে শেষ ফাল্গুনের হাওয়া বয়ে যায়।
বিকাশ প্রতিদিনের মত, বোধ হয় হয়ত সুব্রতর প্রতীক্ষ্ণয়, ক্যাম্বিসের চেয়ারটার উপর গা ঢেলে দিয়ে একটা সিগারেট টানছিল। অদূরে সব্রতকে আসতে দেখে সোজা হয়ে বলে, আসুন সুব্রতবাবু! আজ যে এত দেরি?
সুব্রত ঠোঁটের ওপরে তর্জনীটা বসিয়ে বলে, বিকাশবাবু, আপনি বড় অসাবধানী। কতবার আপনাকে সাবধান করে দিয়েছি, এখানে আমি সুব্রত রায় নয়, কল্যাণ রায়! মনে রাখবেন আমি শক্ৰবেষ্টিত পুরীর মধ্যে বাস করছি, কখন কার কানে কি কথা যাবে, সর্বনাশ হয়ে যাবে!
বিকাশ হাসতে হাসতে জবাব দেয়,বসুন, কল্যাণবাবু। কি করি বলুন, অভ্যাসের দোষ, মনে থাকে না,ভুলে যাই। তারপর বন্ধুর চিঠি পেলেন?
হ্যাঁ, এই নিন পড়ুন। সুব্রত বুকপকেট থেকে খামসমেত কিরীটীর চিঠিটা বের করে বিকাশের হতে তুলে দেয়।
অন্ধকারে পড়া যাবে না। এই চৌবে, একটা লণ্ঠন নিয়ে আয়! বিকাশবাবু হাঁক দেয়।
একটু পরেই চৌবে একটা হ্যারিকেন বাতি নিয়ে এসে সামনে রাখে।
হ্যারিকেনের আলোয় তখুনি বিকাশ চিঠিটা আগাগোড়া পড়ে ফেলে। তারপর চিঠিটা পুনরায় ভাঁজ করে খামের মধ্যে ভরে সুব্রতর দিকে এগিয়ে দেয়।
সত্যি, এ কথাটা আমার একবারও মনে হয়নি যে সেরাত্রে ঘোটু সিংয়ের একটা জবানবন্দি নেওয়ার প্রয়োজন ছিল! বিকাশ বলে।
আমি অবিশ্যি ছোট্টু সিংকে ডেকে দুচারটে প্রশ্ন করেছি। কিন্তু আপনার পক্ষে যতটা সম্ভব, আমার পক্ষে ততটা করা সম্ভব নয়। লোকের সন্দেহ জাগতে পারে, কেন আমি এত আগ্রহ দেখাচ্ছি!
করেছিলেন নাকি? কই এতদিন এ কথা তো আমায় বলেননি? বিকাশ বললে।
বলিনি তার কারণ, ছোষ্ট্র সিংকে যেসব প্রশ্ন আমি করেছি, একান্ত মামুলী। সে বলে, সে নাকি সেই রাত্রে রাজাবাহাদুরের হুকুমে রাত্রি সাড়ে দশটার সময়েই অন্দরমহলের দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল। তাছাড়া আগের দিন থেকে তার শরীরটা সুস্থ ছিল না, তাই ঘরের মধ্যে শুয়ে ঘুমিয়ে ছিল, তারপর চিৎকার ও গোলমালের শব্দে ঘুম ভেঙে উঠে যায় এবং সব দেখে। তার আগে নাকি সে কিছুই টের পায়নি।
