কিরীটী ওকে ঠিকই লিখেছিল। সতীনাথ একটি গভীর জলের মাছ, তার প্রতি ভাল করে নজর রাখতে। কিন্তু সতীনাথের কর্মময় জীবনের ওপরে যে এত তাড়াতাড়ি যবনিকা নেমে আসবে তা সুব্রত স্বপ্নেও ভাবেনি। এ যেন বিনা মেঘে বজ্রাঘাতের মতই আকস্মিক ও অচিন্তনীয়। তারপর আরও একটা জিনিস ভাববার আছে। লাহিড়ীর এই হত্যা-ব্যাপারের সঙ্গে পূর্বতন সুহাসের হত্যা-ব্যাপারের কোনো সংস্পর্শ বা যোগাযোগ আছে কি না। এটা সেই কয়েক মাস আগেকার পুরাতন ঘটনারই জের, না নতুন কোনো হত্যা-ব্যাপার? রাজাবাহাদুরের কাছে জানা গেল ঐ নিশানাথ লোকটা বিকৃত-মস্তিষ্ক একজন আর্টিস্ট। অথচ ওর কথা কালই সর্বপ্রথম সুব্রত জানতে পারল। ইতিপূর্বে ঘুণাক্ষরেও নিশানাথের অস্তিত্ব সম্পর্কে সুব্রত জানতে পারেনি। গতরাত্রের ব্যাপার দেখে মনে হল, নিশানাথ লোকটিকে রাজাবাহাদুর সযত্নে আড়াল করে যেন রাখতে চান। সেই কারণেই হয়ত তাড়াতাড়ি তাকে অন্য সকলের সামনে থেকে সরাবার জন্য তিনি অতি মাত্রায় ব্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু কেন? লোকটা যদি সত্যিই বিকৃত-মস্তিষ্ক হয়, তবে তাকে এত ভয়ই বা কেন? তারপর নিশানাথের কথাগুলো! সেগুলো কি নিছক প্রলাপোক্তি ভিন্ন আর সত্যিই কিছু নয়?
এখন পর্যন্ত সুব্রত নৃসিংহগ্রামে একটিবার গিয়ে উঠতে পারেনি। তারপর সাঁওতাল প্রজা! হ্যাঁ, শুনেছে বটে ও, নৃসিংহগ্রামের অর্ধেকের বেশীর ভাগ প্ৰজাই সাঁওতাল ও বাউড়ী জাতি, এখানেও নদীর ধারে রাজাদের প্রায় একশত সাঁওতাল প্রজা আছে। এখানে আসবার পর, কাজ করবার কোনো সূত্রই আজ পর্যন্ত সুব্রত পায়নি। অথচ প্রায় দেড় মাস হতে চলল এখানে সে এসেছে!
ঐ তারিণী চক্রবর্তী, মহেশ সামন্ত, সুবোধ মণ্ডল—লোকগুলো যেন এক-একটি টাইপ চরিত্রের। সকলেই রাজবাড়িতে বহুকালের পুরাতন কর্মচারী।
সুহাসের মা, রসময়ের দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী মালতী দেবী, সুব্রত এখনও তাঁকে একটি দিনের জন্যও দেখেনি। শোনা যায়, একটিমাত্র পুত্রের মৃত্যুর পর তিনি সহসা যেন অন্তঃপুরে আত্মগোপন করছেন। দিবারাত্র ঠাকুরঘরে পূজা-আর্চ নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। কোথাও বড় একটা বের হন না বা তেমন কারও সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎও করেন না।
রাজাবাহাদুর সুবিনয় মল্লিকের স্ত্রীও মৃতা এবং তাঁর একটিমাত্র পুত্র প্রশান্ত কলকাতায় তার মামার বাড়ীতে থেকেই পড়াশুনা করে। ছুটিছাটায় রায়পুরে আসে কখনও কচিৎ।
সুব্রত কেবল ভেবেই চলে, ভাবনার যেন কোনো কূল-কিনারা পায় না। যা হোক ঐ দিনই দ্বিপ্রহরের দিকে ও একটা দীর্ঘ চিঠি কিরীটীকে লেখে, সব ব্যাপারটা জানিয়ে।
***
দিন-পাঁচেক বাদে কিরীটীর চিঠির জবাব আসে।
কলিকাতা
২৬শে ফাল্গুন
কল্যাণ,
তোর চিঠি পেলাম। তোর চিঠি পড়ে মনে হল যেন তুই অত্যন্ত গোলমালে পড়ে গেছিস। সতীনাথের জন্য এত চিন্তার কোন কারণ নেই তো। একটু ভাল করে ভেবে দেখলেই বুঝতেই পারবি আমার সন্দেহ ও গণনা ভুল হয়নি, এবং ক্রমে সেটাও প্রমাণিত হতে চলেছে। সতীনাথের মৃত্যুর প্রয়োজন হয়েছিল, তাই তাকে ঐভাবে মৃত্যুবরণ করতে হল। শুনেছি রহস্যময়ী পৃথিবীতে এক ধরনের নাকি সাপ আছে, যারা ক্ষুধার সময় নিজেদের দেহ নিজেরাই গিলতে শুরু করে। হতভাগ্য সতীনাথও সেই রকম কোনো ক্ষুধার্ত সাপের পাল্লায় পড়েছিল হয়ত। নইলে–যাক গে সে কথা, কিন্তু তোর শেষ চিঠিটা পড়ে আমি ভাবছি আর একজনের কথা। তারও মৃত্যু ঘনিয়ে এসেছে মনে হচ্ছে, তবে এই ভরসা সতীনাথের মত অত চট করে তাকে হত্যা করা হয়ত চলবে না। রীতমত ভেবেচিন্তে তাকে এগুতে হবে। তুই লিখেছিস হাতের কাছে কোনো সূত্র খুঁজে পাচ্ছিস না! তোদের ঐ রাজবাটির অন্দরের দারোয়ান শ্ৰীমান ছোট্ট সিং, তার জবানবন্দি তো নিসনি? খোঁজ নিয়ে দেখিস দেখি, লোকটা মাথায় পাগড়ী বাঁধে কিনা? আর কয় সেট পেটেন্ট দারোয়ানী লোহার নাল-বসানো নাগরা জুতো সে রাখে? তারিণী আর মহেশের উক্তি একান্ত পরস্পরবিরোধী! ওদের মধ্যে একজন সম্ভবত সত্যি বলেনি। ঘড়ি ধরে দেখিস তো, তারিণীর ঘর থেকে অন্দরে যাওয়ার দরজাটার গোড়ায় পৌঁছতে কত সময় ঠিক লাগে? গোলমালের সময় ছোট্টু সিং কোথায় ছিল? শ্রীমান সুবোধ পরিপূর্ণ সজ্ঞানেই ছিলেন, যদি আমার কথা বিশ্বাস করিস! মহেশের কথাগুলোও অবহেলা করলে চলবে না। বেশ ভাববার। টিউবওয়েল দেখেছিস কখনও? তাতে যখন জল পাম্প করলেও জল বের হতে চায় না, তখন তার মধ্যে কিছু জল ঢেলে পাম্প করলেই জল উঠে আসে। তাকে বলে জল দিয়ে জল বের করা। এ কথা নিশ্চয়ই অস্বীকার করতে পারবি না যে, সুবোধ জল ও দুধের পার্থক্য বোঝে না!
তবে হ্যাঁ, সবই শ্রমসাপেক্ষ। তোকে তো আগেই বলেছি, হত্যাটাই সমস্ত হত্যারহস্যের শেষ! তরুশাখা সমন্বিত বিষবৃক্ষ! যা কিছু রহস্য থাকে, সবই সেই হত্যার পূর্বে। সমস্ত রহস্যের পরে যবনিকাপাত হয় হত্যার সঙ্গে সঙ্গেই। সেই জন্যেই রহস্যের কিনারা করতে হলে তোকে গোড়া থেকে শুরু করতে হবে। আমার যতদূর মনে হয়, সতীনাথের হত্যারহস্যের মূলের সঙ্গে সুহাসের হত্যার মূল জড়িয়ে জট পাকিয়ে আছে। এখন গিটগুলো খুলতে হবে আমাদেরই। নৃসিংহগ্রামে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একবার ঘুরে আয়। একটা ভাল সার্ভে করবি। চোখ খুলে রাখবি সর্বদা। পারিস তো দু-একদিনের ছুটি নিয়ে একবার এদিকটা ঘুরে যাস। তুই তো জানিস, আমার কলমের চাইতে মুখটা বেশী সক্রিয়। তোর পত্রের আশায় রইলাম। ভালবাসা নিস, তোর ক।
